ই এর গড়মিল | মিনহাজ রাফি



শুক্রবারের অলস সকালটা সাধারণত আমার কাছে একটু পবিত্র গোছের। সপ্তাহে ছয় দিন অফিসের ঝুটঝামেলা সামলে এই একটা দিন আমি একটু দীর্ঘাঙ্গী হয়ে সোফায় পড়ে থাকার সুযোগ পাই। এক হাতে ধোঁয়া ওঠা আদা-চা, অন্য হাতে খবরের কাগজের ভেতরের পাতা ঠিক এমনই এক স্বর্গীয় মুহূর্তে সুমনা এসে পাশে দাঁড়াল।

​মুখটা গম্ভীর, তবে গলাটা একটু বেশিই মোলায়েম। অভিজ্ঞ বিবাহিত পুরুষমাত্রই জানে, স্ত্রীর এই অতি-মোলায়েম গলাঝাঁকি আসলে বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস।

শোনো," সুমনা চায়ের কাপের দিকে ইশারা করে বলল, "আজ তো তোমার ছুটি। কাজটা আজকেই সেরে ফেলো না? আমি কাল রাত থেকেই ভাবছি।"

​আমি খবরের কাগজের খেলার পাতায় চোখ রেখেই উদাসীন গলায় বললাম, "কিসের কাজ? বাজার তো কালই করে এনেছি।"

​আহা, বাজারের কথা কে বলছে!" সুমনা এক হাত কোমর রেখে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, আমি তো তোমার কষ্টটা বুঝি। তোমার একটা নতুন স্ত্রী দরকার। পুরানটা দিয়ে তোমার হচ্ছে না বুঝতে পারছি আমি। ঠাণ্ডা হয়ে থাকে, কোনো গরম ভাবই নেই! ওইটা নিয়ে আর টানাটানি করা যাচ্ছে না, মেজাজটা খিঁচড়ে যায়।"

আমার হাতের চায়ের কাপটা এক ইঞ্চি কেঁপে উঠে কাপড়ের ওপর পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে সুমনার দিকে থ হয়ে তাকালাম। এই নারী কি আজ সকালে হঠাৎ কোনো রহস্যজনক কারণে মহতী হয়ে উঠল? নাকি আমাকে পরীক্ষা করার জন্য কোনো চরম মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ পাতছে?

​আমি একটু গলা খাঁকারি দিয়ে, সুমনার কোমর ধরে নিজের দিকে টেনে এনে ভীতি আর কৌতূহল মেশানো গলায় বললাম, "সুমনা... তুমি কি সুস্থ আছ? মানে, তুমি আমাকে অন্য কাউকে ঘরে আনার পারমিশন দিচ্ছ? কিন্তু আমার আবার নতুন স্ত্রী লাগবে কেন? আর তুমি পাশে থাকতে আমার পুরান স্ত্রীটা ঠাণ্ডা হয়ে আছে মানেটা কী? কাল রাতেও তো........"

সুমনা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখের তারা দুটো বড় বড় হয়ে গেল, গালের রঙ লাল হয়ে উঠল। তারপর ও এক ঝটকায় আমার হাতটা সরিয়ে দিয়ে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল।

ওহ খোদা! তোমার মাথায় কি সবসময় শুধুই প্রাপ্তবয়স্কদের নোংরা চিন্তা ঘোরে?" সুমনা মুখে হাত চাপা দিয়ে লাল হয়ে যাওয়া গালে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল, "আমি কাপড় ইস্ত্রি করার 'ইস্ত্রি'র কথা বলছি! ই-স-ত্রি! কাল রাতে তোমার ওই পাতলা সুতির শার্ট আর আমার সিল্কের নাইটিটা প্রেস করতে গিয়ে কালঘাম ছুটে গেছে। তার লুজ হয়ে গেছে, কারেন্টই ধরে না, কোনো হিট হয় না! আমি বলেছি একটা নতুন ভারী দেখে ইস্ত্রি কিনে আনতে, যাতে চটজলদি সব গরম আর মসৃণ হয়ে যায়! আর তুমি সেখানে কোন নিষিদ্ধ ফ্যান্টাসি নিয়ে বসে আছ?"

​আমি একটা মহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় শরীরটা ছেড়ে দিলাম।

​"আহা সুমনা, তুমি যদি মুখ থেকে প্রথম ‘ই’ অক্ষরটা গায়েব করে একদম কামাতুর গলায় 'স্ত্রী' উচ্চারণ করো, তবে যেকোনো পুরুষের মাথায় অন্য চিন্তা আসতে বাধ্য! বাংলায় 'ইস্ত্রি' আর 'স্ত্রী'—এই দুইয়ের উষ্ণতার তফাতটা অনেক। উচ্চারণের এই গরমিল বন্ধ না করলে তো যেকোনো দিন বড়সড় কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে!"

​সুমনা চোখ দুটো ছোট করে এক অদ্ভুত হাসি হেসে বলল, "উফ! আঞ্চলিক উচ্চারণে ওটাকে আমরা স্ত্রী-ই বলি। অত ব্যাকরণ শোনাতে হবে না! এখন সোজা উঠে ইলেকট্রনিক্সের দোকানে যাও। এমন একটা ইস্ত্রি আনবে যেটায় হিটিং পাওয়ার বেশি থাকে... বাকিটা না হয় জামাকাপড় ইস্ত্রি করার পরেই দেখা যাবে!"

​আমি হেসে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ভাবলাম, যাক বাবা, বাঁচা গেল! ইস্ত্রি হিটিং না দিলে বাজার থেকে বদলে নতুন ইস্ত্রি আনা যায়, কিন্তু উচ্চারণের ভুলে যে ‘স্ত্রী’র কথা ভেবেছিলাম সেটার মেজাজ একবার গরম হলে কপালে যে ছাঁকাটা খেতাম, তার উত্তাপ সহ্য করার ক্ষমতা আমার অন্তত ছিল না!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ