জয় দীপ্ত চক্রবর্ত্তীর কবিতা



রক্ত পিপাসু কলম

আমি প্রেম লিখতে চাইছিলাম শব্দজটে,

অথচ আমার কলম লিখে ফেলে খুন,

দারুণ রক্তের পিপাসা হয়েছে আজ কলমের,

এই বুঝি ছুঁটে যেতে চাইছে আমার হাত থেকে গলির মোড়ে,

নারকীয় তান্ডবে খুন করতে চাইছে 

সেইসব বুভুক্ষু নপুংসক পাপাত্মাদের-

যারা সবুজ পাতার মতো জন্মপথকে করে ছিন্নভিন্ন।


আমার কলম উপড়ে ফেলতে চাইছে সেসব চোখ-

যে চোখের দৃশ্যপটে পৃথিবীর জাগতিক সৌন্দর্যের চেয়ে-

প্রিয় হয়ে ধরা দেয় অবুঝ বালিকার বুঁক!

টুটি চিপে হত্যা করতে চাইছে-

স্লোগান দেয়া সেসব জালিতুন, ওয়াসিন, আওয়ানদের,

যাদের কাছে সত্যের চেয়ে বেশি পবিত্র হয়ে ওঠে সদম্ভের বীজ।


আমি ধর্ম, দর্শন ও পশুদের থেকে শিখেছি-

" স্বজাতির চেয়ে প্রিয়তম কিছু হতে পাড়েনা"

অথচ মানুষের থেকে শিখেছি-

"স্বজাতি খুনের চেয়ে পবিত্রতম কিছু হতে পাড়েনা"!


কি দোষ সেসব মরে যাওয়া সত্ত্বাদের,

যারা এই নগ্ন সভ্যতার শহুরে প্রাচীরের পাশে-

নিজের রক্ত জল করে খুঁজছিলো নতুন জীবনের,

কী দোষ সেসব আত্ম-চিৎকারে মরে যাওয়া শিশুদের-

যারা হয়তো বেড়ে উঠতে চেয়েছিলো মানুষ হয়ে এক চিলতে হাসিতে?


হয়তো তাদের মানুষ হয়ে জন্ম নেয়াই পাপ!

আমি মহাজ্ঞান রুপে ঈশ্বরকে মানি,

অথচ সেই ঈশ্বর কীভাবে এতটাই নিষ্ঠুর, নৃশংস, 

যে তার সেই মহাজ্ঞান বুঝে ওঠার আগেই তার সৃষ্ট নপুংসক দ্বারা কেড়ে নিয়েছে তাদের সম্ভ্রম, স্বাধীনতা, তথা গোটা জীবন?

আমার কলম দারুণ উন্মাদ হয়ে উঠেছে আজ,

এই বুঁঝি শিরদাঁড়া ছিড়ে একের পর এক লাশের পাহাড় গড়বে,

কারণ এই মানুষই তো তাকে শিক্ষা দিয়েছে-

"স্বজাতি খুনের চেয়ে পবিত্রতম কিছু হতে পাড়েনা"!


 

রক্ত থেকে সভ্যতায়

মরা খালের উপর জেগে ওঠা ইট-পাথরের শবের ওপর বসে-

আকাশে জলন্ত চাঁদের বুঁকে আমি দেখি হলুদ ঘাসের আলো,

আমার মনে পড়ে যায়-

সময়ের সমাধির ওপর বেঁড়ে উঠছে আমার তৃষ্ণার্ত মাংসের স্তুপ,

হৃদয়ের গহীন সবুজ অরণ্যের লাশের ওপর থেকে প্রেম প্রেম ঘ্রাণ পেয়ে-

দূরে সরে যায় অসংখ্য জোনাকির ডানা অস্তিত্বহীনতার দিকে,

আর আমি এই তাবৎ পৃথিবীর বাতাস বুঁকে পুড়ে এক মাতালের গোঙানি শুনতে থাকি,

সেই মাতালের হয়তো স্বপ্ন ছিলো তালগাছের পাতায় পাতায় লিখে রেখে যাবে তার শূন্যতার ইতিহাস,

অথচ পৃথিবী তাকে অকর্মন্য বিভৎসতা বলে ছুড়ে ফেলে দিলো এই খালের উপর বেড়ে ওঠা শবের নিচে,

তারই পাশে অসংখ্য শিশু ও প্রবীণের রক্ত দিয়ে আঁকা হচ্ছিলো নতুন পৃথিবীর গল্প!

আমি চিৎকার করে বলতে চাইলাম," এত রক্তের বিনিময়ে তোমরা কী পবে?"

তারা উত্তরে আমাকে আমার ঈশ্বর হয়ে দেখালো,

এবং যে ধোয়ার দল আমি বুঁকে পুড়ে খুন করছিলাম নিজেকে-

তারও বিনিময় মূল্যে লিখে দিলো আমার শিরার রক্ত!

আমার বড্ড ধোয়ার নেশা বলে আমি অনুমতি চাইলাম আমার রক্তের বদলে আমার ঘামের,

ঈশ্বরের দল আমাকে দিলো সেই অনুমতি, কিন্তু বিনিময়ে তারা কেঁটে নিলো অসংখ্য ভ্রোমরের কাঁটা মুন্ডু,

আর দরিদ্র শাবক হিসেবে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো এই সামাজিক গিলোটিনের নিচে!

অগত্যা আমার প্রত্যাশিত মৃত্যুও আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করায়-

আমি কবিতার কাছে আমার অভিযোগ জানিয়ে এখনও কেমন করে বেঁচে আছি এই হায়না সমাজের দরবারে!

আমার ভীষণ ইচ্ছা মৃত্যুর সাথে একবার প্রেম করে অমর হওয়ার!



 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ