ইউনিফর্ম ক্যাপিটালিজম | মিনহাজ রাফি


 

​কারওয়ান বাজারের ট্রাফিক মোড়ে তখন খাঁ খাঁ দুপুর। ট্রাফিকের বিকট হর্ন, পিচঢালা রাস্তার ধোঁয়া আর অতি-উৎসাহী পথচারীদের ঠেলেঠুলে মোড়ের পিলারের ছায়ায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছেন সহকারী উপ-পরিদর্শক আলি আজগর মিয়া। 

​ঠিক সেই মুহূর্তে মাইক্রোফোন হাতে তাঁর সামনে এসে অবতীর্ণ হলেন নিউজ ৩৬০-এর জনপ্রিয় লাইভ শো "উদ্যোক্তার খোলামেলা কথা’র চটপটে উপস্থাপক তৌহিদ শুভ্র। 

পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে বাসের পম্পম হর্ন বাজতেই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তৌহিদ চড়া গলায় হাভভাব মারলেন— ​"দর্শক! সিলিকন ভ্যালির ফান্ডিং কিংবা মাথাখারাপ করা ব্যাক-এ্যান্ড কোডিংকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করেছেন দেশের নতুন যুগের এক আইকনিক ফিন্যান্সিয়াল জিনিয়াস! প্রথাগত ব্যবসা, আইটি ফার্ম, শেয়ারবাজারের মন্দা যখন চরমে, তখন তিনি এক জোড়া সুতির ইউনিফর্মকে মূলধনী সম্পদ অর্থাৎ ক্যাপিটাল অ্যাসেট বানিয়ে দাঁড় করিয়েছেন শতভাগ রিটার্ন-ভিত্তিক আনকাট এক ইউনিকর্ন স্টার্টআপ! আজ আমরা সরাসরি কথা বলব এই যুগান্তকারী পুলিশি-উদ্যোক্তার সাথে। স্যার, নিউজ ৩৬০-তে আপনাকে ওয়েলকাম!"

​আলি আজগর মিয়া ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে এমন কড়া এক স্যালুট ঠুকলেন যে তাঁর বুটের আওয়াজে পাশের এক বাইকার ভয়ে ব্রেক কষে ফেলল।

​স্যালুট শেষেই হাত উঁচিয়ে আলি আজগর বললেন, "ধন্যবাদ, ধন্যবাদ! তবে ভাই, কথা বেশি প্যাঁচাবেন না। জ্যামের পিক আওয়ার চলতেছে, আমার রেভিনিউ জেনারেটিং উইন্ডো মিস হয়ে গেলে লসটা কে দেবে?"

​তৌহিদ একটু কেতাদুরস্ত হেসে বললেন, "অবশ্যই স্যার, টু দ্য পয়েন্টে শুনব! ঐতিহ্যবাহী ঘুষ-বাণিজ্যের ব্যাকডেটেড মডেল ভেঙে আপনি যে একেবারে নতুন ব্রাইব-ক্যাপিটালিজম খাড়া করলেন, এর পেছনের গোপন ফিলোসফিটা কী?"

​আলি আজগর বিরক্তিতে চোখ ছোট ছোট করে বললেন, "দেখুন সাহেব, বিশ্বের বড় বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা যখন ক্রিপ্টোকারেন্সির পেছনে কোটি কোটি ডলার ঢেলে মুখ থুবড়ে পড়ছে, আমি তখন বেছে নিয়েছি খাঁটি দেশীয়, ভ্যালু-প্যাকড ও সাস্টেইনেবল ক্যাপিটাল মডেল। আমার থিওরি একদম পানি: পোশাক বানিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, আর সেই পোশাক পরে নামছি নতুন ঘুষ খাইতে! কোনো মেকি সমাজসেবা নাই, কর্পোরেট সিএসআর-এর নামে ভংচং নাই। একদম পিওর 'বি-টু-সি' মানে ব্রাইব-টু-কনসিউমার বিজনেস!"

​"মাইন্ডব্লোয়িং ট্রান্সপারেন্সি!" তৌহিদ উত্তেজনায় মাইক্রোফোন মুখের কাছে এনে যোগ করলেন, "কিন্তু স্যার, সুশীলসমাজ তো বলতে পারে পোশাক দিয়ে লজ্জা নিবারণ করতে হয় আর এইটা তো একটা সরকারি পোষাক, আপনি এইটা ব্যবহার করেই ব্যবসা করছেন?  আপনি এটাকে ক্যাপিটাল অ্যাসেট বা ব্যবসা বলছেন কোন যুক্তিতে?"

​আলি আজগর এবার হা-হা করে কায়দা করে হাসলেন। "আমজনতার চিন্তাভাবনা ওই শার্ট-প্যান্টের সুতা পর্যন্তই আটকে থাকে ভাই, তাই তারা সাধারণ প্রজা! আচ্ছা বলেন তো, একটা সিএনজি বা ট্যাক্সি কিনে ভাড়ায় খাটালে যদি ব্যবসা হয়, একটা মুদি দোকানে কয়েক লাখ টাকা ইনভেস্ট করলে যদি ব্যবসা হয় তবে আমি মাত্র ২ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে এই ইউনিফর্মে ইনভেস্ট করে মাস শেষে ৩ লাখ টাকার নিট ক্যাশফ্লো নামানো ব্যবসা হবে না কেন? দেশের শেয়ারবাজার ধসে পড়তে পারে, ডলারের দাম আকাশে উঠতে পারে, কিন্তু ট্রাফিক মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কড়া ইস্ত্রি করা ইউনিফর্মের মার্কেট ডিমান্ড কোনোদিন কমবে? এর চেয়ে সিকিউর্ড আর হাই-রিটার্ন ইনভেস্টমেন্ট এই গ্রহে আরেকটা আছে?"

​তৌহিদ বেশ মুগ্ধ হয়ে মাথা নাড়লেন, "অকাট্য যুক্তি! তাছাড়া আপনার ইউনিফর্মে তো বেশ হাই-টেক ছোঁয়াও দেখছি..."

​আলি আজগর নিজের শার্টের বুক আর পকেটে আলতো চাপড় মেরে গর্বের সাথে বললেন, "হাঁ! ডিজিটাল বাংলাদেশের স্মার্ট সিটিজেনদের কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স স্মুথ করতে আমরা ট্রিপল-ফিচার এনেছি!  প্রথমত, 'জিপার ক্যাশ হোল্ডার'—পকেটে বিশেষ পকেট-চেইন বসানো, যাতে ক্লায়েন্ট ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোট ভাঁজ না করে খাম ছাড়াই চালান করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, কিউআর কোড সিস্টেম। এইটা সবচেয়ে সহজ ও প্রচলিত সিস্টেম। আজকাল তো ডিজিটালি স্মার্ট ডিজিটাল ভেজিটেবলরা ক্যাশ নিয়ে ঘোরে না! তাই বুকেই Scan & Pay। বিকাশ, নগদ, রকেট যেকোনো ওয়ালেট থেকে ডিরেক্ট অ্যাকাউন্টে ঢেলে দেওয়া যায়! আর তৃতীয়ত, আফটার-সেলস সার্ভিস। টাকা পেলেই আমরা দাঁত কেলিয়ে মিষ্টি হেসে বলি, 'ধন্যবাদ, পরবর্তী জ্যামে আবার দেখা হবে!'"

​ঠিক এমন সময় হেলমেট ছাড়া এক চ্যাংড়া বাইকার পাশ দিয়ে বাতাস কেটে যাচ্ছিল। আলি আজগর মিয়া এক হাত তুলে সুপারম্যানের মতো বাইকটি থামিয়ে দিলেন। বাইকার কাঁচুমাচু হতেই আজগর মিয়া এক চুল না নড়ে বুকের কিউআর কোডটা তার মুখের সামনে বাড়িয়ে ধরলেন। বাইকার ওস্তাদ প্যান্টের পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে ক্লিক করে স্ক্যান মারতেই আলি আজগর মিয়ার পকেটের ফোন টুং করে উঠলো। 

​আলি আজগর মোবাইল হাতে নিয়ে বললেন, "ওকে ভাই ডান, বিকাশে ৫০০ টাকা জমা হয়েছে, থ্যাঙ্ক ইউ! হ্যাভ এ সেফ রাইড, একটা হেলমেটটা কিনে নিয়েন!"

​বাইকারও একগাল হেসে ভেগে গেল। রিপোর্টার তৌহিদ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হাততালি দিতে লাগলেন, "অবিশ্বাস্য কাস্টমার জার্নি! স্যার, আপনার এই ইউনিফর্ম-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অর্থ উপার্জন সংস্থা'র ফিউচার প্ল্যান কী?"

​আলি আজগর মিয়ার চোখে তখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। 

"ভিশন অনেক দূর! আগামী বছর থেকে বেস্ট পারফর্মিং ফিল্ড এজেন্টদের জন্য গোল্ডেন ব্রাইব অ্যাওয়ার্ড চালু করব। আর সবচেয়ে বড় কথা আমাদের এই মডেল প্রমাণ করে দিয়েছে যে একটু ট্রাফিক নলেজ আর চকচকে একটা ইউনিফর্ম থাকলে এই দেশে অর্থনৈতিক মন্দা বলতে কিচ্ছু থাকে না!"

​তৌহিদ ক্যামেরার দিকে ঘুরে ইতি টেনে বললেন, "ধন্যবাদ আলি আজগর মিয়া সাহেব! তো দর্শক, শুনলেন তো? ইউনিকর্ন স্টার্টআপ দাঁড় করাতে কোটি কোটি টাকার ভিসি ফান্ডিং লাগে না; লাগে কেবল সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, বুক চিতিয়ে কিউআর কোড ধরার সাহস আর বিজনেস নলেজ।

​ক্যামেরা তখন ক্লোজ-আপে আলি আজগর মিয়ার মুখের ওপর রিভলভ করছে। তিনি ক্যামেরা লক্ষ্য করে দর্শকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে ডাবল-ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিলেন!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ