কবিতার বৈঠক: অসীম বাহাদুরের কয়েকটি কবিতা


ভাত না কান্না

চাচির প্লেটভর্তি অপমান আছিলো
তোমরা তিন ভাইবোন ভাত পাইলা না।
মা তোমাদের কান্না দেইখা
বাহির হইতে ঘরে আইনা 
তোমাদের আচ্ছামতন মাইরা
মুখে আঁচল দিয়া কাঁদলেন।

মায়ের কান্না দেইখা ভাত নিজের নাম পাল্টায়ে কান্না রাখল। 
এখন ভাতেরে ভাত কইয়া ডাকলে ভাত হু হু করে কাঁদে।
....

রাতের মৃত্যু 

চিন্তা আর কাজের প্রেশারে প্রেশারে তুমি নির্ঘুম হইয়া গেছিলা খুব। 
মাঝে মাঝে আমারে কইতা চলো কুয়াকাটা যাই, দূরে কোথাও ঘুরতে যাই।
দুুই তিনটা রাত শুধু তোমার বুকে মাথা রাইখা ঘুমাব। আমার বড্ড ঘুমের দরকার..
আমি বড় ক্লান্ত। 

আমি তোমারে বুঝতাম। সায়ও দিতাম... যাব যাব।

কিন্তু ঐ রাত আর আইলো না। 
ঐ রাত আটকা পইড়া গেল খারাপ দিনের জেলে। খারাপ দিন কি তারে এতদিন বাঁচায় রাখছে? 
রাখে নাই অথবা রাখলেও 
রাতটা আমাদের না পাইয়া দম বন্ধ হইয়া মইরা গেছে।
....

অস্তিত্ব 

উৎপলে উজ্জ্বল মুখ তোমার।
তবু তোমাকে দেখার ইচ্ছে হলে
রণজিৎ খুলে বসি
সারাক্ষণ সুঁই সুতোয় সেলাই করো আমাদের সামগ্রিক স্বপন।

যতদিন 
আমি মাসুদ খান পড়ব
বুকের ভেতর 
তোমার মনোহর ছোট্ট কুড়িগ্রাম 
ডেকে যাবে আয় আয়..  

মজনু শাহ 
অথবা
মাসুদার রহমান এর 'দাম্পত্য' কবিতায়
ভেসে উঠবে তোমার মুখ। 

যতবার
যতক্ষণ 
আপন মাহমুদ 
যতবার
যতদিন
সজল সমুদ্র
ততক্ষণ
ততদিন 
তুমি আমার 
কেবলই আমার

হৃদয়ের গহীন অরণ্যের ভেতর অডুবো চাঁদ হয়ে তুমি থেকে যাবে

থেকে যাবে শ্রীকান্তের সারাটা দিন 
মেঘলা আকাশে আকাশে
পরমব্রতের পরম নরম অভিনয়ের 
মৃদু বাতাসে বাতাসে

পৃথিবীর সমস্ত সাদা রঙ তোমাকে মা মা বলে ডেকে যাবে
কালো কাজলে 
লাল নীল সবুজ টিপে
সাদা শাড়িতে
বেলিফুলের খোঁপায় খোঁপায় তুমি থেকে যাবে
তোমার পরিপাটির বন্দনায় জগতের পাড়ায় পাড়ায় বয়ে যাবে অথামা আজানের নৃত্য।
প্রশান্তির শুশ্রূষায়
বাঙালের মদিরায়
রঙ্গনরেখার রংবাহারি রঙের ভেতর
তুমি থেকে যাবে।

বুকের ভেতর একটা সাহিত্য মজলিস তোমায় করুণ সুরে ডাকে যাবে
মনে হবে যেন রূপসার ঘাট আমি 
অনন্তকাল তোমার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। তোমার ফেরা হবে না। ফেরা হবে না।

তুমি থেকে যাবে।

...

পাহাড়ি স্বপন

সমুদ্র পছন্দ করা আমারে তুমি পাহাড়প্রেমি করেছিলা। বলছিলা, বয়স বাড়লে সব ছাইড়া ছুঁইড়া পাহাড়ে ঘর বাঁধব। ছোট্ট দুইটা কাঠের ঘর। পাহাড়ি পোশাক, নৃত্য, গান আর কবিতা কইরা কইরা জীবনের বাকিটা সময় পার কইরা দিব।

কবে জানি তোমার স্বপ্নের ভিত্রে ঢুইকা গেছিলাম। নিজেরে খুঁইজা পাইতাম পাক্কা জুমচাষিরূপে।
সিঁড়ি ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা দূর থাইকা তোমার জন্য পানি আনতেছি। তুমি হাত ঈশারায় ডাকতেছ।
তুমি আমার লাইগা রাঁধো পাহাড়ি শাক। লাল চালের ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের ভেতর 
কী যে চমৎকার তোমার ঘর্মাক্ত মুখ
আহা!

সেই স্বপনটাই দেইখা চলি দরদ
তোমারে আর দেখি না।
....

তোমার প্রেমিক— তোমার শিশু

বুদ্ধি হবার পর মা আমারে কোনদিন তেল দিয়া দিছে কিনা ঠিক মনে পড়ে না।
 
তয়, গোসলের পর প্রথম যেদিন তুমি আমার হাতে পায়ে তেল দিয়া দিলা— 
সাথে সাথে প্রেমিকা থাইকা তুমি হইয়া গেলা আমার মা। আমি হলাম তোমার শিশু। 

তারপর বড় হতে—
তোমার স্তনের বোটা চুষতে চুষতে একদিন গলায় দুধ বেঁধে বুকের ওপর মরে পড়ে রইলাম;
তুমি টেরই পেলে না।
...

লাবণী 

নদীর ওপার থাইকা লাবণী ছটপট করে
দেশের মানুষ তুমি এপারে দাঁড়ায়ে
ঘাটে কোন নৌকা নাই
লাবণী এদিক ওদিক দৌঁড়ায়
ছটপট করে
লাবণীর বুকটা ফাইটা যায়
দেশের মানুষ তুমি এপারে দাঁড়ায়ে
সাঁতার না জানা তুমি;
তোমার মইরা যাইতে ইচ্ছে করে
লাবণীর বুকটা ফাইটা যায় 
দেশের মানুষ তুমি ওপারে দাঁড়ায়ে।

নদী তোমাদের প্রেমে 
মূসার পথ হইতে পারে না।
...

বৃত্ত বন্দী 

ষোল বছরের তুমি ব্রিজের পিলার ধইরা কানতেছ
শহরের বেবাক মানুষ তোমারে দেখতাছে
ভালোবাসারে...
ভালোবাসার মানুষের জন্যে

সব ভালোবাসা ঐখানে খরচ হইয়া গেছে তোমার
আর তুমি কাউরে ভালোবাসো নাই।

তোমারে ভালোবাসে দেইখা
যারে তুমি সংসারে নিছিলা
সেও তোমারে ভালোবাসে নাই।

তার বাদে 
বহুদিন পর
তোমার ভালোবাসা আইলো
তারে তুমি ভালোবাসলা
আবার বাসলা না

মনে হইলো একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর তুমি তড়পড়ায়তেছিলা।
ঘুম ভাইঙা দেখলা
তুমি সেই ষোল বছরে
তুমি সেই পিলার

নিজেরে ধুইরা হাউমাউ কইরা কানতেছ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ