টুথব্রাশ | মিনহাজ রাফি
আমিন সাহেবের বয়স এখন ছত্রিশ চলছে। তবে তার চেহারা দেখে মনে হয়, সে যেন ইব্রাহিম লোদি আমলের কোনো এক রাজকোষাগার পাহারা দেওয়া অতন্দ্র প্রহরী। তার মাথার চুলগুলো বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে বহু আগে। আমিন সাহেব নিজে অবশ্য বলেন, "চুল পড়ে যাওয়া মানে চিন্তার পরিধি বেড়ে যাওয়া। টেনশনে মাথার চাল উড়ে যায় ভাই!"
গত পরশু আমিন সাহেবের সাথে দেখা। একটা ফাঁকা রিকশায় বসে গম্ভীর মুখে বিড়ি ফুঁকছেন। ।
আমি বললাম, "কিরে আমিন? কী অবস্থা?"
আমিন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এমন ভারী দীর্ঘশ্বাস, মনে হলো রিকশার চাকা পাংচার হয়ে যাবে।
"অবস্থা ভালো না ভাই। জীবনে একটা গভীর দার্শনিক সংকট তৈরি হয়েছে।"
আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "কীসের সংকট?"
"টুথব্রাশের।"
"টুথব্রাশের?"
"হ্যাঁ। বাজারের ব্রাশগুলো আজকাল এমনভাবে তৈরি করে যে, দাঁত মাজার চেয়ে ব্রাশ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোম্পানিরগুলোর নিয়তই হলো আমার মাড়ি কেটে রক্ত বের করা। এই যে আমি গত মঙ্গলবার একটা ব্রাশ কিনলাম। লাল রঙের। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ব্রাশের অর্ধেক চুল হাওয়া! বল তো ভাই, চুলগুলো কি রাতে উঠে ফিনকি দিয়ে কোথাও পালিয়ে গেল? নাকি আমার মাড়ির আন্ডারে কোনো অদৃশ্য নাপিত আছে, যে আমার ব্রাশের চুল কেটে নেয়?"
আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। "কোম্পানির দোষ দিয়ে কী হবে? কম দামি জিনিস কিনলে তো এমন হবেই।"
আমীন সাহেব চোখ গোল গোল করে আমার দিকে তাকালেন। যে দৃষ্টিতে মহাকাশচারীরা মহাশূন্যে এলিয়েন দেখে, ঠিক সেই দৃষ্টি।
"কম দামি? ত্রিশ টাকা দামের এই ব্রাশ কিনতে আমার পকেটের বারোটা বেজে গেছে। তুমি জানো, আমি গতকাল থেকে টুথপেস্ট ব্যবহার করাও বাদ দিয়েছি?"
"সে কী! টুথপেস্ট ছাড়া দাঁত মাজো কীভাবে?"
"নুন দিয়ে। আমাদের নানি-দাদিরা নুন দিয়ে দাঁত মাজতেন না? তাদের দাঁত তো মুক্তোর মতো চকচক করত। সেদিন এক আন্টির মুখে শুনলাম, নুন দিয়ে দাঁত মাজলে নাকি মাড়ি শক্ত হয়। আমি তো এক কেজি প্যাকেট লবণ কিনে সোজা বাথরুমে রেখে দিয়েছি। সকালে দাঁতে লবণ দিয়ে ঘষি, আর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হয় আমি যেন ডান্ডাফিল্ড জেলখানার কোনো কয়েদি। মুখের ভেতরটা কেমন যেন লবণের কারখানার মতো নোনতা হয়ে থাকে।"
আমি বললাম, "তাতে দাঁতের কী হলো?"
"দাঁতের কথা বাদ দাও ভাই। গতকাল সকালে বাথরুমে ঢুকে তো আমার হার্ট ফেল করার দশা।"
"কেন কী হলো?"
"আমার সেই লাল রঙের ব্রাশটা বাথরুমে নেই! আমি সারা ফ্ল্যাটে চিল্লাপাল্লা শুরু করলাম। কাজের বুয়াকে বললাম, 'তুমি আমার ব্রাশ চুরি করেছো স্বীকার করো! ব্রাশ চুরির অপরাধে জেল খাটতে হবে বলে দিচ্ছি!'
বুয়া তো কান্নাকাটি শুরু করে দিল। সে নাকি জীবনে কখনো টুথব্রাশ দেখেনি, সে নাকি কেবল নিমের ডাল দিয়ে দাত মাজে। তখন আমার বউ এলো। এসে ঠান্ডা মাথায় ব্রাশটা বাথরুমের বেসিনের নিচে থেকে উদ্ধার করলো। ব্রাশটা একটা তেলাপোকার সাথে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তেলাপোকাটা সম্ভবত ব্রাশটাকে নিজের টুথব্রাশ বানিয়ে ফেলেছিল।"
আমি আর থাকতে পারলাম না। রিকশার হুডের আড়ালেই হেসে ফেললাম।
আমিন সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, "হাসছো? এই যুগের মানুষের সমবেদনা বলে কিচ্ছু নেই। আচ্ছা বল তো, তেলাপোকা কখনো ব্রাশ করতে দেখেছ?"
"না, দেখিনি।"
"তাহলে ওটা ওখানে গেল কেন? গভীর ষড়যন্ত্র ভাই, সব গভীর ষড়যন্ত্র। এই পৃথিবীতে গরিব মানুষের একটা টুথব্রাশের কোনো স্বাধীনতাই নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি আমার টুথব্রাশটা একটা ইঁদুরের মুখে করে পগারপার হচ্ছে, আমি বিন্দুমাত্র অবাক হব না।"
আমি আর কিছু বললাম না।
আমিন সাহেব পকেট থেকে একটা অর্ধভাঙা চিরুনি বের করে নিজের টাকপড়া মাথার ওপর বুলোতে লাগলেন। তারপর উদাসীন গলায় বললেন, "যাই হোক, একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। তোমার কাছে দশটা টাকা হবে? চায়ের দোকানে বাকি জমে গেছে, চা-ও দেয় না আজকাল।"
আমি পকেট থেকে বিশ টাকার একটা নোট বের করে তার হাতে দিলাম। আমিন সাহেব টাকাটা নিয়ে এমনভাবে পকেটে ঢোকালেন, যেন তিনি এইমাত্র আমেরিকা থেকে আসা কোনো গ্রান্টের চেক নিলেন।
তারপর রিকশা থেকে নেমে বললেন, "চলো, চা খেয়ে আসি। জীবনের ছোটখাটো দুঃখগুলোকে চা দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হয়। টুথব্রাশের হিসাব না হয় কাল করা যাবে।"
স্ট্রেস ইজ নাথিং বাট অ্যান ইলুশন
মিনহাজ রাফি
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অফিসে যে পরিমাণ কাজের চাপ যাচ্ছে, তাতে আমার মনে হচ্ছিল মাথার ভেতর একটা প্রেসার কুকার বসানো হয়েছে। সিটি বাজছে তো বাজছেই, নামানোর লোক নেই। বসের ঝারি, একের পর এক ক্লায়েন্ট মিটিং আর ফাইল ডেকোরেশনের চক্করে আমাদের সবার মেজাজ একদম তুঙ্গে।
ঠিক এমন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে এইচআর ডিপার্টমেন্ট থেকে এক ইমেইল ভেসে এল আমাদের জন্য।
‘রিফ্রেশ ইয়োর সোল: থ্রি-ডে হ্যাপিনেস অ্যান্ড স্ট্রেস রিলিফ ট্রেইনিং!’
মেইলের সারমর্ম হলো, আমাদের মনের জমাট বাঁধা বিষণ্ণতা ধুয়েমুছে সাফ করতে কোম্পানি আমাদের তিন দিনের জন্য শহরের বাইরের এক বিলাসবহুল রিসোর্টে পাঠাচ্ছেন। সেখানে এক আন্তর্জাতিক মানের হ্যাপিনেস কোচ আমাদের শেখাবেন কীভাবে জীবনে কোনো চাপ না রেখে কেবলই পজিটিভ থাকা যায়।
আমরা তো শুনে আনন্দে নাচানাচি শুরু করলাম। যাক, অন্তত তিন দিন বসের মুখ দেখতে হবে না! মাগনা খাওয়া, সুইমিং পুল আর আরামের ঘুম। এর চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে!
কিন্তু আমাদের সেই ভুল ভাঙতে চব্বিশ ঘণ্টাও সময় লাগল না।
রিসোর্টে পৌঁছানোর পর দিন ভোর পাঁচটায় রুমের স্পিকারে বিকট শব্দে বাঁশি বেজে উঠল। চোখ ডলতে ডলতে নিচে নেমে দেখি, মাঠের মাঝখানে দাঁড়ানো আমাদের হ্যাপিনেস ট্রেইনার। পরনে ধবধবে সাদা পোশাক, মুখে কৃত্রিম এক চওড়া হাসি।
তিনি এসেই হাত দুটো ওপরে তুলে বললেন, "গুড মর্নিং চ্যাম্পস! আজ আমরা করব লাফটার থেরাপি। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসুন! হাহা... হিহি...!"
খালি পেটে, ভোরের কনকনে ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত চেপে জোর করে হাসার যে অভিজ্ঞতা, তা কোনো শত্রুরও যেন না হয়। পাশে দাঁড়িয়ে সহকর্মী সোহেল দাঁত বের করে এমনভাবে হাসার চেষ্টা করছিল, মনে হচ্ছিল ওর পেটে তীব্র ব্যথার খিঁচুনি উঠেছে। কিন্তু ট্রেইনার তাতেই মহা খুশি! তিনি চেঁচিয়ে বললেন, "ইয়েস! ফিল দ্য পজিটিভিটি!"
লাফটার থেরাপি শেষ হতেই শুরু হলো টিম বিল্ডিং। আমাদের চারটে দলে ভাগ করে মাঝমাঠে বিশাল এক রশি এনে দেওয়া হলো। কাজ হলো টানাটানি করা। পেটে এক ফোটা দানাপানি পড়েনি, রোদের তাপে মাথার চাঁদি ফেটে যাচ্ছে, আর আমরা প্যান্টের কোঁচা সামলে রশি টেনে ট্রেইনারকে প্রমাণ দিচ্ছি যে আমরা ‘একতাবদ্ধ’!
এরপর এল সবচেয়ে বিপজ্জনক সেশন শেয়ারিং হ্যাপি মেমোরিজ। সবাইকে মাইকের সামনে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি বলতে হবে। একেকজন মাইক হাতে নিয়ে এমনভাবে কান্নাকাটি আর দুঃখের কাহিনী শোনানো শুরু করল যে, স্ট্রেস কমা তো দূরের কথা, পুরো হলের পরিবেশ নিমেষে বিষাদের ছায়ায় ঢেকে গেল।
আর আমাদের ট্রেইনার মশাই? তিনি সুঠাম দেহে মঞ্চে হেঁটে হেঁটে ডায়লগ ছুড়ছেন, "স্ট্রেস ইজ নাথিং বাট অ্যান ইলুশন! চাপ বলে আসলে কিছু নেই, সবটাই আপনাদের ভাবনায়। মনকে বলুন আই অ্যাম হ্যাপি! দেখবেন সব চাপ গায়েব!"
আমি মনে মনে ভাবলাম, স্যার, যদি জানতেন সকালের নাস্তায় শুকনো ব্রেড আর পাতলা চা খেয়ে দুপুর দুটো পর্যন্ত রশি টানার পর মনকে আই অ্যাম হ্যাপি বোঝানো কতটা কঠিন, তাহলে হয়তো নিজেই কেঁদে ফেলতেন!
টানা আড়াই দিন এই সুখ চর্চার অত্যাচারে আমরা সবাই আদতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ধসে পড়লাম। আমাদের বসের ঝারি খাওয়ার অভ্যস্ত মস্তিষ্ক এই অতিরিক্ত জোরপূর্বক পজিটিভিটি আর সহ্য করতে পারছিল না। মনে মনে সবাই ভাবছি হে খোদা, কখন এই নরক গুলজার শেষ হবে আর কখন আমরা অফিসে ফিরে শান্তি পাব!
অবশেষে এল বিদায়ের দিন। ফাইনাল ক্লোজিং সেশন। ট্রেইনার মশাই স্টেজে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন, "আশা করি এই তিন দিনে আপনারা শিখে গেছেন কীভাবে সব পরিস্থিতিতে শান্ত ও মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হয়..."
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটল আসল অঘটন।
স্টেজের পাশের টেবিল থেকে ট্রেইনারের ল্যাপটপ ব্যাগ আর দামি মানিব্যাগটা হাওয়া! ঘটনাটা বুঝতে ট্রেইনারের মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
মহাশয় সাদা পোশাকের হ্যাপিনেস কোচ থেকে মুহূর্তেই রূপান্তরিত হলেন এক অগ্নিশর্মা মূর্তিতে! চওড়া সেই কৃত্রিম হাসি হাওয়া। মুখ লাল করে, চোখ দুটো বড় বড় করে তিনি চেল্লাতে শুরু করলেন, "কার এত বড় সাহস! আমার ব্র্যান্ড নিউ ল্যাপটপ আর মানিব্যাগ চুরি করে? চোর কে? এই সিকিউরিটি! পুলিশে ফোন কর! আজ আমি কাউকে ছাড়ব না! সব কটাকে জেলে পুরব!"
তিনি এতটাই চিৎকার করছিলেন যে তাঁর গলার রগ ভেসে উঠেছিল। রিসোর্টের কর্মচারীদের ওপর এমন সব অদ্ভুত ও অশ্রাব্য গালিগালাজ বর্ষণ করতে লাগলেন যা শোনার জন্য আমরা অন্তত প্রস্তুত ছিলাম না!
আমরা সবাই চুপচাপ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলাম। কিছুক্ষণ আগে যিনি বোঝাচ্ছিলেন—‘চাপ হলো মনের ভুল, রাগ হলো আত্মার ব্যাধি’—তিনিই এখন রাগ আর চাপে মাথার চুল ছিঁড়ছেন!
হঠাৎ আমার পাশে দাঁড়ানো সোহেল ফিসফিস করে বলল, "ভাই, ট্রেইনার স্যারের দিকে তাকা। স্যারের হ্যাপিনেস থেরাপির ৯ নম্বর রুলটা যেন কী ছিল?"
আমি আর চেপে রাখতে পারলাম না। আমার মুখ দিয়ে ফিক করে হাসি বেরিয়ে গেল। তারপর সোহেল, তারপর রফিক... দেখতে দেখতে আমরা পুরো টিম একসাথে হো হো করে হেসে উঠলাম। এমন হাসির তানে পুরো রিসোর্ট কেঁপে উঠল।
বিগত তিন দিন ধরে চেষ্টা করেও যে হাসি বা যে স্ট্রেস রিলিফ ট্রেইনার মশাই আমাদের করাতে পারেননি, তাঁর নিজের এই আসল রূপ দেখে মাত্র তিন সেকেন্ডে আমাদের সব স্ট্রেস, সব ক্লান্তি একদম হাওয়া হয়ে গেল... কি যে শান্তি লাগছে। আসলেই স্ট্রেস ইজ নাথিং বাট অ্যান ইলুশন...
যেভাবে আমি কবি হলাম
মিনহাজ রাফি
কবি হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার কোষ্ঠীতে লেখা ছিল না। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বাংলায় যে ছেলেটা কোনোমতে পার পেয়ে ডি গ্রেড বাগিয়েছিল, তার কোনো পদ্য রচনার সঙ্গে দূর-দূরান্তের সম্পর্ক না থাকাটাই স্বাভাবিক। ছোটবেলা থেকেই আমার সাহিত্যের সাথে সম্পর্ক ছিল যাকে বলে আদা কাঁচকলা সম্পর্ক। বাংলা দ্বিতীয় পত্রের রচনা পরীক্ষায় আমি গরুর রচনায় ঘাস খাওয়া ছাড়া আর কিছু লিখতে পারতাম না। কিন্তু একদিন হুট করেই সব বদলে গেল। সমাজ এবং ভাগ্য মাঝেমধ্যে এমন মোড় নেয় যে, সাধারণ আলুসিদ্ধ ভাত খাওয়া মানুষকেও রাতারাতি রবীন্দ্রনাথের ছদ্মবেশী সংস্করণ বানিয়ে ফেলে!
আমার কবি হওয়ার নেপথ্যে ছিল দুটি মহান উপাদান। প্রথমত, উপলব্ধি (পড়ুন: ব্যর্থ প্রেম); দ্বিতীয়ত, ফেসবুক।
ঘটনাটা ঘটেছিল বছরদুয়েক আগে। আমার পাড়ার শালিকমুখী মেয়ে নীলিমা যার চোখের দিকে তাকালে অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যালের মতো লাল বাতি জ্বলে উঠত। সে একদিন আমায় হেসে বলল, "জানেন হাশেমদা, যে পুরুষ কবিতা লিখতে পারে না, সে নাকি ভালোবাসতেই জানে না! আজকাল তো ছেলেরা কত সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখে ইনবক্সে পাঠায়..."
বাস! কথাটি শোনামাত্র আমার ভেতরের ঘুমন্ত (বা বলা ভালো, অচেতন) জাতীয় কবি জেগে উঠল। নীলিমাকে পেতে হলে আমায় কবিতা লিখতে হবে, অর্থাৎ কবি হতে হবে।
বাড়ি এসেই খাতা-কলম নিয়ে বসলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, মাথা থেকে ছন্দ বা কবিতা কিছুই বের হয় না। প্রমথ চৌধুরী লিখেছিলেন, 'ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়'। আমার মনে হলো, 'প্রেমই সংক্রামক, কবিতা নয়'। শেষমেশ বহু কষ্টে, মাথার চুল ছিঁড়ে প্রথম চরণ দুটো উদ্ধার করলাম:
"আকাশেতে উড়ছে চিল,
নীলিমা, তুমি আমার মন-ঝিল!"
দ্বিতীয় লাইন লেখার পর নিজেই দুই মিনিট নীরবতা পালন করলাম। পদ্য হয়েছে কি না জানি না, তবে অন্ত্যমিল তো হয়েছে! অমনি আর দেরি না করে ফেসবুকে একটা ছদ্মনামী প্রোফাইল খুললাম ‘নীল বেদনার কাঙাল’। সেখানে আমার এই মহাকাব্য পোস্ট করে দিলাম।
কিন্তু আসল টুইস্ট শুরু হলো এর পর!
পোস্ট করার পরদিনই কমেন্ট বক্সে ঝড় উঠল। পাড়ার কবিপ্রতিভায় ভরপুর এক বড়ভাই কমেন্ট করলেন "অসাধাআআআআরণ ভাজ ভাই! আপনার ভাবাবেগের গতি যেন খরস্রোতা নদীর মতো! চিত্রকল্প দারুণ!"
আমি মনে মনে ভাবলাম, চিত্রকল্প মানেটা কী? ঝিল মানে তো জলাশয়, নাকি এখানে অন্য কোনো গভীর রহস্য আছে? যাই হোক, লাইক আর শেয়ার-এর বন্যায় আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল।
উৎসাহিত হয়ে প্রতিদিন তিনটা করে পদ্য লিখতে লাগলাম। ছন্দ না মিললে বলতাম আধুনিক গদ্য কবিতা, ভাব না মিললে বলতাম সুররিয়েলিজম, আর কিচ্ছু না মিললে গম্ভীর মুখে বলতাম, "সব সাহিত্য সাধারণ পাঠকের জন্য নয়, এটার বোদ্ধা সমাজ দরকার!"
একদিন নীলিমার সামনে সুযোগ পেয়ে পকেট থেকে চিরকুট বের করে বললাম, "শোনো নীলিমা, তোমার জন্য একটা কবিতা লিখেছি।"
নীলিমা চোখ বড় বড় করে বলল, "তাই? সত্যি? পড়ে শোনাও তো!"
আমি গলা খাঁকারি দিয়ে বুক ফুলিয়ে পড়তে লাগলাম:
"তুমি যেন এক গরম শিঙাড়া,
তোমায় দেখে মনটা আমার হয় যে গৃহহারা।
সস ছাড়া যেমন শিঙাড়া অমিল,
তেমনি তুমি ছাড়া আমার জীবনটা অন্ধকার নিখিল!"
কবিতা শেষ হতেই দেখি নীলিমার মুখ গম্ভীর। একটু পর সে ঠাস করে একটা ধমক দিয়ে বলল, "আপনাকে কে বলেছে আমি সস দিয়ে শিঙাড়া খাই? আর আমাকে দেখে আপনার শিঙাড়া মনে হয়? অসভ্য লোক!"
এই বলে নীলিমা হনহন করে হেঁটে চলে গেল। প্রেম তো গেলই, উপরন্তু সে আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল।
কিন্তু গল্পের শেষ এখানেই নয়। পরদিন সকালে পাড়ার লাইব্রেরির সামনে দাঁড়াতেই তিন-চারজন তরুণ এসে আমাকে ছেঁকে ধরল।
— "দাদা, আপনিই কি ‘নীল বেদনার কাঙাল’?"
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, "আজ্ঞে... মানে..."
— "আহা দাদা! আপনার শিঙাড়া রূপক কবিতাটা ফেসবুকের এক পেজে ভাইরাল হয়ে গেছে! শিঙাড়াকে মধ্যবিত্তের ভালোবাসার প্রতীক বানিয়ে আপনি যে উত্তর-আধুনিক রূপক তৈরি করেছেন, তা এককথায় অনবদ্য! আমরা আপনাকে আমাদের পাড়ার সবুজ সাহিত্য ক্লাব-এর সভাপতি করতে চাই!"
আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। নীলিমা আমায় রিজেক্ট করলেও, আমার শিঙাড়া রূপক সাহিত্যজগতে ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেলেছে!
এখন আমি নিয়মিত চশমা পরে, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ ঝুলিয়ে সাহিত্য সভায় যাই। সবাই আমাকে গম্ভীর মুখে কবিভারতী বলে ডাকে। নীলিমা আজকাল দূর থেকে আমাকে দেখে আফসোস করে কি না জানি না, তবে আমি জেনে গেছি আমি একজন কবি হয়ে উঠেছি।
আমি স্বাবলম্বী স্বামী, বউয়ের গোলাম নই
মিনহাজ রাফি
আজ শনিবার। আমার পরম আকাঙ্ক্ষিত ছুটির দিন। চাদর মুড়ি দিয়ে মাত্র স্বপনপুরীর তিন নম্বর গেটে পৌঁছেছি, অমনি কানে এল শ্রীমতীর মেঘগম্ভীর গর্জন—
ওগো শোনো না, আজ তো তোমার অফ ডে। অলস হয়ে না শুয়ে থেকে আমাকে একটু হ্যাল্প করো? বাথরুমমের কাপড়গুলো একটু কেঁচে দাও না?
বাপরে! আমাকে আদেশ? আমি পুরুষ মানুষ, নিজের স্বাধীন সত্তা আছে না? বউয়ের কথায় উঠব আর বসব এমন পাত্র আমি নই! মনে মনে এক বিশালাকার হুঙ্কার দিয়ে মুখের ওপর বলে দেওয়ার সাহস না পেলেও, আমার অহংবোধ জেগে উঠল। আমি ঠিক করলাম, আমি বউয়ের কথা শুনবই না!
বউ আমাকে কাপড় কাঁচতে বলছে আমি তা করবো না। বউকে আমার ব্যক্তিত্বের জোর দেখাতে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে থালা-বাসনের পাহাড় নিয়ে বসে গেলাম। আমি বউয়ের কথা শুনে কেন কাপড় কাচবো? আমি কি বউয়ের গোলাম? আমি আজ এই থালাবাসন গুলো ধুয়ে দেখিয়ে দিব আমি তার বাধ্য স্বামী নই! তাই সাবান মেখে ফেনা তুলে ধুমধাম থালা-বাসন মেজে সাফ করে ফেললাম। মনে মনে এক গাল হেসে ভাবলাম, ‘দেখেছ? তুমি বললে কাপড় কাচতে, আর আমি ধুয়ে ফেললাম থালা-বাসন! একেই বলে নিজের মতে চলা। নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা'
কিছুক্ষণ পর বউ রান্নাঘরে এসে থালা-বাসন ঝকঝকে দেখে চোখ ছানাবড়া করে চেঁচিয়ে উঠল— — "ওমা! তোমাকে বললাম কাপড় কাচতে, আর তুমি থালা-বাসন ধুতে বসলে কেন? কথা কানে যায় না?"
বউয়ের রাগ দেখে আমার মনের ভেতরে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। আহা, কী প্রশান্তি! আজ আমি সত্যিই বউয়ের আদেশ অমান্য করতে পেরেছি!
"ঠিক আছে, যখন থালা-বাসন ধুয়েই ফেলেছ, এখন গিয়ে অন্তত ঘরটা মুছে দাও তো! পুরো ঘর ধুলো হয়ে আছে।" বউ বললো।
ঘর মোছা? হা হা! এবারও বউয়ের ফাঁদে পা দিচ্ছি না। আমি তো ওর আদেশের ধার ধারি না। সে আমাকে আদেশ দেওয়ার কে? এবারও আমিও বউয়ের কথা না শুনে সোজা বাথরুমে গিয়ে সকালের সেই ফেলে রাখা ময়লা কাপড়ের বালতি নিয়ে বসে গেলাম। কাচতে কাচতে ডলে ডলে কাপড়ের ১২ টা বাজিয়ে সাফ করে বারান্দায় মেলে দিলাম। কাপড় মেলা দেখে বউ এবার হাঁ করে তাকিয়ে বলল—
— "তুমি আবার কাপড় কাচলে কেন? ঘর মুছতে বললাম না?" আমি মনে মনে হাসলাম— ‘হেই হেই! আবার জয় হলো আমার স্বাবলম্বী মনের!’
দুপুরের দিকে বউ এসে বেশ ক্লান্ত স্বরে বলল— — "আচ্ছা বাবা, অনেক তো হলো। এবার অন্তত টেবিলে খাবারটা বেড়ে দাও, আমরা একসাথে খাই।"
আমি কি এতই সহজ পাত্র? বউ বলল খাবার বাড়তে, আর আমি বাড়ব? কক্ষনই না! আমি এক লাফে ঘর মোছার মোছা আর বালতি নিয়ে পুরো ঘর ফ্লোর-ক্লিনার দিয়ে একবারে আয়নার মতো চকচকে করে মুছে ফেললাম!
ঘর মোছা শেষ করে এসে বিজয়ের হাসিতে বউয়ের দিকে তাকালাম। ভাবলাম, আজ অন্তত প্রমাণ করতে পারলাম আমি আমার নিজের মনের মালিক, বউয়ের কথায় চলি না!
এক পায়ে খাঁড়া
মিনহাজ রাফি
ঘটক হাবুল চন্দ্রের কাজের ধরণই আলাদা। বিয়ে ভাঙুক আর গড়ুক, তার মুখের মিষ্টতা আর চতুর বাকপটুতার কাছে বড় বড় ঝানু লোকও হেরে যায়। তার সোজা কথা—"ঘটকালি হচ্ছে কথার কারসাজি, সত্যিটা একটু ঘুরিয়ে বললেই হলো!"
তো একদিন হাবুল ঘটকের কাছে এক পাত্রীপক্ষের বড় দূর সম্পর্কের আত্মীয় এলো। পাত্রীর নাম ময়না, দেখতে রাজকন্যার মতো সুন্দর, কাজকর্ম গুণেও একশতে একশ। তবে সমস্যা একটাই বাচ্চাকালে এক দুর্ঘটনার কারণে মেয়েটির একটি পা নেই, কৃত্রিম পায়ে ভর দিয়ে চলতে হয়। মেয়েটির বাবা বেশ দুশ্চিন্তায়, কিন্তু হাবুল ঘটক অভয় দিয়ে গোঁফে তা দিয়ে বলল, "আরে মিঞা ভাই! আপনারা চিন্তা করছেন কেন? হাবুল ঘটক থাকতে বিয়ে আটকাবে? এই মেয়ের রূপ-গুণেই ছেলে কাবু হয়ে যাবে, কথার দায়িত্ব আমার!"
হাবুল ঘটক সোজা চলে গেল নামকরা পাত্র কুদ্দুস মোল্লার বাড়ি। কুদ্দুসের পরিবার বেশ খুঁতখুঁতে, কিন্তু হাবুল তাদের ড্রয়িংরুমে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে এমনভাবে বর্ণনা শুরু করল যে বন্টুর বাবা-মা হা হয়ে শুনছিলেন।
"কাকা, মেয়ে তো নয় যেন সাক্ষাত লক্ষ্মী!" হাবুল হাত নেড়ে বলল, "রূপ যেন ফেটে পড়ছে, চাল-চলন, হাঁটা-চলা সব নিখুঁত! আর মেজাজ? ওরে বাবা! ছেলে যদি এখন রাজি হয়, মেয়ে এখনই এক পায়ে খাঁড়া!"
কুদ্দুসের বাবা সানন্দে হেসে উঠলেন, "বলেন কী ঘটক মশাই? আজকের দিনে এমন মেয়ে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার! এক পায়ে খাঁড়া মানে তো রাজি হতে এক মুহূর্তও দেরি করবে না!"
হাবুল মুচকি হেসে বলল, "আমি তো বানিয়ে বলি না কাকা! হুবহু যা সত্যি সেটাই বললাম মেয়ে আসলেই বিয়ের জন্য একদম এক পায়ে খাঁড়া!"
কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। অবশেষে এল সেই দিন পাত্রপক্ষ সশরীরে পাত্রী দেখতে এসেছে। হাবুল ঘটক আগেই বুদ্ধি করে মেয়েটিকে সোফায় বসিয়ে দিয়েছিল, তাই আসার সময় কেউ খেয়াল করেনি। মেয়েটির সুমিষ্ট ব্যবহার আর রূপ দেখে পাত্র কুদ্দুস তো এক দেখাতেই এক পায়ে নাচে!
কিন্তু গোল বাধল নাশতা পর্ব শেষে। মেয়েটি সবাইকে সালাম জানিয়ে বসার ঘর থেকে উঠে দাঁড়াতে গেল। অমনি দেখা গেল মেয়েটির একটি পা কৃত্রিম।
কুদ্দুসের বাবা চোখ ছানাবড়া করে চশমাটা মুছে আবার তাকালেন। পুরো ঘরে একদম পিনপতন নীরবতা। কুদ্দুস হাঁ করে তাকিয়ে আছে, আর তার মা প্রায় মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়!
কুদ্দুসের বাবা রাগে লাল হয়ে ঘটক হাবুলের দিকে ফিরে গর্জে উঠলেন, "ঘটক! এসবের মানে কী? আপনি আমাদের এত বড় ধোঁকা দিলেন? মেয়েটার যে একটা পা-ই নেই, এটা আপনি আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে গেলেন?!"
হাবুল ঘটক বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে, মুখে সবচেয়ে নিষ্পাপ হাসিটি ফুটিয়ে হাত দুটো জোড় করে বলল, "কাকা! আপনি আমার ওপর মিছামিছি রাগ করছেন! আমি আপনার কাছে কোনোদিন মিথ্যা বলেছি? আপনিই বলুন, যেদিন প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলাম, সেদিন কি আমি নিজ মুখে বারবার বলিনি যে—মেয়ে বিয়ের জন্য এক পায়ে খাঁড়া'?"
সারভাইভাল অব দ্য রিজেক্টেড
মিনহাজ রাফি
তখন ক্লাস এইটে পড়ি। চঞ্চলতা আর বোকামির এক অপূর্ব ককটেল ছিলাম আমি। আমাদের ক্লাসে একটা মেয়ে ছিল একদম পুতুলের মতো দেখতে, চোখ দুটো যেন সবসময় ছলছল করছে। যাকে দেখে পুরো ক্লাসের ছেলেরা একযোগে ক্রাশ খেয়ে ফ্ল্যাট হয়ে যেত। তো, স্বাভাবিকভাবেই আমিও সেই মিছিলে নাম লেখালাম।
মাস তিনেক ছায়ার মতো তার পিছে পিছে ঘুরলাম। সে যে গলি দিয়ে হাঁটত, আমি সেই গলির মোড়ে অলস দাঁড়িয়ে থাকার বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেললাম।
শেষমেশ সুযোগ এল স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। চারপাশে হইচই, মাইকে গান বাজছে এমন আনরোমান্টিক এক মুহূর্তে আমি বুক ফুলিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ধুপধাপ কাঁপতে থাকা বুকে শাহেনশাই ভাব নিয়ে বলেই ফেললাম, “আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
মেয়েটা এক সেকেন্ড আমার দিকে তাকাল। তারপর এমন একটা এক্সপ্রেশন দিল, যেন আমি তার কাছে ভালোবাসা চাইনি, চাঁদা চেয়েছি! সোজাসুজি রিজেক্ট করে দিয়ে হেঁটে চলে গেল।
ছোটকালের প্রেম, আবেগের তো আর কমতি নেই! রিজেক্ট খেয়ে আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। নাওয়া-খাওয়া ভুললাম (মানে সকালে দুটো পরোটা কম খেলাম আরকি)। কিছুদিন পর আবার গেলাম তার কাছে। এবার ট্রাম্প কার্ড ব্যাগে নিয়ে গেছি। গিয়ে একদম গম্ভীর মুখে বললাম, “জানো? ডাক্তার আমাকে বলেছে... আমি যদি তোমাকে না পাই, তবে আমি আর বেশিদিন বাঁচব না!”
বাংলা সিনেমার সেই বিখ্যাত ডায়লগ শুনে মেয়েটি একটু থামল। আমি ভাবলাম, ব্যস! এবার কাজ হয়েছে, প্রেম জমে ক্ষীর! কিন্তু মেয়েটি আমার দিকে এমন এক নিষ্ঠুর চাহনি দিল, যেন আমি কোনো আজব এলিয়েন। কোনো কথা না বলে সোজা মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। এক ফোঁটা পাত্তা দিল না!
এরপর তো দিন কেটে গেল। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। আমরা যার যার মতো অন্য কলেজে চলে গেলাম। যোগাযোগও বন্ধ, জীবনের টানে সেই ছোটবেলার ক্রাশও স্মৃতির ধুলোয় ঢাকা পড়ে গেল।
আজকে কেটে গেছে কয়েক বছর...
গত দুদিন ধরে গায়ে ধুপধাপ ১০২ ডিগ্রি জ্বর। মাথাব্যথায় চোখ মেলতে পারছি না। পাশের গলির নতুন ক্লিনিক খুলছে। সেখানে গেলাম ডাক্তার দেখাতে।
একদম কাঁপতে কাঁপতে চেম্বারে ঢুকলাম। চেম্বারে ঢুকেই আমি অবাক স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলি রাখা মেয়েটি আমার সেই ছোটবেলার প্রেম। সেই ছলছলে চোখের মেয়েটি এখন সে পুরোদস্তুর এমবিবিএস ডাক্তার!
আমাকে চিনতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে চোখ দুটো বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল। স্টেথোস্কোপটা টেবিলের ওপর রেখে চশমাটা একটু টেনে নামাল। তারপর অত্যন্ত গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল, কিরে? তুই এখনো বেঁচে আছিস?"
আমার তখন ১০২ ডিগ্রি জ্বরের মধ্যেও শরীর বরফ হয়ে গেল। আমি ঢোক গিলে বললাম, “মানে... না মানে... ডাক্তার উন্নত মানের মেডিসিন দিয়েছিল তো, তাই বেঁচে আছি আরকি!”
মেয়েটি হালকা হেসে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলল, “হুম, বুঝতে পারছি। তোকে তো পনেরো বছর আগেই ডাক্তার স্পেশাল ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছিল! যা হোক, এখন তো তুই আমার কাছেই এসেছিস। দাঁড়া, তোকে এমন কড়া অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছি, যাতে তুই চিরতরে... আই মিন, জ্বর থেকে চিরতরে মুক্তি পাস!”
#রম্য
মনে মনে আমি অনেক ধনী
টাকা-পয়সার দিক থেকে আমি যে ঠিক কোন স্তরের গরীব, তা বোঝাতে একটা উদাহরণ দিই। রাস্তায় কোনো ভিক্ষুক হাত পাতলে আমার ভেতরে হঠাৎ এক জমিদার জেগে ওঠে। মনে মনে নিজেকে আম্বানির বংশধর মনে হয়। মনে মনে আমি তাকে একটা ব্র্যান্ড নিউ ফ্ল্যাট আর পাঁচ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট লিখে দিই। কিন্তু বাস্তব জগতে পকেটে হাত দিয়ে দেখি, একটা দশ টাকার ময়লা নোট এক কোণায় জবুথবু হয়ে বসে আছে যেটা দিয়ে একটা সিঙ্গারা আর এক কাপ লাল চা-ও ইদানীং ঠিকঠাক মেলে না।
আমি মনের দিক থেকে প্রচণ্ড ধনী। বিল গেটস বা এলন মাস্ক আমার কাছে বাচ্চা ছেলে। আমার ধারণা, পৃথিবীর যেকোনো বড় দাতব্য সংস্থার চেয়ারম্যান যদি আমার মনের ভেতরে এসে আধঘণ্টা ঘুরে যান, তিনি পদত্যাগ করে আমার পায়ে সালাম করে যাবেন। আমার মনে কোনো কৃপণতা নেই।
সেদিনের কথাই ধরা যাক। আমার বন্ধু সোহেল। সেদিন সে ফোন করলো। দীর্ঘ ২৭ মিনিট তার দুঃখের কথা শুনলাম। তার আম্মা হাসপাতালে ভর্তি। টাকা লাগবে প্রচুর। আমি মনে মনে তার পুরো লোন মওকুফ করে দিলাম হাসপাতালের বিল চুকিয়ে দিলাম, এমনকি তার একটা সুইমিং পুলসহ বাড়িও বানিয়ে দিলাম। কিন্তু মুখে শুধু বলি, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে রে, মন শক্ত কর।’
এই যে মনের ভেতর কোটিপতি আর পকেটে ফকির এই দুইয়ের টানাটানিতে আমার জীবনটা চলছে।
কয়েক দিন আগের কথা। বাজারে গেছি। এক বুড়ো লোক খুব শীতে কাঁপতে কাঁপতে রুই মাছ বিক্রি করছেন। দৃশ্যটা দেখে আমার মনের ভেতর রবিন হুড জেগে উঠল। মনে মনে ভাবলাম, ‘আজ এই জ্যাঠামশায়ের সব মাছ আমি কিনে নেব। তারপর উনাকে একটা দামি জ্যাকেট কিনে দিয়ে বলব বাড়ি গিয়ে রেস্ট নেন।’
সোজা এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘চাচা, সবগুলো রুইয়ের দাম কত?’
উনি চোখ বড় বড় করে হিসাব কষে বললেন, ‘ চার হাজার টাকা।’
কথাটা শুনেই পকেটে হাত দিলাম। একটা পঞ্চাশ টাকার নোট আঙুলে ঠেকলো, তা-ও কোণ ছেঁড়া। নিজেকে মনে হলো হতদরিদ্রেরও চেয়ে নিন্মস্থরের প্রাণী।
আমি খুব গম্ভীর হয়ে রুই মাছের আঁটি হাতে নিয়ে বললাম, ‘চাচা, মাছগুলো বরফের। বরফের মাছ খাওয়া উচিত না।’
বলেই মাছ রেখে হাঁটা দিলাম। লোকটা ভূত দেখার মতো তাকিয়ে রইল। মনে মনে জমিদারি করা সহজ, কিন্তু বাস্তবের পঞ্চাশ টাকা বড় নির্দয়।
আমার স্ত্রীকে এই ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়েছিলাম একদিন। চা খেতে খেতে বললাম, ‘জান্, আমার যদি অঢেল টাকা থাকত, আমি দেশের সব গরীব মানুষের দুঃখ দূর করে দিতাম। আমি যে মনে মনে কতটা ধনী তোমাকে বুঝাতে পারব না।
স্ত্রী কাপে আর একটু চা ঢেলে দিয়ে বললেন, ‘দেশের কথা পরে ভাবিয়ো। আগে সামনের মাসের বাড়িভাড়া আর দুধওয়ালার বকেয়াটা দূর করো। তা না হলে তোমাকে আমাকে দুজনকেই বাড়িওয়ালা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে। তখন কই থাকবো তোমার মনের বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ‘বাদ্দাও তুমি বুঝবে না। ছোট চিন্তা দিয়ে বড় মন মাপা যায় না।’
স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বড় মন দিয়ে তো আর চাল-ডাল কেনা যায় না গো। কাল থেকে মন একটু ছোট করো, পকেটটা বড় করার চেষ্টা করো।
’
বউয়ের কথায় কান দিলাম না। কারণ আমি জানি মনে মনে আমি ধনকুবের।আমার মনে একটা বিশাল রাজপ্রাসাদ আছে সেখানে আলো জ্বলছে, ঝাড়বাতি ঝুলছে, সিকিউরিটি গার্ড স্যালুট ঠুকছে। আমি মনে মানুষকে কোটি কোটি টাকা দান করি, বন্ধুদের গাড়ি কিনে দিই, রাস্তার সব গৃহহীনকে বাড়ি বানিয়ে দিই। আমার কোনো কার্পণ্য নেই। এছাড়াও মনে মনে দান-ধ্যান করার একটা সুবিধা আছে। মনে মনে দান-ধ্যান করলে করলে আয়করের কোনো ঝামেলা নেই। সরকার এখনো ভাবনার সম্পত্তির ওপর ট্যাক্স বসায়নি। যেদিন বসাবে, সেদিন হয়তো আমি মনে মনেও ফকির হয়ে যাব!
ওভারটাইম
মিনহাজ রাফি
আমাদের পরিবারে সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তিটিকে চেনেন? ঘরের বউ? না ভাই, ভুল উত্তর! তিনি হচ্ছেন আমাদের ঘরের বুয়া। বউ রাগ করলে দুদিন না হয় কড়া কথা শুনবেন, মন খারাপ করে থাকবে কিন্তু বুয়া একদিন রাগ করে কাজ কামাই করলে বাসায় হাঁড়ি-পাতিলের যে পর্বত তৈরি হয়, তার সামনে এভারেস্টও হার মানবে। এবং সে এভারেস্ট আবার আমারই পরিষ্কার করতে হতে পারে।
গত মঙ্গলবারের ঘটনা।
আমি ল্যাপটপে অফিসের অতি জরুরি এক কাজ করছি। হঠাৎ পেছন থেকে এক খাঁটি গম্ভীর আওয়াজ, “সাহেব, একটা কথা ছিল।”
আমি চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি বুয়া হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুয়ার নাম খোদেজা হলেও আমরা তাকে রাবেয়ার মা বলেই ডাকি। মুখের ভাব বেশ চিন্তাশীতল, যেন জাতিসংঘের কোনো শান্তি কমিশনে প্রস্তাব পেশ করতে এসেছে।
আমি কৌতূহল নিয়ে বললাম, “কী ব্যাপার রাবেয়ার মা? তোমার খালাম্মা তো বাজারে গেছে। কোনো সমস্যা?”
রাবেয়ার মা একটা ঠান্ডা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সমস্যা না সাহেব , হকের কথা কইতে আইছি। অহন যে ঘর মুছলাম, হেইডা তো আমার রোজকার কাম। কিন্তু বুজি (খালাম্ম) বাজারে যাওয়ার আগে কইয়া গেল ফ্রিজ পরিষ্কার করতে আর রান্নাঘরের সব বয়ম ধুইয়া দিতে। এইগুলা তো আমার ডিউটির বাইরের কাম!”
আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম, “তা ঠিক... তবে খালাম্মেকে একটু সাহায্য করলে....?”
“সাহায্য তো করুমই সাহেব, মানুষ তো মানুষের জন্যই! তবে নির্ধারিত কামের বাইরে এক মিনিট বাড়তি খাটলে আমারে ওভারটাইম' দিতে হইবো। ঘণ্টা হিসাবে দুইশো ট্যাকা!”
আমি হা করে বুয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওভারটাইম! করপোরেট অফিসে দিনরাত গাধার খাটুনি খেটেও যে শব্দটা বসের সামনে মুখ ফুটে বলতে আমার হাত-পা কাঁপে, সেই শব্দ আজ আমার ঘরের রাবেয়ার মার মুখে!
আমি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “রাবেয়ার মা, তুমি এই ওভারটাইম জিনিসটা শিখলা কই থেকে?”
বুয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ক্যান? পাশের ফ্ল্যাটের মাজেদা বুয়ার পুতে আইটি কোম্পানিতে চাকরি করে না? সে মাজেদারে বুঝাইয়া দিছে—ডিউটির বাইরে বাড়তি কাজ করলেই নাকি ওভারটাইম দাবি করা নাগরিক অধিকার! আমি কি কিসসু বুঝি না ভাবছেন?”
আমি এবার একটু দুষ্টুমি করে বললাম, “আচ্ছা রাবেয়ার মা, ধরলাম তোমাকে ওভারটাইম দিলাম। কিন্তু প্রতিদিন সকালে যে তুমি আধঘণ্টা দেরিতে আসো, আর এসেই বিশ মিনিট মোবাইলে রাবেয়ার শাশুড়ির গুষ্টি উদ্ধার করো সেটার জন্য যদি আমরা লেট ফাইন আর টাইম কাট করি, তবে মাস শেষে তোমার কত টাকা কাটা যাবে হিসাব করে দেব?”
কথাটা শুনে বুয়া এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তবে পাকা ডিপ্লোমেটের মতো নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “সাহেব, ওইটা তো আমার টি-ব্রেক আর পার্সোনাল কল! আপনেরা অফিসে গিয়া বুঝি খালি কাজই করেন? বউরে কল দেন না?একটু চা-সিগারেট খান না? আমি তো আর চা-সিগারেট খাই না, খালি দুইডা সুখ-দুঃখের কথা কই!”
বাপরে অফিসের এইচআর পলিসি যে বুয়া এত নিখুঁতভাবে বুঝে ফেলেছে, তা আমার কল্পনার বাইরে ছিল।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ কফি কাপে চুমুক দিলাম। কিছুক্ষণ পর বউ বাজার থেকে ফিরতেই রাবেয়ার মা তাঁর প্রস্তাব বউয়ের দরবারে পেশ করল।
আমি ভাবলাম, বউ নিশ্চয়ই এইসব শুনেই তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দেবেন। কিন্তু বউ অতি শান্ত মাথায় বাজারের ব্যাগটা টেবিলে রেখে বললেন, “বেশ তো রাবেয়ার মা, তোমাকে ওভারটাইমই দেওয়া হবে। তবে অফিসে যেমন নির্দিষ্ট ছুটির চেয়ে বেশি ছুটি নিলে বেতন থেকে টাকা কাটা যায়, তোমারও অতিরিক্ত ছুটির জন্য দিনপ্রতি ২০০ টাকা করে কাটা যাবে। আর কাজ কিন্তু নিখুঁত হতে হবে।”
বুয়া যেন এই চালে একটু ধাক্কা খেল। চুক্তিপত্র সাইন হওয়ার আগেই সে হিসেব কষতে বসে গেল সপ্তাহে দুদিন ডুব দিলে মাসের শেষে ওভারটাইমের বেনিফিট মাইনাস হয়ে মূল বেতনে টান পড়বে!
বুয়া ঝাড়ুটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, “থাক খালাম্মা, আপন মানুষদের কাছে আবার কিসের ওভারটাইম! সংসার তো আর কোম্পানি না। ফ্রিজটা আমি এমনিতেই মুছে দিতাছি। তবে ঈদের বোনাসের সময় কিন্তু এই দয়ার কথাটা মনে রাখতে হইবো!”
যুদ্ধবিরতি ঘষিত হলো। বুয়া সশব্দে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল, আর আমি বউয়ের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে স্যালুট ঠুকলাম। সত্যি, বঙ্গীয় গৃহিণীদের মতো সূক্ষ্ম ডিপ্লোমেসি আর বিশ্ব রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা পুতিনদের মধ্যেও বোধহয় নেই!
তবে একটা ভয় থেকেই গেল। আগামী মাসে যদি রাবেয়ার মা এসে মেডিকেল অ্যালাউন্স আর পারফরম্যান্স বোনাস এর দাবিতে ধর্মঘট ডেকে বসে, তবে মনে হয় আমাকেই হাতে ঝাড়ু তুলে নিতে হবে ঘর পরিষ্কার করার জন্য
চৌ-সংগ্রাম
মিনহাজ রাফি
তো বন্ধুরা, সত্যি বলতে কী, ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি—"বিয়ের লাড্ডু নাকি যে খায় সেও পস্তায়, আর যে না খায় সেও পস্তায়।" কথাটার মানে তখন ঠিকঠাক বুঝতে পারিনি। কিন্তু জীবনে যখন একে একে চারটে পবিত্র বন্ধন গলায় জড়িয়ে ফেললাম, তখন গিয়ে পরিষ্কার বুঝলাম বন্ধন জিনিসটা যতই শক্ত হোক না কেন, চারটে একসঙ্গে গলায় পড়লে তা আর পবিত্র থাকে না, রীতিমতো ফাঁসির রশির মহড়া বলে মনে হয়! আজ আপনাদের কাছে শেয়ার করবো আমার জীবনের কিছু করুণ কাহিনি। কীভাবে চারটে বিয়ে মানুষের জীবনকে স্বর্গ থেকে নরকে নামিয়ে আনতে পারে, সেটাই আজ আপনাদের খুলে বলব।
শুনুন, বিয়ের সংখ্যা যখন একটাই থাকে, তখন জীবনটা বেশ সহজ-সরল। বউয়ের জন্মদিনে একটা ফুল দেওয়া, বিবাহবার্ষিকীটা কোনোমতে মনে রাখা। দুটো হলে নয়তো একটু আধটু ক্যালকুলেশন বাড়ত। কিন্তু চারটে হলে গনিতে পাশ করা ছেলেরাও জীবনের গনিত মেলাতে হিমশিম খেয়ে যায়।
আমার চার স্ত্রীর নাম চার রকম, মেজাজ চার মেরুর, আর শপিংয়ের চাহিদা দেখলে মনে হবে যেন চারটে বহুতল বিপণিবিতান সামলাচ্ছি। অবস্থা এমন জায়গায় ঠেকেছে যে, আমার ফোনে এখন চারটে আলাদা আলাদা অ্যালার্ম সেট করা থাকে। সকাল আটটায় প্রথম স্ত্রীর চা খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার রিমাইন্ডার, দুপুর বারোটায় দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে লাঞ্চের সময় ফোনে কথা বলার ডেডলাইন, বিকেল চারটায় তৃতীয় স্ত্রীর বাচ্চার স্কুল থেকে ফেরার আপডেট নেওয়ার টাইম, আর সন্ধ্যা সাতটায় চতুর্থ স্ত্রীর সাথে ইনস্টাগ্রাম রিল বানানোর স্লট। মাঝে মাঝে কি হয় জানেন? ভুলবশত তৃতীয় স্ত্রীর কথা প্রথম স্ত্রীকে বলে ফেলি, আর অমনি এমন এক কাণ্ড ঘটে যে মনে হয় আমেরিকার স্পেস এক্স-এর রকেটের চেয়েও দ্রুত গতিতে আমার কেরিয়ার এবং জীবন ধ্বংসের মুখে এগিয়ে চলেছে! যেমন সেদিন ঘটেছিল এক মারাত্মক কাণ্ড। সেদিন সকালবেলা আমি তাড়াহুড়োয় প্রথম স্ত্রীকে মেসেজ করার বদলে ভুলবশত তৃতীয় স্ত্রীকে লিখে ফেলেছি "আজকে অফিস থেকে ফেরার পথে তোমার পছন্দের সেই খাসির রেজালাটা নেব সোনা!"
ব্যাস! ফল যা হওয়ার তাই হলো। আধঘণ্টার মধ্যে প্রথম স্ত্রীর ফোন এল, "খাসির রেজালা কি তোমার বাপের সম্পত্তি নাকি যে শুধু একজনের জন্য আনবে? আমার কথা তো ভুলেই গেছ!" এইভাবে চারটে সংসার সামলাতে সামলাতে এখন আমার অবস্থা এমন হয়েছে যে, আমি নিজেই ভুলে গেছি আসল উইকেন্ড বা ছুটির দিন ঠিক কবে ছিল।
আপনারা হয়তো মনে মনে ভাবছেন, চারটে বিয়ে করা মানে তো চার গুণ বেশি ভালোবাসা পাওয়ার কথা! কিন্তু হে ভাইসব, একটু ঠান্ডা মাথায় হিসাবটা বুঝুন। ভালোবাসা তো দূরের কথা, এটি হলো সোজাসুজি দেউলিয়াপত্র দাখিল করার চারটে নিশ্চিত পথ। বছর ঘুরে যখন ভালোবাসা দিবস, পহেলা বৈশাখ কিংবা চারজনের আলাদা চারটে জন্মদিন আসে, তখন আমার পকেট থেকে যে পরিমাণ টাকা ওড়ে, তা দিয়ে দিব্যি একটা জমি কিনে ফেলা সম্ভব ।
সমস্যা হলো, উপহার চারজনকে দিতে হবে একদম আলাদা আর ইউনিক। এক বউকে একই পারফিউম দুবার দিলেই সে সোজা গোয়েন্দা সংস্থায় নাম লিখিয়ে ফেলবে। ফলে আমাকে বাধ্য হয়ে চার রকম ব্র্যান্ডের কসমেটিকস, চার রকম শাড়ি আর চার রকম ডিজাইনের গহনা কিনতে হয়!"
এদিকে চারজন স্ত্রী মানে চারজন ভিন্ন ভিন্ন রান্নার শেফ, চার রকম রুটিন, আর চার রকম সিরিয়ালের শিডিউল। আমাদের ড্রয়িংরুমের টিভি রিমোটটি এখন যে কোনো আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি সংবেদনশীল একটা বস্তু!
প্রথম জন ভালোবাসে খবরের চ্যানেল দেখতে, দ্বিতীয় জন মেগা সিরিয়াল, তৃতীয় জন চায় কার্টুন—ওই বাচ্চার উছিলায়, আর চতুর্থ জন আবার ইউটিউবের কোনো নতুন মেকআপ টিউটোরিয়াল। রিমোট কার হাতে থাকবে এই নিয়ে আমাদের ঘরে যে মহাভারত শুরু হয়, তাতে ট্রয় নগরীর পতনও একদম ফিকে হয়ে যায়। একবার তো রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ির চোটে আমাদের ড্রয়িংরুমের কাচের টেবিলটাই ভেঙে দু টুকরো হয়ে গিয়েছিল!
আর ফ্রিজের ভেতরের অবস্থা তো আরও করুণ। ফ্রিজটা খুললেই দেখা যায় চারটে আলাদা কোণায় চার বউয়ের চার রকম ডায়েট ফুড আর স্পেশাল কেমিক্যাল মেশানো ফলের জুস সাজানো রয়েছে। প্রথম জনের অর্গানিক ভেজিটেবল জুস, দ্বিতীয় জনের কেটোজিনিক ডায়েটের প্রোটিন শেক, তৃতীয় জনের বাচ্চার হরলিক্স, আর চতুর্থ জনের গ্লুটেন-ফ্রি সালাদ। মাঝখান থেকে আমার নিজের জন্য বরাদ্দ বলতে কোণায় পড়ে থাকা একটা শুকনো পরটা আর এক ফোঁটা জল! একবার ভুল করে দ্বিতীয় জনের কেটো শেক থেকে এক চুমুক খেয়ে ফেলেছিলাম, তারপর তিন দিন ঘরের বাইরে আমাকে অনশন করতে হয়েছিল।
লোকে বলে দুই কান এক হলে নাকি গোপন কথা ফাঁস হয়ে যায়। আর আমার চারটে বউয়ের মোট আটটা কান সবসময় একদম সজাগ থাকে আমার ওপর কড়া নজরদারি করার জন্য! রাতে বিছানায় শুয়ে যখনই একটু আরামে নাক ডাকার অপরাধ করতে যাই, অমনি চার দিক থেকে চারটে ফোন কল বা মেসেজ পিনিক তুলে বেজে ওঠে। কেউ জানতে চায় আমি ঠিক কোথায় আছি—অথচ আমি হয়তো তাদেরই কারও বিছানাতেই আছি!—কেউ বা আবার আগের কোনো এক পুরনো ভুলের হিসাব মেলাতে বসে যায়। সারাদিন চার্লি চ্যাপলিনের সিনেমার মতো এই ঘর থেকে ওই ঘরে দৌড়ঝাঁপ করার পর রাতে একটু শান্তির ঘুমের যে আশা থাকে, তা এখন রূপকথার গল্পের মতো অবাস্তব ঠেকে।
তাই ভাইসব, শেষপাতে এই অভিজ্ঞ ব্যক্তির আপনাদের প্রতি একটাই ছোট নিবেদন—প্রেম করুন, জীবনটা মন খুলে উপভোগ করুন, কিন্তু বিয়ের কোটাটা দয়া করে এক এবং অদ্বিতীয়তেই সীমাবদ্ধ রাখুন। চারটে বিয়ে করার শখ যদি সত্যিই কারো ঘাড়ে চাপে, তবে তাকে হাত জোড় করে বলুন তার চেয়ে সোজা একটা আস্ত চিড়িয়াখানায় একটা করে সিংহ সামলানো অনেক নিরাপদ ও কম ঝামেলার!
দোয়া
মিনহাজ রাফি
এই শহরে আসলে কোনো নিরাপত্তা নাই। এই শহরে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা মানে কোনো মাইনফিল্ডে পা রাখা। পদক্ষেপে পদক্ষেপে থ্রিল, আর পকেটের জন্য নিশ্চিত থ্রেট। কখন কার পকেট বা মানিব্যাগ হাওয়া হয়ে যাবে, তা স্বয়ং আজরাইলও হয়তো ঠিকমতো বলতে পারবে না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা সংসার ট ট করে ট টানি, এই শহর তাদের জীবন বা মালের কোনো গ্যারান্টি দেয় না। গ্যারান্টি কেবল একটাই আপনি কখন নিঃস্ব হবেন!
ঘটনাটা গতকাল রাতের। ওভারটাইম ঘানি টেনে বাসায় ফিরছি। ঘড়ির কাঁটায় তখন আনুমানিক রাত তিনটা। রাস্তাঘাট একদম সুনসান, কাকপক্ষী তো দূরের কথা, একটা কুত্তাই দেখা যাচ্ছে না। রিকশা বা কোনো গাড়ির দেখা না পেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি।
এমন সময়, নিঝুম রাতের নিরবতা ভেঙে কোত্থেকে যেন এক আধা-হিরো, আধা-সিনেমা ভিলেন টাইপের ছেলে ঝাপটে ধরল আমার পকেট! আর তার হাতে ঝলমল করছে একটা চকচকে সুইচ গিয়ার যেন রাতের আঁধারে জোনাকি পোকার আধুনিক সংস্করণ।
আমি তো ভয়ে একেবারে কাঠ! মনে হলো, এই বুঝি আমার ইহকালের সব হিসাব-নিকাশ চুকেবুকে গেল।
ছেলেটা এক্কেবারে পাক্কা মাস্তানি সুরে ফিসফিস করে বলল,
"শালার, চিল্লাচিল্লি করবি না। যা আছে মানিব্যাগে আর পকেটে, চুপচাপ বের করে দে। রক্তপাত আমি একদম পছন্দ করি না!"
আমার তখন আক্কেল গুড়ুম। না পারছি দৌড়াতে, না পারছি চিৎকার করতে। ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আমার স্মার্টফোন আর মানিব্যাগটা তার হাতে তুলে দিলাম। মানিব্যাগে তখন ক্যাশ ক্যাশ দশ হাজার টাকা গোঁজা! মাসের একেবারে শুরুর দিক, তাই পকেটে একটু অন্যরকম জোশ ও ওজন ছিল।
ছেলেটা বেশ পোড় খাওয়া ক্রিকেটারের মতো সাবলীল দক্ষতায় ফোনটা তার পকেটে ঢোকালাল। এরপর মানিব্যাগটা খুলে দশ হাজার টাকার একদম কড়কড়ে নোটের বান্ডিলটা বের করে নিজের পকেটে ভরল।
আমি তখন মনে মনে প্রমাদ গুণলাম— যাক বাবা, জানের ওপর দিয়ে যাওয়ার চেয়ে মালের ওপর দিয়ে যাওয়া তো ঢের ভালো! অন্তত বেঁচে তো ফিরছি।
কিন্তু সব টাকা আর ফোনটা পকেটে ঢোকানোর পর ছেলেটা হুট করে একটা বেশ লম্বা, বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল! তারপর আমার কাঁধে আলতো করে রাখল একটা হাত। একদম কোনো পাড়াসম্পর্কীয় হিতৈষী চাচার মতো পরম মমতায়!
খুব মায়াবী, ভরাট ও আবেগঘন গলায় সে বলে উঠল,
"ভাইজান, আপনার টাকাগুলো আমি নিলাম। কী করব বলুন, পেটের দায়ে করি, শখের বশে তো আর করি না!"
আমি তো তখন আমার থার্ড আই খুলে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছিনতাইকারী আবার এত সহানুভূতিশীল হয় নাকি রে ভাই!
সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মোনাজাতের ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে দিল আকাশে! তারপর গলা ধরে এনে বলতে শুরু করল:
"হে পরওয়ারদিগার! আমার এই ভাইটার আজ পকেট ফাঁকা হয়ে গেল। হে আল্লাহ, তুমি আমার এই ভাইটাকে আরও বরকত দান করো! এই ১০ হাজার টাকা সে হারাল, তার বদলে তুমি তার ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরিতে এমন উন্নতি করে দিও, যেন সে প্রতিমাসে এমন দশটা ফোন কিনতে পারে! হে রহমানুর রাহিম, তুমি ভাইটিকে তোমার রহমতের চাদরে ঢেকে দাও। আজকে তার কাছ থেকে আমি যা নিলাম, তার দশ গুণ, না না... শত গুণ বরকত তুমি তারে দিও! আর আমাদের এই পাপ মাফ কইরো খোদা, ভাইয়ের বুকটা একটু ঠান্ডা কইরা দিও। আমিন!"
দোয়া শেষ করে ছিনতাইকারীটা আমার পিঠে বেশ জোড়েশোরেই একটা স্নেহের থাপ্পড় বসিয়ে দিল। তারপর বলল, "মন খারাপ কইরেন না ভাই। টাকা-পয়সা তো হাতের ময়লা, আজ আছে কাল নাই। মানুষের জীবনে আপডাউন থাকতেই পারে। এইবার সোজা বাসায় চইলা যান, বউয়ের লগে আবার গিয়া চিল্লাপাল্লা কইরেন না। আল্লাহ ভরসা!"
এই বলেই সে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে চোখ মুছল কি মুছল না, এক দৌড়ে গলির গভীর অন্ধকারে চোখের পলকে মিলিয়ে গেল!
আমি তখনো ফুটপাতে একটা পাথরের স্ট্যাচুর মতো একা একা দাঁড়িয়ে আছি। আকাশে চাঁদ হাসছে, বাতাসে হিমেল পরশ, পকেট একদম হালকা আর আমার মাথায় তখন হাজারো সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আমাদের নিরাপত্তা কই....
ভিটামিন এম
মিনহাজ রাফি
সকালের সূর্য ওঠার আগেই আমাদের ঘুম ভাঙে কার ডাকে? মোরগের ডাকে? ভুল! পাখির ডাকে? একদম না! আমাদের ঘুম ভাঙে পকেটে বা বালিশের পাশে থাকা সেই পরম আরাধ্য রত্ন মোবাইলফোনের-এর মৃদু গুঞ্জন বা অ্যালার্মের টুংটাং শব্দে।
পৃথিবীতে বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো একটা চরম সত্য আবিষ্কার করতে পারলেন না। সত্যটা হলো মানুষের শরীরে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন আর ভিটামিন এ-সি-ডি-এর পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি দরকার হয় এক অদৃশ্য শক্তির, যার পোশাকি নাম ভিটামিন এম অর্থা ভিটামিন মোবাইল।
ভিটামিন এম এর অভাবে আমাদের হতে পারে ডিজিটাল প্যারালাইসিস। যা চোখ দিয়ে সরষে ফুল দেখার চেয়েও মারাত্মক কিছু! এছাড়াও এই ভিটামিনের অভাবে আমাদের হতে পারে স্ক্রিন-শূন্যতা জনিত রক্তাল্পতা, নোটিফিকেশন ফোবিয়া, চার্জ-অ্যাংজাইটি ডিজর্ডারসহ আরো কত কি..
আজ সকালের কথাই ধরা যাক। আজ আমার হয়েছিল চার্জ-অ্যাংজাইটি ডিজর্ডার। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমার মোবাইলটা একদম মৃত। চার্জার লাগানোর পর স্ক্রিন যখন কালো হয়ে রইল, তখন আমার মনে হলো মাথার ওপর আস্ত একটা আকাশ ভেঙে পড়েছে। শরীরের সব শক্তি যেন এক নিমিষে উবে গেছে। খিদে কমে গেছে। চোখে ঝাপসা দেখতে থাকি। আমার মনে হয়েছিল, আমার শরীরের সমস্ত রগ-রেশা থেকে যেন ভিটামিনগুলো সব একনিমেষে উবে গেছে। বুকটা কেমন যেন হাহা করছে। আহা, ঠিক যেন মরুভূমির মাঝে এক ফোঁটা জলের তৃষ্ণা! অন্যদিকে আমার ছোট ভাই সিয়াম
পাশের টেবিলের বসে ফোনে কি যেন একটা রিলস দেখে একা একা হাসছেন, আর আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছেন যেন আমি এই পৃথিবীর কেউ না। তার সব আছে কিন্তু আমার কিছু নাই...
আমাদের বাড়িতে একটা ছোটখাটো জরিপ চালিয়ে দেখলাম। আমার ছোট বোন থেকে শুরু করে খোদ আম্মা সবার অবস্থা একই রকম। আম্মার তো সারাদিন রান্নাবান্নার হাজারটা টেনশন, কিন্তু দুপুরের দিকে রান্নাঘরের কাজ শেষ করেই খাটের কোণায় বসে রিলস স্ক্রোল না করলে নাকি তাঁর প্রেসার ঠিক থাকে না! শরীরে জ্বর উঠে যায়। একদিন আব্বা মজা করে বললেন, "কিরে তোদের মোবাইলে কি কোনো গোপন ভিটামিন দেওয়া আছে নাকি রে? একটা দিন হাতছাড়া হলে তোদের চেহারা মরা গরুর মতো হয়ে যায় কেন?"
আমরা সবাই সমস্বরে বলে উঠলাম, "আব্বা তুমি বুঝবা না! এটা ভিটামিন এম! সারাদিন কাজের পর একটু স্ক্রিনটা না দেখলে আমাদের ব্রেইন স্টোক হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
এছাড়াও আরেকটা মুশকিল আছে, এই যুগে মানুষের বেঁচে থাকার অক্সিজেনের চেয়েও ওয়াইফাইয়ের সিগন্যাল বেশি জরুরি হয়ে গেছে। আর যদি কখনো কপাল খারাপ থাকে, ধরুন ওয়াইফাইয়ের লাইন কেটে গেছে কিংবা মোবাইলের এমবি ফুরিয়ে গেছে তখন তো আমাদের অবস্থা আরও করুণ। ইন্টারনেট না থাকলে মানুষ নাকি আদিম যুগে ফিরে যায়। বিশ্বাস করুন, ইন্টারনেট ফুরিয়ে গেলে আমার মনে হয় আমি সত্যি সত্যি গুহাযুগের কোনো আদিম মানব হয়ে গেছি। দেয়ালে কয়লা দিয়ে ছবি আঁকার হাত থাকলে হয়তো দেয়ালেই ফেসবুকের ওয়াল বানিয়ে ফেলতাম! বলতে গেলে মোবাইল আমাদের প্রথম হৃদপিণ্ড। আমরা যখন অসুস্থ থাকি ডাক্তারের কাছে যাই তখন যদি ডাক্তার আমাদের প্রেসক্রিপশনে মেডিসিন না লিখে যদি আনলিমিটেড ইন্টারনেট প্যাক লিখে দেয় তাহলে দেখবেন , আমাদের শরীরের সমস্ত অসুস্থতা গায়েব গেছে।
তাই ভাবি, মুরুব্বিরা যতই আমাদের বকাঝকা করুক না কেন ‘সারাদিন ওই ফোন নিয়ে পড়ে থাকিস কেন?’ ওরা বোঝে না যে এই যুগে মোবাইল ছাড়া আমাদের অস্তিত্বটাই একটা মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন। মোবাইল সচল তো আমরা সচল, মোবাইল অফ তো আমাদের জীবনও সাময়িকভাবে ডেট সার্টিফিকেট লেখা হয়ে যায়...
শ্রদ্ধেয় ও দীর্ঘায়ু কামনাময়ী নানিজান,
আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে আপনার প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা, সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করে এই চিঠি শুরু করছি। আশা করি নানাভাইয়ের সাথে আপনার দিনগুলো বেশ আনন্দেই কাটছে। বিশেষ করে, নানাভাইয়ের সাথে তুচ্ছ বিষয়ে খুনসুটি ও ঝগড়াঝাঁটি করার ফাঁকে আপনার রক্তচাপ ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, সে বিষয়েও আমি মাঝেমধ্যে গভীর উৎকণ্ঠায় থাকি।
আজ এই চিঠি লেখার পেছনে কোনো সাধারণ কারণ নেই, এর পেছনে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গুরুতর এবং আমার বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা এক বিশাল অপরাধবোধ।
ছোটবেলা থেকেই আপনি থাকেন অজোপাড়াগাঁয়ে, আর আমি এই ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহরে। আমাদের সশরীরে দেখা হতো বড়জোর পাঁচ বা ছয় বছরে একবার। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনার নাতি হিসেবে আপনার সাথে আমার একটা অদৃশ্য, সুগভীর আত্মিক এবং কিছুটা কাল্পনিক টান সবসময়ই কাজ করত। আমি জানি, আপনার নাতি হিসেবে আপনার কাছ থেকে যতটুকু ভালোবাসা পাওয়ার কথা ছিল, ব্যস্ততার অজুহাতে আমি তার সিকিভাগও হয়তো দিতে পারিনি।
নানিজান, এবার মূল আলাপে আসি। আপনি হয়তো ঘুণাক্ষরেও জানেন না যে গত কয়েক বছরে আমি আমার অফিসের ছুটির প্রয়োজনে আপনাকে অন্তত দুই-তিনবার এই নশ্বর পৃথিবী থেকে দয়া মায়া হীনভাবে বিদায় জানিয়ে ফেলেছি!
আমি এখন একটা নামকরা অফিসে চাকরি করি আপনার দোয়াতে। কিন্তু যখন আমার চাকরি ফাঁকি দেওয়ার ইচ্ছা জাগে বা ছুটি নেওয়ার কোনো পোক্ত কায়দাকানুন বা বাহানা পাই না তখন এক্কেবারে সোজা সাপটা বলে দিই, "আমার নানি মারা গেছেন, গ্রামে জানাজায় যাচ্ছি।"
শুধু অফিসে নয়, আমার স্কুল-কলেজের ছাত্রজীবনেও যখন নানা কারণে অনুপস্থিত থাকতে ইচ্ছে করত কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার নেশা চেপে বসত, প্রেমিকাদের সাথে সিনেমাহলে গিয়ে দেবের কিংবা শাকিব খানের সিনেমা দেখতে মন চাইত তখনো সবার আগে আপনার মৃত্যুর কথাটাই আমার মাথায় বিদ্যুৎ চমকে আসত।
নানি, আপনি শুনলে অবাক হবেন যে, আমার জীবনের ছুটির ক্যালেন্ডার খাতাটা যদি খুলি দেখা যাবে গত দশ বছরে আপনি অন্তত সাতচল্লিশবার এই ধরাধাম ছেড়ে চিরকালের মতো বিদায় নিয়েছেন!
বিশ্বাস করুন নানি, এই ডাহা মিথ্যাগুলো যখন আমি বলতাম, আমার ভেতরে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পেতাম না। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠত। কিন্তু উপায় কী বলুন? কর্পোরেট জীবনের নিষ্ঠুর খাঁচা, ফাইলের পাহাড় আর কড়া বসের নজরদারি থেকে একটু মুক্ত হয়ে নদীর ধারে গিয়ে প্রকৃতির তাজা বাতাস খাওয়ার লোভ বা বন্ধুদের সাথে আড্ডার টান আমি কিছুতেই সামলাতে পারতাম না।
আপনি গ্রামে বহাল তবিয়তে খাটুনি করে দিব্যি বেঁচে আছেন, আর এদিকে এসির ঠান্ডা হাওয়ার নিচে বসে আমি আপনার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে অফিস থেকে তিন-চার দিনের ধুমধাম পেড লিভ বাগিয়ে নিচ্ছি—ভাবলে আজও নিজের কাছে নিজের চরম লজ্জা লাগে।
এখন তো পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, আমার অফিসের বস পর্যন্ত আপনার জন্য মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এবং আপনার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন যেন আপনি জান্নাতবাসী হন! অফিসে বসের মুখে আপনার জন্য এমন করুণাভরা দোয়া শুনলে আমার গাজরের হালুয়া গলায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়।
তাই আজ এই চিঠির মাধ্যমে আপনার পবিত্র চরণে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার এই ছুটির ফায়দা লোটার কুৎসিত ও অপরাধমূলক অভ্যাসের কারণে আপনার আয়ু আমি যদি কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দিয়ে থাকি, তবে দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আমি প্রতিনিয়ত মনে মনে আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করি আর ফরিয়াদ করি, "হে আল্লাহ, আমার এই মারাত্মক পাপ ক্ষমা করো, আমার নানিকে নেক হায়াত দারাজ করো।" ভাবছি, পরের ছুটিতে সত্যি সত্যিই গ্রামে আপনার কাছে যাব; সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আপনার পা ছুঁয়ে ক্ষমা চেয়ে নেব। ততদিন পর্যন্ত দয়া করে সুস্থ থাকবেন, বেঁচে থাকবেন ভালো থাকবেন—এই আশাই করছি।
ইতি,
আপনার চরম অপরাধী ও অনুতপ্ত নাতী।
একটি বিয়ের ইতিকথা | মিনহাজ রাফি
তখনকার দিনগুলোই আলাদা ছিল। প্রেমে পড়া মানেই হৃদয়ে এক অদ্ভুত টাইফয়েড জ্বর অনুভব করা। যার একমাত্র সাপোসিটার ছিল মোবাইল ফোনের ছোট্ট স্ক্রিনে প্রেমালাপ আর প্রেমিকপ্রেমিকার অপেক্ষায় কোচিং সেন্টারের সিঁড়ি।
আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগের কথা। তখন আমি এক পাত্তাড়িহীন, সর্বস্বান্ত, ভীষণ রোমান্টিক আশিক। আমার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা ছিল আমাদের পাশের বাড়ি মেয়েটি। যাকে দেখলেই আমার বুকের ভেতর দেবের গান বেজে উঠতো।
ভালোবাসা এমন এক অদ্ভুত বালাই, যা মানুষকে অন্ধ তো করেই, সাথে আধা-পাগলও বানিয়ে ছাড়ে। দিনে দশ ঘণ্টা ওই মেয়ের পিছে পিছে ঘুরে জুতার তলা খসিয়ে ফেলেছি। সে কোচিংয়ে ঢুকবে আমি বাইরে গেটের সামনে লাল সানগ্লাস, লাল পেন্ট, নীল ফুলের শার্ট পরে হিরোর ভাব ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে ফেলে ডানে তাকালে আমি বাঁয়ে তাকাতাম, আবার সে বাঁয়ে তাকালে আমি এক লাফে ডানে। চোখাচোখি হলে লজ্জায় লাল হয়ে যেতাম।
প্রেমিকা আমার ইন্টারমিডিয়েটের শেষ বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনায় ভীষণ কড়া।
অবশেষে একদিন বুকের সব পাঁজর একত্র করে, সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গলার ভেতর থেকে শব্দ বের হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল পেটের নাড়িভুঁড়ি গলায় এসে আটকে গেছে। কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে বলেই ফেললাম, "শোনো... তোমাকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই!"
মেয়েটি আমার দিকে এক অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। সে মুচকি হেসে বলল, "বিয়ে তো অবশ্যই করব! তবে শর্ত একটাই যেদিন গাড়ি আকাশে উড়তে পারবে, সেদিন এসো, ফিতা কেটে বিয়ে করে নেব। ওয়াদা করলাম"
সেদিন বাড়ি ফিরে আমি বিছানায় শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবলাম। গাড়ি আবার আকাশে ওড়ে নাকি? গাড়ি তো চলে ডাঙায়, আর মাঝেমধ্যে আমাদের এই ভাঙাচোরা রোডের খানাখন্দে ল্যান্ডিং গিয়ার ভেঙে আকাশে ওঠার আগেই পেটের ভুড়ি ঝাঁঝরা হয়ে যায়। আমি নিশ্চিত হলাম, মেয়েটি আসলে কূটনৈতিক কায়দায় আমাকে পাত্তাই দিতে চায়নি। আমার বুকভাঙ্গা বিশ্বাস সেদিন টোস্ট বিস্কুটের মতো চায়ের কাপে চুবিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল...
তারপর গড়িয়ে গেল পাঁচটি বছর।
চুল কিছুটা পাতিহাঁসের ডানার মতো পেকেছে, পেটের চর্বি খানিকটা বেড়েছে, কিন্তু হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে সেই টিনএজ আমলের সুপ্ত ভালোবাসা দিব্যি ন্যাপথলিন মাখানো কাপড়ের মতো সজীব অবস্থায় বেঁচে ছিল।
আমি মাঝে মাঝেই খবরাখবর নিতাম আচ্ছা, পাশের বাড়ির সেই মহারানি কি শেষমেশ কাউকে পটালেন? নাকি আমার মতো আজও সিঙ্গেল থেকে দুনিয়ার জ্বালানি খরচ বাড়াচ্ছেন? খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, আশ্চর্যের ব্যাপার! মেয়েটির আজও বিয়ে হয়নি।
ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে ঘটে গেল আধুনিক বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী মহাঘটনা। এলন মাস্ক সাহেব হঠাৎ করে একখানা গাড়ি বাজারে ছাড়লেন যেটা রাস্তায় চলার পাশাপাশি, একেবারে সোজাসুজি পাখির মতো ডানা মেলে আকাশে উড়তে পারে!
আমি ইউটিউবে সেই গাড়ির টেস্ট ড্রাইভের ভিডিওটা দেখলাম। ভিডিও দেখার সাথে সাথে আমার মাথার ভেতর টলমল করতে থাকা পুরোনো সব স্মৃতি চনমন করে জেগে উঠল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আরে!এখন গাড়ি আকাশে ওড়ে! ইহা তো সুদিনের খবর।
আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। গায়ে একটা পরিপাটি শার্ট চড়াতে চড়াতে সোজা গিয়ে হাজির হলাম পাশের বাড়িতে। সেই পরিচিত কলিং বেল। দরজা খুলল খোদ মহারানি। এখনো আগের মতো সুন্দরী, তাকালে চোখ দুটি বাহির হয়ে হাতে চলে আসে...
আমি এক ফালি চওড়া মুচকি হাসি দিয়ে মোবাইল স্ক্রিনে এলন মাস্কের উড়ন্ত গাড়িটা তার চোখের সামনে ধরলাম। আত্মবিশ্বাসে বুক ফুলিয়ে গম্ভীর গলায় বললাম, "এই যে দেখুন! ভালো করে চোখ মেলে তাকান! গাড়ি এখন আকাশে উড়ছে। আকাশের বুক চিরে চক্কর কাটছে! কথা দিয়েছিলেন, গাড়ি আকাশে উড়লে আমাকে বিয়ে করবেন। এখন আর পগারপার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়াও মুনাফিকের তিনটি আলামতের একটি হলো "যখন কারো সাথে কোন অঙ্গীকার বা ওয়াদা করে, তখন তা ভঙ্গ করা।"
ব্যাস, আর যায় কোথায়? প্রযুক্তির জয়জয়কার আর আমার দশ বছরের নাছোড়বান্দা সাধনার এক ঐতিহাসিক মিলন ঘটল। ঠিক তার পরের দিনই আমাদের শুভ পরিণয় সম্পন্ন হলো। এখন আমি রোজ সকালে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে টেসলা কোম্পানিকে ধন্যবাদ জানাই। অন্তত আমার মতো একজন ব্যাকডেটেড প্রেমিককে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর পরোক্ষ সহযোগিতার জন্য!
কবুতর রফিক | মিনহাজ রাফি
রফিক সাহেব গম্ভীর মুখে বারান্দার রেলিঙে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পরনে ময়লা একটা লুঙ্গি এবং ঢোলা গেঞ্জি। সামনে একটা ছোট টেবিল, তার ওপর রাখা ঠান্ডা চায়ের কাপ।
তাঁর সামনে মেঝেতে বসে আছেন তাঁর বন্ধু খালেদ। খালেদের চোখে চশমা, কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি পকেট থেকে একটা নোটবুক বের করে কী যেন হিসাব করছেন।
রফিক সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, "খালেদ, তুমি কি কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছ—এই পৃথিবীতে সবচেয়ে অবহেলিত প্রাণী কোনটি?"
খালেদ নোটবুক থেকে চোখ তুলে বললেন, "স্ত্রী?"
"আরে না! স্ত্রীরা হলো ঘরের রানি, তাদের অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। আমি বলছি আমাদের ছাদের রফিক মিয়ার গিরিবাজ কবুতরটার কথা।"
"রফিক মিয়া তো আপনার নাম!"
"আরে ধুর! আমার নাম রফিক তো বটেই, আমাদের বাড়ির ছাদের একটা কবুতরের নামও আমি শখ করে রফিক রেখেছি। সমস্যা হলো, রফিক কবুতরটা আজকাল আর উড়তে চায় না। ও শুধু বসে বসে জাবর কাটার মতো কী যেন ভাবে। আমার ধারণা, ও মানুষের জন্মের উদ্দেশ্য নিয়ে হতাশ।"
এমন সময় ভেতর থেকে রফিক সাহেবের স্ত্রী রাইফা ট্রে হাতে এসে উপস্থিত হলেন। টেবিলে গরম চা আর মুড়ি।
রাইফা বিরক্ত মুখে বললেন, "সারাদিন ছাদের ওপর কবুতর আর যত সব আজেবাজে চিন্তা! এদিকে চাল ফুরিয়েছে, গ্যাসের সিল্কিন্ডারের অর্ধেকের বেশি শেষ, আর তোমার মাথায় কবুতরের ফিলোসফি! বলছি, কবুতরগুলোর পেছনে এত চাল নষ্ট না করে বাজারে বিক্রি করে দিলে কেমন হয়?"
রফিক সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, "রাইফা, তুমি কবিদের বোঝো না। কবুতর হলো শান্তির প্রতীক। একটা শান্তির প্রতীককে তুমি চালের বস্তার সাথে তুলনা করছ? এটা কি একধরনের দার্শনিক অপরাধ নয়, খালেদ?"
খালেদ চায়ে চুমুক দিয়ে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লেন। বললেন, "তাত্ত্বিকভাবে অপরাধ বটে। তবে পেটে ক্ষুধা থাকলে ফিলোসফি হজম হয় না, রফিক ভাই। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বও কিন্তু খালি পেটে কাজ করেনি।"
"তা ঠিক বলেছ," রফিক সাহেব মুড়িতে একটা ফুঁ দিয়ে বললেন। "আচ্ছা, আইনস্টাইন সাহেব কি কখনো কবুতর পুষতেন?"
"কে জানে! হয়তো পুষতেন। তবে তোমার ওই রফিক কবুতরটার চোখের দিকে তাকালে আমার কেন যেন মনে হয়, ও গত জন্মে কোনো বড় মাপের দার্শনিক ছিল। হয়তো কোনো করণিক (clerk) ছিল যে সারাজীবন হিসাব মেলাতে পারেনি।"
ঠিক সেই মুহূর্তে ছাদের ঘুলঘুলি থেকে একটা কবুতর হুট করে এসে রফিক সাহেবের কাঁধে বসল। এটিই সেই রফিক কবুতর। সে রফিক সাহেবের কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকলো—"বাক বাকুম!"
রফিক সাহেব অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে বললেন, "শুনছ খালেদ? ও কী বলছে শুনছ?"
"কী বলছে?"
"ও বলছে—'রফিক ভাই, এই উচ্চ দ্রবমূল্যের বাজারে বাঁচা মুশকিল। আমাকে একটা ভালো চাকরি জুটিয়ে দিন, নয়তো আমি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেব।' দেখছ অবস্থা? একটা কবুতরের কত উচ্চাশা!"
রাইফা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। থালা-বাস্নায় একটু জোরে শব্দ করে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, "তোমরা দুজনেই একটা আস্ত পাগলাগারাদ খুলে ফেলো। আমি আর এই বুদ্ধিজীবীদের মাঝে এক মুহূর্তও থাকব না।"
রাইফা চলে যাওয়ার পর রফিক সাহেব ফিসফিস করে খালেদকে বললেন, "দেখেছ? নারীরা কেন জানি লজিক পছন্দ করে না। ওরা চায় বাস্তবতা। অথচ বাস্তবতা কতখানি কুৎসিত, তা কেবল আমরাই জানি, তাই না খালেদ?"
খালেদ গম্ভীরভাবে চশমাটা নাক বরাবর ঠেলে দিয়ে বললেন, "তা ঠিক। তবে বাস্তবতার কথা পরে হবে, আগে বলো—তুমি কি রফিক কবুতরের ভেতর তোমাকে দেখতে পাও?
রফিক সাহেব আকাশে তাকিয়ে বললেন, " জানি না তবে রফিক কবুতরটাও আমার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলেন চারদেয়ালের ঘরে, আমার মনে হয় তার জীবনটাও তাকে নানান প্যারা দিচ্ছে...
টুথব্রাশ | মিনহাজ রাফি
আমিন সাহেবের বয়স এখন ছত্রিশ চলছে। তবে তার চেহারা দেখে মনে হয়, সে যেন ইব্রাহিম লোদি আমলের কোনো এক রাজকোষাগার পাহারা দেওয়া অতন্দ্র প্রহরী। তার মাথার চুলগুলো বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে বহু আগে। আমিন সাহেব নিজে অবশ্য বলেন, "চুল পড়ে যাওয়া মানে চিন্তার পরিধি বেড়ে যাওয়া। টেনশনে মাথার চাল উড়ে যায় ভাই!"
গত পরশু আমিন সাহেবের সাথে দেখা। একটা ফাঁকা রিকশায় বসে গম্ভীর মুখে বিড়ি ফুঁকছেন। ।
আমি বললাম, "কিরে আমিন? কী অবস্থা?"
আমিন সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এমন ভারী দীর্ঘশ্বাস, মনে হলো রিকশার চাকা পাংচার হয়ে যাবে।
"অবস্থা ভালো না ভাই। জীবনে একটা গভীর দার্শনিক সংকট তৈরি হয়েছে।"
আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "কীসের সংকট?"
"টুথব্রাশের।"
"টুথব্রাশের?"
"হ্যাঁ। বাজারের ব্রাশগুলো আজকাল এমনভাবে তৈরি করে যে, দাঁত মাজার চেয়ে ব্রাশ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোম্পানিরগুলোর নিয়তই হলো আমার মাড়ি কেটে রক্ত বের করা। এই যে আমি গত মঙ্গলবার একটা ব্রাশ কিনলাম। লাল রঙের। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ব্রাশের অর্ধেক চুল হাওয়া! বল তো ভাই, চুলগুলো কি রাতে উঠে ফিনকি দিয়ে কোথাও পালিয়ে গেল? নাকি আমার মাড়ির আন্ডারে কোনো অদৃশ্য নাপিত আছে, যে আমার ব্রাশের চুল কেটে নেয়?"
আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। "কোম্পানির দোষ দিয়ে কী হবে? কম দামি জিনিস কিনলে তো এমন হবেই।"
আমীন সাহেব চোখ গোল গোল করে আমার দিকে তাকালেন। যে দৃষ্টিতে মহাকাশচারীরা মহাশূন্যে এলিয়েন দেখে, ঠিক সেই দৃষ্টি।
"কম দামি? ত্রিশ টাকা দামের এই ব্রাশ কিনতে আমার পকেটের বারোটা বেজে গেছে। তুমি জানো, আমি গতকাল থেকে টুথপেস্ট ব্যবহার করাও বাদ দিয়েছি?"
"সে কী! টুথপেস্ট ছাড়া দাঁত মাজো কীভাবে?"
"নুন দিয়ে। আমাদের নানি-দাদিরা নুন দিয়ে দাঁত মাজতেন না? তাদের দাঁত তো মুক্তোর মতো চকচক করত। সেদিন এক আন্টির মুখে শুনলাম, নুন দিয়ে দাঁত মাজলে নাকি মাড়ি শক্ত হয়। আমি তো এক কেজি প্যাকেট লবণ কিনে সোজা বাথরুমে রেখে দিয়েছি। সকালে দাঁতে লবণ দিয়ে ঘষি, আর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হয় আমি যেন ডান্ডাফিল্ড জেলখানার কোনো কয়েদি। মুখের ভেতরটা কেমন যেন লবণের কারখানার মতো নোনতা হয়ে থাকে।"
আমি বললাম, "তাতে দাঁতের কী হলো?"
"দাঁতের কথা বাদ দাও ভাই। গতকাল সকালে বাথরুমে ঢুকে তো আমার হার্ট ফেল করার দশা।"
"কেন কী হলো?"
"আমার সেই লাল রঙের ব্রাশটা বাথরুমে নেই! আমি সারা ফ্ল্যাটে চিল্লাপাল্লা শুরু করলাম। কাজের বুয়াকে বললাম, 'তুমি আমার ব্রাশ চুরি করেছো স্বীকার করো! ব্রাশ চুরির অপরাধে জেল খাটতে হবে বলে দিচ্ছি!'
বুয়া তো কান্নাকাটি শুরু করে দিল। সে নাকি জীবনে কখনো টুথব্রাশ দেখেনি, সে নাকি কেবল নিমের ডাল দিয়ে দাত মাজে। তখন আমার বউ এলো। এসে ঠান্ডা মাথায় ব্রাশটা বাথরুমের বেসিনের নিচে থেকে উদ্ধার করলো। ব্রাশটা একটা তেলাপোকার সাথে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তেলাপোকাটা সম্ভবত ব্রাশটাকে নিজের টুথব্রাশ বানিয়ে ফেলেছিল।"
আমি আর থাকতে পারলাম না। রিকশার হুডের আড়ালেই হেসে ফেললাম।
আমিন সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, "হাসছো? এই যুগের মানুষের সমবেদনা বলে কিচ্ছু নেই। আচ্ছা বল তো, তেলাপোকা কখনো ব্রাশ করতে দেখেছ?"
"না, দেখিনি।"
"তাহলে ওটা ওখানে গেল কেন? গভীর ষড়যন্ত্র ভাই, সব গভীর ষড়যন্ত্র। এই পৃথিবীতে গরিব মানুষের একটা টুথব্রাশের কোনো স্বাধীনতাই নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি আমার টুথব্রাশটা একটা ইঁদুরের মুখে করে পগারপার হচ্ছে, আমি বিন্দুমাত্র অবাক হব না।"
আমি আর কিছু বললাম না।
আমিন সাহেব পকেট থেকে একটা অর্ধভাঙা চিরুনি বের করে নিজের টাকপড়া মাথার ওপর বুলোতে লাগলেন। তারপর উদাসীন গলায় বললেন, "যাই হোক, একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। তোমার কাছে দশটা টাকা হবে? চায়ের দোকানে বাকি জমে গেছে, চা-ও দেয় না আজকাল।"
আমি পকেট থেকে বিশ টাকার একটা নোট বের করে তার হাতে দিলাম। আমিন সাহেব টাকাটা নিয়ে এমনভাবে পকেটে ঢোকালেন, যেন তিনি এইমাত্র আমেরিকা থেকে আসা কোনো গ্রান্টের চেক নিলেন।
তারপর রিকশা থেকে নেমে বললেন, "চলো, চা খেয়ে আসি। জীবনের ছোটখাটো দুঃখগুলোকে চা দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হয়। টুথব্রাশের হিসাব না হয় কাল করা যাবে।"
0 মন্তব্যসমূহ