বন্ধু হারালে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে ছেয়ে যাবে পুরো শহর | মিনহাজ রাফি


মিতুলের চিন্তাভাবনা সাধারণ মানুষের ছকে পড়ে না। আবহাওয়া একটু মেঘলা কিংবা প্যাঁচপ্যাচে স্যাঁতসেঁতে হলেই তার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বিচিত্র সব মেলোড্রামা আর আবেগঘন কল্পনার আইসক্রিম গলতে শুরু করে।

​আজও এর ব্যতিক্রম হলো না। ক্যাফের জানালার ওপাশে মুখভার করা মেঘলা আকাশ, আর টেবিলে রাখা কফির কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। এমন একটা রোমান্টিক-রোমান্টিক ভাব পেয়ে মিতুল হঠাৎ দু’হাতে কফির কাপটা কষে জাপটে ধরল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে সিনেমাটিক কায়দায় এমন এক গহীন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন পুরো পৃথিবীর দুঃখ একা তার কাঁধেই চেপে বসেছে।

​সামনে বসে থাকা তার খাঁটি ও অভিন্নহৃদয় বন্ধু আবিরের দিকে তাকিয়ে চোখের কোণে একফোঁটা কৃত্রিম জল ফোটানোর চেষ্টা করল মিতুল। তারপর অত্যন্ত করুণ গলায় বলল, "জানিস আবির, জীবনের মোড়ে মোড়ে কত মানুষ হারিয়ে যায়! মাঝরাতে একা একা ভাবি—আমি যদি সত্যি একদিন হুট করে এই শহরটা ছেড়ে, তোদের সবাইকে ছেড়ে কোথাও একদম উধাও হয়ে যাই... তখন কী করবি রে তুই? ব্যাকুল হয়ে পকেটের গাঁটের পয়সা খরচ করে শহরের সব কটা গলির দেওয়ালে দেওয়ালে আমার ছবি দেওয়া নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি মারবি তো?"

​কথাটা শেষ করে মিতুল একদম খাস ট্র্যাজেডি নায়কের মতো মুখ বানিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে সে স্ক্রিপ্ট রেডি করে ফেলেছে—আবির হয়তো কফির কাপ ফেলে দিয়ে তার হাত চেপে ধরে চোখে পানি এনে বলবে, "ওরে ছাগল! এমন অশুভ কথা আর মুখে আনিস না! তুই হারিয়ে গেলে এই শূন্য শহরে আমি কাকে নিয়ে বাঁচব রে?"

​কিন্তু আবির জিনিসটাই আলাদা! তার রসে-কষে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে পরম শান্তিতে নাকের ওপর থেকে চশমাটা খুলল। টিস্যু দিয়ে কাচ দুটো মুছে আবার নাকে ফিট করল, তারপর কফির কাপে এমন এক দীর্ঘ চুমুক দিল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা সম্পাদন করছে।

​একদম গম্ভীর, ভারী গলায় আবির বলল, "মারব তো অবশ্যই! নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে পুরো শহরের একটা দেওয়ালেও জায়গা খালি রাখব না। রিকশার পেছনে, ল্যাম্পপোস্টে, এমনকি চায়ের দোকানের কেটলির গায়েও তোর হাসিহাসি ছবিটা সেঁটে দেব।"

​মিতুল তো আনন্দে গলে একাকার! বুক চাপড়ে আবেগে গদগদ হয়ে বলল, "দেখলি! একেই বলে রক্তের বন্ধু! দোস্ত, তোর ওপর আজ আমার ভালোবাসা একধাক্কায় কয়েক গুণ বেড়ে গেল রে..."

​আবির এক হাত তুলে ট্রাফিক পুলিশের মতো মিতুলকে থামিয়ে দিল। মুখটা অত্যন্ত করুণ, বিনয়ী এবং মাসুম বানিয়ে বলল, "দাঁড়া দাঁড়াবি, ভালোবাসার সাগরে সাঁতার কাটার আগে একটা ছোট কিন্তু অত্যন্ত গ্যাঁড়াকলের আবেদন আছে তোর কাছে।"

​মিতুল ভ্রূ কুঁচকে বলল, "কী আবেদন?"

​আবির জিন্সের পকেট থেকে তার হতদরিদ্র মানিব্যাগটা বের করল। তারপর উল্টো করে মেঝের দিকে এমনভাবে ঝাঁকাল, যেন সেখান থেকে ফুটো পয়সা তো দূর, এক দানা ধুলোও খসে পড়ল না! পরম করুণ কণ্ঠে সে বলল, "কথাটা ভালো করে কান খুলে শুনে রাখ—তুই যদি নিখোঁজ হতেই চাস, দয়া করে মাসের ২৫ তারিখ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে হারাস না! তুই তো জানিস, মাসের এই শেষ সপ্তাহে আমার পকেটের অবস্থা সাহারা মরুভূমির চেয়েও শুকনো থাকে। টিউশনি করে যা পাই, তা দিয়ে মাসের প্রথম ১৫ দিনই চলা দায়। এই মহাঅকালের মধ্যে তুই হারিয়ে গেলে কালার প্রিন্ট আর ফটোকপির টাকা আমি পাব কোথায়? আর তুই তো জানিস, কারো কাছ থেকে ধারদেনা করা আমার আদর্শের খেলাফ! শেষে তোর জন্য রঙিন পোস্টার ছাপাতে না পেরে বাধ্য হয়ে ফেসবুকে একটা দায়সারা স্ট্যাটাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে হবে। আমি কি তোর মতো কলিজার বন্ধুর সাথে এমন ইতরামি করতে পারি? আমি চাই তোকে নিয়ে শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে..."

​মিতুল হা করে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখের হাঁ দিয়ে চাইলে একটা আস্ত ফুটবল গলিয়ে দেওয়া সম্ভব!

​আবির এবার বিগলিত একটা কানফাটা হাসি উপহার দিয়ে যোগ করল, "তাই তোর কাছে আকুল আর্জি—তুই বরং মাসের ৫ বা ৬ তারিখের দিকে হারাস! বেতনটা জাস্ট অ্যাকাউন্টে ঢুকবে, পকেটে ক্যাশ টাকার গরম থাকবে। নিশ্চিন্তে তোর জনা পাঁচেক ভালো ভালো ছবি বাছাই করে দুই-তিনশো চকচকে কালার পোস্টার ছাপিয়ে পুরো শহর একদম মুড়িয়ে ফেলব... 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ