পাবলিক টয়লেট | মিনহাজ রাফি


 

​মহাবিশ্বের কোনো এক রহস্যময় কারণে মানুষের সবচেয়ে বড় দার্শনিক উপলব্ধিগুলো আসে অত্যন্ত জাগতিক এবং গোপন কিছু মুহূর্তে। আর্কিমিডিস যেমন বাথটবে ডুবে ইউরেকা বলে চিৎকার দিয়েছিলেন, আমার আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক বোধোদয়টি ঘটলো চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এরিয়ার এক চরম ব্যস্ততম মোড়ের পাবলিক টয়লেটে ঢুকে।

​বাইরে তখন গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর, মাথার ওপর সূর্যটা যেন আগুন ঢালছে। আর ভেতরে এক অদ্ভুত, আদিম গন্ধের স্বাধীন সাম্রাজ্য। এই গন্ধকে পৃথিবীর কোনো নামী-দামি পারফিউম দিয়ে আড়াল করা যাবে না। একে বলা যায় বাঙালি মধ্যবিত্তের হতাশা, আলসার ও সকালের বাসি ডাল-ভাতের এক যৌথ কোলাহল।

​তবে দুর্গন্ধের এই আপাত-নারকীয় পরিবেশেই লুকিয়ে আছে অনেকগুলো চরম সত্য। পাবলিক টয়লেট হলো পৃথিবীর একমাত্র জায়গা, যেখানে এসে সমাজতন্ত্র আর পুঁজিবাদের সব দুর্ভেদ্য দেওয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বাইরে আপনি কোটি টাকার মার্সিডিজ কার থেকে নামা কোনো কর্পোরেট সিইও হোন, কিংবা বাসের টিকিট কাটার পয়সা না থাকা ফুটপাতের কোনো প্রলেতারিয়েত, ভেতরে ঢুকলে টিকিটের দাম সবার জন্যই সমান: নগদ পাঁচ টাকা। এই পাঁচ টাকার কয়েনটিই মূলত মানবজাতির সমতার শেষ অলিখিত দুর্গ। এছাড়াও মানুষের একাকিত্বে সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলোই কাটে টয়লেট বসে। এই নিভৃত মুহূর্তগুলোতেই মানুষ সবচেয়ে বেশি মগ্ন হয় নিজের ভাবনায়। কেউ সেখানে ফেলে আসা দিনের হিসাব মেলায়, কেউ জীবনের জটিল কোনো সমস্যার সহজ সমাধান খোঁজে, আবার কেউবা ভবিষ্যতের নতুন কোনো পরিকল্পনার বীজ বুনে ফেলে।

​প্লাস্টিকের ছিটকিনিটা আটকে যখন কমোডটায় বসলাম, তখন চোখ মেলতেই ভেসে উঠলো আসল দৃশ্যপট। আমরা যারা ভাবি আধুনিক সভ্যতার সব মতবাদ ফেসবুক বা টুইটারে জন্ম নেয়, তারা ভুল। পাবলিক টয়লেটের দরজাগুলো হলো মানব মনস্তত্ত্বের অলিখিত দেয়াল-পত্রিকা। জুকারবার্গ সাহেব দুনিয়াতে আসার বহু আগে থেকেই মানুষ যে এখানে মনের সুখে স্ট্যাটাস দিত, তার প্রমাণ চুনকাম করা দরজার গায়ে খোদাই করা আছে।

​চোখের ঠিক সামনেই নীল বলপেন দিয়ে অত্যন্ত কাঁচা হাতের অক্ষরে একজন লিখেছেন:

​"পকেটে নাই টাকা, মনটা বড় একা; পাঁচ টাকা ধার নিয়ে, আসলাম দিতে দেখা।"

​লাইনটি পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কী অদ্ভুত এর গভীরতা! কবি জীবনানন্দ দাশের আট বছর আগের একদিন কবিতার চেয়েও এই লাইনের অস্তিত্বসংকট তীব্র ও নগ্ন। এখানে লেখক শুধু নিজের নিঃসঙ্গতার কাব্যিক বিলাপ করেননি; তিনি যে পাঁচ টাকা ধার করে টয়লেটে ঢুকেছেন তা দিয়ে দেশের চলমান মুদ্রাস্ফীতি, মধ্যবিত্তের তারল্য সংকট এবং চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের এক নির্মম বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।

​ঠিক তার ইঞ্চিখানেক নিচেই আবার অন্য একজন কার্ল মার্ক্সের ভূত হয়ে যেন লাল কালির জবাব দিয়েছেন:

​"টাকা নাই তো কী হইছে ভাই, চাপ তো আর পুঁজিবাদ মানে না!"

​পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা যে মানুষের প্রাকৃতিক বেগকে কোনো শৃঙ্খলে বাঁধতে পারে না, এ যেন তারই এক চরম কড়া ইশতেহার!

ক্লান্তি ও চাপের বেগ কাটাতে চোখটা একটু ডানদিকের দেয়ালে ঘোরালাম। সেখানে আবার অন্য খেলা—আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও ভূরাজনীতির কূটকৌশল। বেশ বড় বড় হরফে লেখা:

​"আমেরিকা যা পারে না, চীন তা করে দেখায়।"

​লাইনটা পড়ে আমি অন্তত তিন মিনিট বদনা হাতে গভীর চিন্তায় মগ্ন রইলাম। বিশ্বের বাঘা বাঘা ভূরাজনীতিবিদরা যখন পেন্টাগন কিংবা ক্রেমলিনে বসে বিশ্বভাগের জটিল ছক কষছেন, তখন এই সস্তা প্লাস্টিকের বদনা হাতে নেওয়া দূরদর্শী থিঙ্কট্যাংকটি টয়লেটে বসেই দুই পরাশক্তির দৌড় মেপে ফেলেছেন। চীন আসলে মানুষের ঠিক কোন উপকারটি করে দেখিয়েছে, তা অবশ্য লেখক আর খোলসা করার সময় পাননি (হয়তো তাঁর প্রাকৃতিক কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল)। তবে আমার ধারণা, তিনি যে কমোডটিতে বসেছিলেন, তার নিচে হয়তো ছোট করে লেখা আছে 'মেড ইন চায়না'।

​পাবলিক টয়লেটের আরেকটি বড় ট্র্যাজেডি হলো রোমান্টিসিজম বা প্রেম। দরজার এক কোণায় জং ধরা পেরেকের আঁচড়ে কেউ একজন বুক ভাঙা আকুতিতে লিখেছেন:

​"তুমি কেন বুঝলে না সুমি, আমি শুধু তোমাকেই চু....."

আহ, কী এক তীব্র আবেগ! বাক্যটার দিকে তাকালে বোঝা যায়, সুমি নামের কোনো এক নির্মম উপন্যাসের নায়িকা এই চিরপ্রেমিককে অবহেলা করেছে, তার ভালোবাসা বোঝেনি। হয়তো সুমি এখন কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে সুখের সংসার করছে, আর এই প্রেমিক তীব্র পেটের তাগিদে পাবলিক টয়লেটে ঢুকেও সুমিকে ভুলতে পারছে না। পেরেকের আঁচড়ের গভীরতা বলে দেয়, লেখার সময় তার হাত কাঁপছিল, চোখে ছিল জল, আর মনে ছিল না-পাওয়ার তীব্র বেদনা। 

​তোমাকে চু"...... এর পর বাকি অংশটুকু আর পড়ার কোনো উপায় ছিল না। কারণ, ঠিক সেই সংবেদনশীল জায়গায় পরবর্তী কোনো এক রসিক পথচারী পানের পিক ফেলে সুমির প্রতি ভালোবাসার বাকি ইতিহাসকে চিরতরে লাল রঙে সমাহিত করে দিয়েছে। পানের পিকের সেই লাল রঙের সমাধি যেন পুরো বাঙালি রোমান্টিসিজমের ওপর এক চরম চড়।

​প্রেমের এই ট্র্যাজেডি কাটতে না কাটতেই পাশের কিউবিকল থেকে ভেসে আসলো এক কর্কশ ও আর্তচিৎকার। আধুনিক সেলুলার বিপ্লব যে মানুষের একাকীত্বকে কীভাবে হরণ করেছে, তা টের পাওয়া গেল তখনই। ওপাশ থেকে কেউ একজন ফোনে হাপাচ্ছেন আর বলছেন:

​"হ্যালো! হ্যাঁ বস, গুড আফটারনুন। আমি ঠিক জ্যামে আছি বস! জাস্ট অফিসের মোড়টায়। সিগন্যাল ছাড়লেই ১০ মিনিটের মধ্যে প্রেজেন্টেশন ফাইল নিয়ে কনফারেন্স রুমে ঢুকছি!"

​বাইরে তখন কোনো তীব্র ট্রাফিক জ্যামের শব্দ নেই, গাড়ির হর্ন নেই; আছে শুধু প্লাস্টিকের বদনা নড়াচড়ার মৃদু শব্দ আর এক নাছোড়বান্দা কর্মচারীর কর্পোরেট টিকে থাকার মরণপণ লড়াই। টয়লেটের হাই-ইকোর  ওপাশে থাকা বসের বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে কর্মচারীর এই জ্যাম আসলে গাড়ির চাকার নয়, পেটের ভেতরের চাকার। কিন্তু লিবারাল ক্যাপিটালিজমের এই নিষ্ঠুর যুগে এই সামান্য মিথ্যাটুকুই আমাদের চাকরি বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র অক্সিজেন।

আমি পাবলিক টয়লেটে ঢুকেছি কমে ১৫ মিনিট হয়ে যাচ্ছে। গতকাল বউ জোর করে তার হাতের নতুন রেসিপি আমার করুণ পেটের উপর চালিয়েছে। আমরা স্বামীরা মূলত আমজনতা, আর বউরা হলো স্বৈরাচার সরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বউরা হলো উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন, সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ, বেলারুশের আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো এবং রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের মতো আর আমরা স্বামীরা সে দেশের অসহায় জনগণ।  যাই হোক একেবারে কাজ শেষ করে যখন বের হবো, দরজার ছিটকিনির ঠিক ওপরে একটা ছোট কাগজের সতর্কবার্তা চোখে পড়লো। এটি হয়তো এই টয়লেটের সর্বেসর্বা কেয়ারটেকারের লেখা। তিনি লাল কালিতে লিখেছেন:

​"এখানে মোবাইল টিপিয়া ফেসবুক দেখিয়া সময় নষ্ট করিবেন না। আপনার ভেতরের চাপ সাময়িক হইতে পারে, কিন্তু বাইরে লাইনে খাড়া থাকা বাকি দশজনের পেটের চাপ চেরনোবিলের পারমাণবিক চুল্লির চেয়েও ভয়াবহ।"

​আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো লাইনটি কয়েকবার পড়লাম। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইন্সটাইন তাঁর থিওরি অফ রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার সূত্রে সময়ের যে ধীরগতির কথা বলেছিলেন (একটি জ্বলন্ত উনুনে হাত রাখলে এক মিনিটকে এক ঘণ্টা মনে হয়), কেয়ারটেকার তা মাত্র দুই লাইনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই প্রমাণ করে দিলেন। পাবলিক টয়লেটের দরজার বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জলবিয়োগকামী মানুষের কাছে প্রতিটা সেকেন্ড যে এক একটা আলোর গতি বা আলোকবর্ষের সমান, তা পাবলিক টয়লেটের কেয়ারটেকার ছাড়া আর কে বুঝবে!

​প্যান্টের বেল্টটা ঠিকঠাক করে পাবলিক টয়লেট থেকে বের হলাম। হাত ধুয়ে যখন পাঁচ টাকার কয়েনটা কেয়ারটেকারের খসখসে হাতের তালুতে রাখলাম। তার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, তিনি কি সুন্দর প্রতিদিন শত শত মানুষের ভেতরের অহংকার, দম্ভ ও বর্জ্য খালাস করার প্রক্রিয়াটি পরম নিরাসক্ত ভঙ্গিতে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন....

​আমি চোখের চশমাটা শার্টের কোণ দিয়ে মুছে নিলাম। তারপর আবার বাস্তব পৃথিবীর মেকি অভিনয়, কর্পোরেট ভদ্রতা আর মিথ্যার রাজত্বে ফেরার জন্য পিচঢালা তপ্ত রাস্তায় পা বাড়ালাম।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ