পিতামহীর আদিম বেদনা
শহরের রোদদাত্রী জানালায় ঝুলে আছে
নীল-নীল নিখাদ অভিজাত বিজ্ঞাপন,
যেন কোনো সংযত হৃদয়ের
কেটে নেওয়া শৈশবের দোদুল্যমান পায়চারি,
আর বুকপকেটে লুকিয়ে রাখা
ভ্যান গঘের করুণ আর্তনাদ।
আদিবাসী বৃষ্টির ভিতর দিয়ে ছুটে যায়
জীবনানন্দের হুইসেল—
আর পাখির ডাকের সুরে
আচ্ছাদিত বিমুখ মায়ের শঙ্কিত চোখ
মনে রাখে আকাশের গায়ে প্রলেপ মাখা দীর্ঘ আর্তি।
আমি দাঁড়াই পথে পথে মিছিলের মাঝে,
স্লোগান হয়ে, পাতাঝরা ব্যারিকেডে,
তথাকথিত ঈশ্বরের মানবপোকার কাতারে।
দূরে, এক নারী কমরেডের চোখে দেখি
একটি পুরোনো হারমোনিয়াম—
তার ফাটা রিড ফেলে গেছে মফস্বলি বেদনায়।
আমি তা তুলে নিয়ে সযত্নে রাখি
তর্জনীতে, সমুদ্র-ঘেঁষা পাহাড়ি হৃদয়পথে।
জানি—
হাতঘড়ি হঠাৎ থেমে গেলে
সময়গুলো ছড়িয়ে পড়ে কলিযুগে;
ভুলবশত তীরে উঠে আসা ছোট মাছেদের মতো,
যাদের কেউই আর নদী চেনে না,
চেনে না উদ্বেলিত ঢেউয়ের গুঞ্জন।
দেখি—
শ্রাবণ-বিলাসী নিঃসঙ্গতা নিয়ে
রাস্তার মোড়ে এক ভবঘুরে রঙ দিয়ে
আঁকছে চকের শহর, পারিজাত-মোহে;
যেখানে ছাদের ওপরে বাড়তে থাকে
ভেজা খয়েরি শাড়ির বিবাদ।
আমি সেসব বিবাদ এড়িয়ে হাঁটতে থাকি,
যেন প্রতিটি কদমে কদমে ধরা দেয়
জাফরানি সন্ধ্যার শোকাগ্রস্ত পিতামহীর আদিম বেদনা,
যা আমাকে ও আমার পিতৃকে শেখাতে পারেনি
কতিপয় দুঃখ এড়িয়ে
শরৎ-ভ্রমণী হওয়ার নিখুঁত কৌশল।
তোমাকে নিয়ে
আমার জন্মভ্রান্তি, রন্ধ্রে রন্ধ্রে লেপ্টে থাকা নির্লিপ্ত
কুহক। তুমি যেদিন ডুবে গেলে তৃতীয়ার জোছনায়,
আমার নৈরাশ্যবাদী পাঁজরে গজিয়ে উঠেছিল অব্যক্ত
বেদনা—দু-একটা সিগারেট পুড়িয়ে যাকে আজও
সান্ত্বনা হরফে বাঁধা যায় না।
পশ্চিমা কলোনির পরিত্যক্ত নাবিক কোয়ার্টারে আমরা
রেখে এসেছি হেমন্ত-বিলাপ, কাঁচা চুম্বন—
শুকনো শালপাতার সংসার আর নির্বাসনের জলচিহ্ন।
স্পর্শের লোভে কাতর, আমি এখন কথনবিমুখ এক
নির্বাক চৌরাস্তায়, যেখানে বিপদাপন্ন আশ্রয়ে প্রতিটি
পথই শেষ হয় পৌরাণিক সন্ধ্যার নিঃসঙ্গতা এলিয়ে।
দিগন্তের লালচে নকশিকাঁথা ছুঁয়ে, যে নিগূঢ় কবিতায়
তুমি আমাকে রেখে গেলে—তার প্রতিটি মৌন শ্লোকে
ভেসে ওঠে চোখের নিচে জমে থাকা বিক্ষত যাপনের
আমদানিযোগ্য হাহুতাশ।
নিঃসার বিহঙ্গ যেমন বাসা বাঁধে ঝরা বাঁশবনে,
আমার সমস্ত বাসনাও তেমন নিস্তব্ধ—
তবু নিরন্তর প্রতীক্ষমাণ।
তুমি যদি ফিরে আসো কোনো এক ঝুম শ্রাবণের দিনে,
রাতে কিংবা নিশ্বাসের অলসতায়, দেখবে—হাস্যোজ্জ্বল
জীবন আমার মূক হয়ে গেছে প্রত্নস্মৃতির গোরস্থানে!
দেখবে—প্রস্থানের অনলে পুড়েও অক্ষত রয়ে গেছে
তোমার অনুচ্চারিত সমস্ত অনুরণন...
২৭জুলাই/২৫, শান্তিবাগ
জীবনানন্দ ও তোমাকে
তুমি অবসরে চলে গেলে—
ট্রামের নগরী ছেড়ে জীবনানন্দ
আমার হৃদয়ের অরন্য দোলনায় দোলে।
তুমি হেঁটে যাবে অন্ধ দিগন্তের জলে
Tonight I can write the saddest lines.
I loved her, and sometimes she loved me too.
Through nights like this one I held her in my arms
I kissed her again and again under the endless sky.
~Pablo Neruda
কোনো কিছুর দিকে হাত বাড়ালে
ফিরে আসে অদৃশ্য কাঁটাঝোপের বহুবিধ নীলতা,
তুমি কি খনিজ অযাচিত আত্মা?
নাকি কালেভদ্রে ফিরে আসা ধূসর শ্বাস?
যার ধারে কাছে এলেই ভগ্ন স্তব্ধতা বৃষ্টির মতো ঝরে
রহস্যময় নহরে?
আমি ডাকিনি,
তবুও তর্জনিতে পড়ে থাকে—
শীতল চিহ্ন, নিঃসঙ্গ কোকিলের মীড়।
তোমার জন্য ছিল না কোনো আয়ুপ্রার্থনা,
অবিনশ্বর অনুনয়,
তবু হৃদ্মূর্ছনায় ফুঁ দিয়ে
চেয়েছি—কোনো পবিত্র দরিয়ার ঢেউ যেন গড়িয়ে পড়ে
তোমার অভ্যন্তরে।
নামহীন পক্ষীর মতো,
ঘুমের কিনারে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করি—
কে ছিল গতরাতে, গার্হস্থ জীবনে?
কোনো আবলুশু স্বর কি তোমার কানে
ফিসফিস করেছিল, সান্ত্বনার সুরে?
ভোর এখনো জমাট,
তবু জানি—একদিন সমস্ত আত্মঘাত হবে প্রাচীন আলোয় বিলীন,
তুমি হেঁটে যাবে,
অন্ধ দিগন্তের ফিলোসফিতে,
অরণ্যের প্রতিবেশী হয়ে, কর্ণফুলীর পাড়ে আর চুম্বনে
২৭জুলাই,২৫/ শান্তিবাগ
ভাবুক
ভেবে পাই না—
যা হারিয়েছে হৃদয়ঝড়ে,
যা রেখে এসেছি
প্রত্যাখ্যানের ম্লান চৌকাঠে,
যা উড়ে গিয়েছে
প্রবঞ্চনার করাঘাতে,
আমার ক্লান্ত স্পন্দনে;
তা কেন এতটা
খুঁজি, বারংবার খুঁজি
দুঃস্বপ্নে, ম্রিয়মাণ আঁধারে
কলঙ্কিত উদাসীন রাত্রির
অশ্রুসিক্ত নয়নে?
২৭জুলাই/২৫, কন্ট্রোল মোড়
পথ
তুমি হয়তো
ভুল করে অন্য পথে রেখে এসেছো বৃষ্টিসিক্ত
আমাদের দুপুর, বিছানার সবুজ ষোলআনা
প্রেম আর আমার দুঃখের মুদ্রাদোষ।
~
তবুও
হারিয়ে ফেলা থেকেই তো
গড়ে ওঠে ফেরার পথ।
ফুল না পোকা
পাতিহাঁসের পালকে মিশে আছে সুসংহত বিষণ্নতা,
বিমূর্ত জীবদ্দশায় কোকিলকণ্ঠী সুর ওঠে না আজকাল—
দিঘির পাড়ে হিজলের গন্ধ জমে আছে। কে যেন
শোকবিহ্বল দুপুরে প্রাইমারি ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে যায়।
চক্ষুপেশিতে টের পাই থেমে থাকা ঝড়ের পূর্বাভাস।
নড়বড়ে প্রস্থান হতে গলে পড়ে ধূপের মতো আগ্রহ,
কিন্তু কে রাখে কানের পেছনে নূপুরের অনাদর প্রেম?
কে রাখে কুড়ানো পুঁইপাতায় নিজস্ব নির্বাসন?
এবার তো জ্বর এলেই জোনাকি নিভে যায় বিপন্ন সন্ধ্যায়;
তবুও বুকের মধ্যে অজ্ঞাত নামের ঢেউ আসে,
মাগরিবের আযানের সঙ্গে মিশে থাকে বয়োবৃদ্ধ হাহুতাশ।
সুন্দর বলতে যা বোঝায়—তা নয়, এ এক ধরনের
হেমন্ত-বিলাসী গন্ধ, যা হিজলপাতার নিচে বয়স্কা
হাওয়ার মতো উড়ে যায়। আমার গায়ে কে মেখে যায়
অদ্ভুত রঙিন বর্ণালির আভা? নিঃসঙ্গতার স্বীকারোক্তি?
এই সত্তা, এই কুয়াশাভেজা আদিম পাপ, আমি কোথায় রাখি? কোথায় গোপন রাখি লাল রঙের বিব্রত, উৎসুক স্পন্দন!
বলার ভাষা নেই, তবুও কাঁঠালপাতা দিয়ে ঢাকি নিজের
উদাসীন দলছুট—যেন কেউ না দেখে...
আকাশ কিসের সংকেত দেয় জানি না,
তবুও আমার ভিতরে কুঁচকে থাকে একটা নির্গত নাজুক ক্লান্তি;
এই নাদান হৃদয়ে যে হুল ফোটে—তা ফুল না পোকা,
বুঝি না, বুঝি না!
২৫জুলাই/২৫, কন্ট্রোলমোড়
মৃত্যু একটি নদী
জানি না
নিঃসঙ্গতা মৃত্যুর সমার্থক কিনা,
তবে নিশ্চিত—
এটা এমন এক নদী
যার দিকে কেউ ফিরে চায় না,
তবু সকল সেতু ভেঙে গিয়ে
আমরা সেদিকেই হাঁটি।
মৃত্যু একটি নদী
জানি না
নিঃসঙ্গতা মৃত্যুর সমার্থক কিনা,
তবে নিশ্চিত—
এটা এমন এক নদী
যার দিকে কেউ ফিরে চায় না,
তবু সকল সেতু ভেঙে গিয়ে
আমরা সেদিকেই হাঁটি।
২৫ জুলাই/ কাজীর দেউরি
জীবনচক্র
*
বাজারের ব্যাগের পেছনে দৌঁড়াতে গিয়ে আব্বার কবর দেখলাম—
আব্বা হাসছেন।
১০জুলাই/২৫, পোর্ট কলোনি কবরস্থান
আমরা যারা জোকার
আমরা যারা পালাতে পারি না
জীবনের আদিমতম দুঃস্বপ্ন হতে,
তাঁরা ঝুম শ্রাবণের দখিনা হাওয়ায়,
মুহুমুর্হু নিবিড় মূর্ছনার কাছে যাই।
করুণ—বিমূর্ত—মৌন—
নিঃসঙ্গ খালি মদের গ্লাসের মতো
কতো কতো মূর্ছনা
আমাদের শীতল করে রাখে
অশ্রু বিজড়িত রাত্রির ক্লান্তিসজ্জায়।
আমরা যারা পালাতে পারিনি
মা ও প্রেমিকার নুপুরগীত হতে
তাঁরা সবাই নাজুক নাজুক মিহি
মূর্ছনায় গা এলিয়ে বসে থাকি
বিপন্ন অন্ধকারাচ্ছন্নে— নিভৃতে।
৯জুলাই/২৫, সদরঘাট
তুমি এক অচেনা পাখি
তারপর অসীমে তাকিয়ে রই—মেঘেদের সীথানে
যে পাখিগুলো অশ্রুত ঋণ রেখে যায়, সে সমূহ
পাখিদের গুপ্ত আনন্দে ভাগ বসাতে চেয়ে ভুলে যাই
মানুষজন্ম আমার—সৃষ্টির অগ্রহণযোগ্য জীব।
এরপর চির-বাউল বিকেলগুলোর দিকে তাকাতেই
দেখি, একটা বালক জানালা দিয়ে বেরিয়ে ছুটে
যাচ্ছে ঘাসেদের কোলে, শালবনের নীরবতায়,
পৃথিবীকে লাথি মেরে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে—
হারাম নারীরা বেরিয়ে আসে ঈশ্বরের নিয়তিকে
চোদমারানি বলতে বলতে। আমি তখনও অসীমে
তাকিয়ে—দূরে, আরও ঊর্ধ্বে, যেখানে নক্ষত্রেরা
যেন ঝরাপাতার মতো ঝরে পড়ে মলিন কবিতার
ভাঁজে, আর অন্ধকার ফেটে ফোটায় অদৃশ্য ক্রন্দন।
তবু, অসীমেই তাকিয়ে থাকি—হয়তো কোনো একদিন
সমস্ত ব্যথা, সমস্ত অপরাধ, অব্যক্ত প্রেম, অশেষ ক্ষুধা,
সন্ধ্যার মিথ্যে সান্ত্বনা—সমস্ত বিষাদের গাণিতিক ভুল
এক মহাজাগতিক সমীকরণে লীন হয়ে যাবে—যেখানে
আলো আর অন্ধকার মিলে যায় একই পরম সত্যে।
হয়তো একদিন দেখা হবে একটা অচেনা পাখির সঙ্গে,
যে আমার সমস্ত দুঃখের বিনিময়ে আমাকে এক ফোঁটা আলোকিত অনুনয় দেবে—
বিমূর্ত জীবনে।
৭জুলাই/২৫, আগ্রাবাদ
একটা বাড়ি
একটা ধুলোঢাকা বাড়ি,
গান আছে, কবিতা আছে,
আছে তপ্ত নিদ্রাহীনতা।
একটা ধুলোঢাকা বাড়ি,
আছে ছিন্ন চিঠি, ভাঙা রেকর্ড
আছে আলো-আঁধারির মূর্ছনা।
একটা ধুলোঢাকা বাড়ি,
আয়না আছে, বায়না আছে
আছে ছাইভরা অ্যাশট্রেতে
নিঃশেষ প্রার্থনা।
একটা ধুলোঢাকা বাড়ি,
আমি আছি, তুমি নেই
আছে নির্লিপ্ত অপেক্ষা।
একটা ধুলোঢাকা বাড়ি,
আছে ফাটল ধরা ডায়েরি,
আছে থেমে যাওয়া নিঃসঙ্গতা
আছে সন্ধ্যের নিঃশব্দ কান্না।
একটা ধুলোঢাকা বাড়ি,
আছে, শুধু আছে—
আমাদের না-বলা, না-ফেরা
রাত্রির সহস্র কথা।
১জুলাই/২৫, ঈদগাহ
ছেলেটি
কেন আপনারা সে মৃত ছেলের জানাজায় আমাকে ডাকছেন? যে একটি রোজগারের অভাবে মরে গেছে চব্বিশ বছরের ঘুম-জমা ডিগ্রিপত্র কুচি-কুচি করে খেয়ে। আমাকে বলুন— No work, no mine-এর দিনে মরা লোকের জানাজায় কি যাওয়া যায়? বিষণ্ন তো লাগে, সাথে বুকে থাকে খিলখিল হাসি। কেন আপনারা সে মরে যাওয়া ছেলের শোকে সন্ধ্যার আগে গলা টিপে রাত্রি নামাচ্ছেন? রাত্রি কি আপনাদের বাপ-দাদার? কেন আপনারা সে ছেলের মায়ের কোলে ভাসিয়ে রাখছেন একটি লাল জ্যোৎস্নার রক্তাক্ত রাজহাঁস? কেন তার বাবার চোখের খোলসে টুকরো হওয়া ভাঙা সাইকেল মেরামত করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন চাঁদের বিমূর্ত আশ্রমে?
ছাড়ুন! ছাড়ুন! এইসব পুঁজিবাদী তামাশা, শোকনাট্য।
বাতাসের ফিসফিস না-বলা কথাগুলো শুনুন, যার কাছে ছেলেটি সব বলে গেছে। প্রকৃতির দুর্ঘটনায় যে অরণ্যগুলো শুকিয়ে গেছে, তাদের কাছে যান— ছেলেটি অশ্রুত চোখে তাদের কয়েক ফোঁটা পানি পান দান করে গেছে; গাছে ঝুলে যাওয়ার আগেই।
আপনাদের তো মনে নেই সে ছেলের গ্রীবায় আটকে থাকা নির্ঘুম রাত্রির অবসাদ। হৃদয় ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছেলেটি মায়ের জন্য জামদানি শাড়ি বুনতো, বাবার জন্য নদীর বুক ফুঁড়ে তুলে আনতো ব্যাগ ভর্তি ইলিশমাছ। সাদা সিগারেট জ্বালিয়ে ছেলেটি
বুকের বাঁ পাশে কারুকার্যময় কয়েক শ’ স্বপ্ন সাজাতো।
এইসবের কিছুই তো আপনারা দেখেননি, করে ছিলেন ভানবিলাস। এখন যে মরে গেছে, সে মরে যাক—মরে যাওয়ার পর ইঁদুরের মতো ছুটোছুটি করে মেকি শুশ্রূষা বাড়াবেন না।
দেখতে জোকার জোকার লাগে।
৩০জুন/২৫,ঈদগাহ
নিদ্রাহীন সুবহে সাদিক
আমি দেখি—
তোমার বাড়ন্ত চুল সহস্র নিঃসঙ্গতা নিয়ে লীন যায়
বৈরী হাওয়ার শরতে।
দুপুরে ভাতের মাড়ে তোমার বিগত বিদীর্ণ বিকেলগুলো
লুকিয়ে রাখো পাতাবাহারের বোঁটায়, পলিমাটির হৃদয়ে।
সন্ধ্যা নামলে হয়ে উঠো সোলেমান কাকার
হিসেব না-মেলানো বাকি খাতার হাহাকার।
জর্জরিত হও।
পৃথিবীতে বৃষ্টি নামে না বহুদিন; তবু তুমি ভিজিয়ে রাখো
ক্যালেন্ডার, পরিচিত ডাকনাম,
আয়না-বায়না, বুকের ভেতরের নীল পলেস্তা
ও বসন্ত থেকে চিঠিবক্সের দূরত্ব।
আমি তাকিয়ে থাকি এসব করুণ দৃশ্যাবলীর ভেতর।
নির্মোহ হই।
সারাটা দিন কৃতকর্মের মতো হাঁপাই,
ভিক্ষা করি— মেট্রোপলিটন চক্ষু।
জানি—
সাবলীল বেদনার নিকট এসে কত কিছুই তো বদলে যায়।
বদলে যায় থৈ-থৈ দিঘির জলে এক-পায়া বগের হাহুতাশ,
বাজারের নির্লিপ্ত থলি, অশ্রুত সবুজ কান্না,
উদাসীন সারগামের যাত্রাবিরতি, মুখোমুখি বসে থাকা
ক্ষুধা ও সংগ্রাম;
তবু তো তুমি বদলাওনি;
এখনও রাত্রি নামলে মমতাময়ী শৈশবের মতো আঁকড়ে ধরো,
চুমু খাও, প্রসস্ত করো হাসনাহেনা-কাঁধ,
সূরা ইখলাস পড়ো, কাফের থেকে মুমিন হও—
সম্বোধনে রাখো, এরপর জড়িয়ে ধরে আমার ঘুমের পাশে
জেগে থাকো জীবদ্দশায়
সমস্ত দুঃখকে মিথ ভেবে।
আমি দেখি সমস্ত কিছু—
সুবহে সাদিকের পূর্বে;
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে।
২৮জুন/২৫, টাইগারপাস
কিছু নোনতা গান
কিছু নির্দিষ্ট গান আছে আমার—কান্নাপ্রণালিময়; পরিযায়ী পাখির আগমনী বার্তায়, যা প্রতীক্ষারত বেদনাপন্থী চোখের
হেলানো রকিং চেয়ারে। হৃদয়ের বেহায়া সবুজ অববাহিকায়, হাই স্কুলের শূন্যতা আচ্ছাদিত সে গানগুলোর মাঝে অনায়াসে সাঁতরে বেড়ায় জরাজীর্ণ বেদুইন পাতিহাঁস। কুয়াশারা কিছুক্ষণ একা হলে, বসে বসে ঝিমাই রাত্রির দাসত্বে, আশ্রিত গানের মূর্ছনায় বুঝি প্রকৃতির তাচ্ছিল্য শানিত চাপা ভয়ের মুখোমুখি হওয়া নিঃসঙ্গ ঘুঘুর সন্তাপন। থিতু হয়ে আসা হৃদয়গ্রাহী দৈন্যতার দৈনন্দিন যাত্রাবিরতিতে আমি থমকে থাকি—বোবা শুশ্রূষায়,পড়ে থাকি নবজাতক মাছেদের মৃত অবয়বের মতো। এরপর ছাতিমফুলের আতিথেয়তায় কয়েকটি নির্দিষ্ট নোনতা গান আকাশের চোরাবালি হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসে এক কাপ গরম চায়ের আকাঙ্ক্ষায়, যেখানে সমস্ত মিথ, শীৎকালের ঘুম ভেঙে যায় দুঃখের পতিব্রতে।
কিছু নির্দিষ্ট গান আমার ঝুলে আছে
হৃদয়ের ফিলিস্তিনে,
তোমার দিয়ে যাওয়া গা কাঁপানো জ্বরে,
নিরর্থক স্বপ্নালু আয়ুতে।
সাড়ে চারটা হরিণ
তোমার কোমড়
ও
ক্লিভেজের
মধ্যিখানে
সাড়ে চারটা হরিণ আছে—
দেখো—
তারা
দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া
চইলা
আসতাছে
আমার হৃদয়ের
খাঁ খাঁ শূন্যমাঠে—
ঘাস খাইতে।

0 মন্তব্যসমূহ