নির্বাচিত কবির কবিতা ।। হুমায়ূন আজাদ


 

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে 


আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।

নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক

সব সংঘ-পরিষদ;— চ’লে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে

চ’লে যাবে এই সমাজ সভ্যতা— সমস্ত দলিল—

নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র

আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চ’লে গেছে নষ্টদের

অধিকারে। চ’লে যাবে শহর বন্দর ধানক্ষেত

কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক

মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ নির্জন প্যাগোডা।

অস্ত্র আর গণতন্ত্র চ’লে গেছে, জনতাও যাবে;

চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন

সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।



আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।

কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার চাঁদ

নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ

শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।

রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবিশংকরের

সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙুল

ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল

কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।

চ’লে যাবে সেই সব উপকথা : সৌন্দর্য-প্রতিভা—

মেধা;— এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা

নির্বাধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে

অত্যন্ত উল্লাসভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে।



আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।

সবচে সুন্দর মেয়ে দুইহাতে টেনে সারারাত

চুষবে নষ্টের লিঙ্গ; লম্পটের অশ্লীল উরুতে

গাঁথা থাকবে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী। চ’লে যাবে,

কিশোরীরা চ’লে যাবে, আমাদের তীব্র প্রেমিকারা

ওষ্ঠ আর আলিঙ্গন ঘৃণা ক’রে চ’লে যাবে, নষ্টদের

উপপত্নী হবে। এই সব গ্রন্থ শ্লোক মুদ্রাযন্ত্র

শিশির বেহালা ধান রাজনীতি দোয়েলের ঠোঁট

গদ্যপদ্য আমার সমস্ত ছাত্রী মার্কস-লেনিন,

আর বাঙলার বনের মতো আমার শ্যামল কন্যা-

রাহুগ্রস্থ সভ্যতার অবশিষ্ট সামান্য আলোক—

আমি জানি তারা সব নষ্টদের অধিকারে যাবে।



এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়


এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় ?

তেমন যোগ্য সমাধি কই ?

মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো

অথবা সুনীল-সাগর-জল-

সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই !

তাইতো রাখি না এ লাশ আজ

মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,

হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।



ব্যাধিকে রূপান্তরিত করছি মুক্তোয়


একপাশে শূন্যতার খোলা, অন্যপাশে মৃত্যুর ঢাকনা,

প’ড়ে আছে কালো জলে নিরর্থক ঝিনুক।

অন্ধ ঝিনুকের মধ্যে অনিচ্ছায় ঢুকে গেছি রক্তমাংসময়

আপাদমস্তক বন্দী ব্যাধিবীজ। তাৎপর্য নেই কোন দিকে-

না জলে না দেয়ালে-তাৎপর্যহীন অভ্যন্তরে ক্রমশ উঠছি বেড়ে

শোণিতপ্লাবিত ব্যাধি। কখনো হল্লা ক’রে হাঙ্গরকুমীরসহ

ঠেলে আসে হলদে পুঁজ, ছুটে আসে মরা রক্তের তুফান।

আকষ্মিক অগ্নি ঢেলে ধেয়ে আসে কালো বজ্রপাত।

যেহেতু কিছুই নেই করণীয় ব্যাধিরূপে বেড়ে ওঠা ছাড়া,

নিজেকে-ব্যাধিকে-যাদুরসায়নে রূপান্তরিত করছি শিল্পে-

একরত্তি নিটোল মুক্তোয়!



আমার কুঁড়েঘরে


আমার কুঁড়েঘরে নেমেছে শীতকাল

তুষার জ’মে আছে ঘরের মেঝে জুড়ে বরফ প’ড়ে আছে

গভীর ঘন হয়ে পাশের নদী ভ’রে

বরফ ঠেলে আর তুষার ভেঙে আর দু-ঠোঁটে রোদ নিয়ে

আমার কুঁড়েঘরে এ-ঘন শীতে কেউ আসুক



আমার গ্রহ জুড়ে বিশাল মরুভূমি

সবুজ পাতা নেই সোনালি লতা নেই শিশির কণা নেই

ঘাসের শিখা নেই জলের রেখা নেই

আমার মরুভূর গোপন কোনো কোণে একটু নীল হয়ে

বাতাসে কেঁপে কেঁপে একটি শীষ আজ উঠুক



আমার গাছে গাছে আজ একটি কুঁড়ি নেই

একটি পাতা নেই শুকনো ডালে ডালে বায়ুর ঘষা লেগে

আগুন জ্ব’লে ওঠে তীব্র লেলিহান

বাকল ছিঁড়েফেড়ে দুপুর ভেঙেচুরে আকাশ লাল ক’রে

আমার গাছে আজ একটা ছোট ফুল ফুটুক



আমার এ-আকাশ ছড়িয়ে আছে ওই

পাতটিনের মতো ধাতুর চোখ জ্বলে প্রখর জ্বালাময়

সে-তাপে গ’লে পড়ে আমার দশদিক

জল ও বায়ুহীন আমার আকাশের অদেখা দূর কোণে

বৃষ্টিসকাতর একটু মেঘ আজ জমুক



আমার কুঁড়েঘরে নেমেছে শীতকাল

তুষার জ’মে আছে ঘরের মেঝে জুড়ে বরফ প’ড়ে আছে

গভীর ঘন হয়ে পাশের নদী ভ’রে

বরফ ঠেলে আর তুষার ভেঙে আজ দু-ঠোঁটে রোদ নিয়ে

আমার কুঁড়েঘরে এ-ঘন শীতে কেউ আসুক।



ভালো থেকো


ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।

ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।

ভালো থেকো।



ভালো থেকো চর, ছোট কুড়ে ঘর, ভালো থেকো।

ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির।

ভালো থেকো জল, নদীটির তীর।

ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো।

ভালো থেকো কাক, কুহুকের ডাক, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাশিঁ।

ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি।

ভালো থেকো আম, ছায়া ঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।

ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল,

ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল,

ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাও,ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।

ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।



সেই কবে থেকে


সেই কবে থেকে জ্বলছি
জ্ব’লে জ্ব’লে নিভে গেছি ব’লে
তুমি দেখতে পাও নি ।

সেই কবে থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছি
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতিস্তম্ভের মতো ভেঙে পড়েছি ব’লে
তুমি লক্ষ্য করো নি ।

সেই কবে থেকে ডাকছি
ডাকতে ডাকতে স্বরতন্ত্রি ছিঁড়ে বোবা হয়ে গেছি ব’লে
তুমি শুনতে পাও নি ‘।

সেই কবে থেকে ফুটে আছি
ফুটে ফুটে শাখা থেকে ঝ’রে গেছি ব’লে
তুমি কখনো তোলো নি ।

সেই কবে থেকে তাকিয়ে রয়েছি
তাকিয়ে তাকিয়ে অন্ধ হয়ে গেছি ব’লে
একবারো তোমাকে দেখি নি ।


তৃতীয় বিশ্বের একজন চাষীর প্রশ্ন

আগাছা ছাড়াই, আল বাঁধি, জমি চষি, মই দিই,

বীজ বুনি, নিড়োই, দিনের পর

দিন চোখ ফেলে রাখি শুকনো আকাশের দিকে। ঘাম ঢালি
খেত ভ’রে, আসলে রক্ত ঢেলে দিই
নোনা পানিরূপে; অবশেষে মেঘ ও মাটির দয়া হলে
খেত জুড়ে জাগে প্রফুল্ল সবুজ কম্পন।
খরা, বৃষ্টি, ঝড়, ও একশো একটা উপদ্রব কেটে গেলে
প্রকৃতির কৃপা হ’লে এক সময়
মুখ দেখতে পাই থোকাথোকা সোনালি শস্যের।
এতো ঘামে, নিজেকে ধানের মতোই
সিদ্ধ করে, ফলাই সামান্য, যেনো একমুঠো, গরিব শস্য।
মূর্খ মানুষ, দূরে আছি, জানতে ইচ্ছে করে
দিনরাত লেফ-রাইট লেফ-রাইট করলে ক-মণ শস্য ফলে
এক গন্ডা জমিতে?


আমাকে ভালোবাসার পর

আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার,
যেমন হিরোশিমার পর আর কিছুই আগের মতো নেই
উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত।

যে কলিংবেল বাজে নি তাকেই মুর্হুমুহু শুনবে বজ্রের মত বেজে উঠতে
এবং থরথর ক’রে উঠবে দরোজাজানালা আর তোমার হৃৎপিন্ড।
পরমুহূর্তেই তোমার ঝনঝন-ক’রে ওঠা এলোমেলো রক্ত
ঠান্ডা হ’য়ে যাবে যেমন একাত্তরে দরোজায় বুটের অদ্ভুদ শব্দে
নিথর স্তব্ধ হ’য়ে যেত ঢাকা শহরের জনগণ।

আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।
রাস্তায় নেমেই দেখবে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রতিটি রিকশায়
ছুটে আসছি আমি আর তোমাকে পেরিয়ে চ’লে যাচ্ছি
এদিকে-সেদিকে। তখন তোমার রক্ত আর কালো চশমায় এত অন্ধকার
যেনো তুমি ওই চোখে কোন কিছুই দ্যাখো নি।

আমাকে ভালবাসার পর তুমি ভুলে যাবে বাস্তব আর অবাস্তব,
বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য। সিঁড়ি ভেবে পা রাখবে স্বপ্নের চূড়োতে,
ঘাস ভেবে দু-পা ছড়িয়ে বসবে অবাস্তবে,
লাল টুকটুকে ফুল ভেবে খোঁপায় গুঁজবে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন।

না-খোলা শাওয়ারের নিচে বারোই ডিসেম্বর থেকে তুমি অনন্তকাল দাঁড়িয়ে
থাকবে এই ভেবে যে তোমার চুলে ত্বকে ওষ্ঠে গ্রীবায় অজস্র ধারায়
ঝরছে বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল।

তোমার যে ঠোঁটে চুমো খেয়েছিলো উদ্যমপরায়ণ এক প্রাক্তন প্রেমিক,
আমাকে ভালবাসার পর সেই নষ্ট ঠোঁট খঁসে প’ড়ে
সেখানে ফুটবে এক অনিন্দ্য গোলাপ।

আমাকে ভালবাসার পর আর কিছুই আগের মত থাকবে না তোমার।
নিজেকে দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত মনে হবে যেনো তুমি শতাব্দীর পর শতাব্দী
শুয়ে আছো হাসপাতালে। পরমুহূর্তেই মনে হবে
মানুষের ইতিহাসে একমাত্র তুমিই সুস্থ, অন্যরা ভীষণ অসুস্থ।

শহর আর সভ্যতার ময়লা স্রোত ভেঙে তুমি যখন চৌরাস্তায় এসে
ধরবে আমার হাত, তখন তোমার মনে হবে এ-শহর আর বিংশ শতাব্দীর
জীবন ও সভ্যতার নোংরা পানিতে একটি নীলিমা-ছোঁয়া মৃণালের শীর্ষে
তুমি ফুটে আছো এক নিষ্পাপ বিশুদ্ধ পদ্ম-
পবিত্র অজর।


আমাকে ছেড়ে যাবার পর

আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো।
তোমার খবরের জন্য যে আমি খুব ব্যাকুল, তা নয়।
তবে ঢাকা খুবই ছোট্ট শহর।
কারো কষ্টের কথা এখানে চাপা থাকে না।

শুনেছি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর তুমি খুবই কষ্টে আছো।
প্রত্যেক রাতে সেই ঘটনার পর নাকি আমাকে মনে পড়ে তোমার।
পড়বেই তো, পৃথিবীতে সেই ঘটনা তুমি-আমি মিলেই তো প্রথম
সৃষ্টি করেছিলাম।

যে-গাধাটার হাত ধরে তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে সে নাকি এখনো
তোমার একটি ভয়ংকর তিলেরই খবর পায় নি।
ওই ভিসুভিয়াস থেকে কতটা লাভা ওঠে তা তো আমিই প্রথম
আবিষ্কার করেছিলাম।

তুমি কি জানো না গাধারা কখনো অগ্নিগিরিতে চড়ে না?
তোমার কানের লতিতে কতটা বিদ্যুৎ আছে,
তা কি তুমি জানতে?
আমিই তো প্রথম জানিয়েছিলাম ওই বিদ্যুতে দপ ক’রে জ্বলে উঠতে পারে মধ্যরাত।
তুমি কি জানো না গাধারা বিদ্যুৎ সম্পর্কে কোনো
খবরই রাখে না?






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ