লাইভ ফ্রম গাবতলী | মিনহাজ রাফি


 
লাইভ ফ্রম গাবতলী 

​হাটের ভেতরে প্রচণ্ড কাদা, হৈচৈ আর মানুষের ভিড়। বেসরকারি টিভির এক তরুণ সাংবাদিক হাঁপাতে হাঁপাতে ছাতা মাথায় দিয়ে লাইভ করছেন।
​সাংবাদিক: "সুধী দর্শক, আমি এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি গাবতলী হাটের ঠিক মাঝখানে। আমার পেছনে যে বিশাল কালো কুচকুচে ষাঁড়টি দেখছেন, এর নাম রাখা হয়েছে ব্ল্যাক প্যান্থার। খামারি এটার দাম চাচ্ছেন ১৫ লাখ টাকা! আসুন আমরা সরাসরি খামারির সাথে কথা....."
​ঠিক তখনই ব্ল্যাক প্যান্থার আচমকা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দড়ি ছিঁড়ে ফেলল। তবে সে কাউকে গুঁতো দিল না, বরং সুড়সুড় করে এগিয়ে এসে সাংবাদিকের হাত থেকে বুম (মাইক) টা মুখের কাছে টেনে নিল। এরপর যা ঘটল, তার জন্য লাইভ স্টুডিওর নিউজ এডিটরও প্রস্তুত ছিলেন না।
​ব্ল্যাক প্যান্থার গম্ভীর, ভারী গলায়:
​"হ্যালো, টেস্টিং ওয়ান টু থ্রি... মাইকটা ঠিক আছে? দর্শকদের উদ্দেশে বলছি, দয়া করে কেউ চ্যানেল বদলাবেন না। অনেকদিন ধরে আপনাদের কিছু কথা শোনানোর জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আজ সুযোগ পেয়েছি।
​প্রথম কথা হলো, আমার খামারি আমার নাম রাখছে ব্ল্যাক প্যান্থার। কেন ভাই? মার্ভেল কমিক্সের হিরো না বানাইলে আমার দাম বাড়ত না? আমার আসল নাম মন্টু। এই হাটে আসার পর থেকে আমার কোনো আইডেন্টিটি নাই। একেকজন ক্রেতা আসে, আমার পিঠে ধপাস ধপাস করে চড় মারে, যেন আমি কোনো তবলা! তারপর বিড়বিড় করে বলে—'হাড়গোড় একটু বড়, মাংস কম হবে মনে হয়'।
​ভাই, ক্যামেরার সামনে হাত জোড় করে বলছি, আপনারা কি এখানে গরুর মাংসের ওজনের ডিজিটাল স্কেল কিনতে আসছেন, নাকি কোরবানি দিতে আসছেন?"
​ঠিক এই সময় পাশের খুঁটি থেকে একটা ছোট বলদ গরু চিৎকার করে উঠল।
​"ঠিক বলছিস রে মন্টু ভাই! একটু মিডিয়াকে বল, আমাদের এই অমানবিক সেলফি টর্চার থেকে বাঁচাতে!"
​ব্ল্যাক প্যান্থার ক্যামেরাটা নিজের দিকে আরও ঘুরিয়ে নিয়ে:
​"ঐ যে শুনলেন, ওটা আমাদের মেজবাহ ভাই। দেশি বলদ। ওর দুঃখ আরও বেশি। সকাল থেকে অন্তত পাঁচশত মানুষ এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে সেলফি তুলেছে, অথচ একজনও দাম জিজ্ঞেস করেনি! ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে কোরবানির ফিলিং উইথ বলদ ভাই ক্যাপশন দিয়ে রিলস বানাচ্ছে, কিন্তু কেনার সময় সবাই যাচ্ছে ওই এসি রুমে থাকা সাদা রঙের বিদেশি গরুর দিকে। এটা কি চামড়ার রঙের ওপর বৈষম্য নয়?
​আর ওই সাদা চামড়ার লন্ডন বাবুর ফুটানি দেখানোর জায়গা নাই। একটু কাদার ছিটে লাগলে এমনভাবে তাকায় যেন কোন ফাইভ স্টার হোটেল থেকে ইলিক্সিডেন্ট হয়ে এখানে চলে আসছে! খামারিরা ওদের পেছনে হরলিক্স আর আপেল খরচ করে আমাদের পেটে লাথি মারছে।"
গরু মেজবাহ ভাইয়ের পাশে থাকা আরেকটা গরুর দিকে এইবার ক্যামেরাম্যান ফোকাস করলো:
মেজবাহ ভাই, আমারটা শুনেন আমারে তো গরমে এসি রুম থেকে বের করে এই হাটের চট চটের মধ্যে এনে রাখছে। আমার তো হিট স্ট্রোক হওয়ার দশা! তার ওপর আমার খামারি আমার নাম দিছে পাঠান। ভাইরে, আমি অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত শান্তশিষ্ট ভদ্র গরু, মারপিটের পাঠান সিনেমার সাথে আমার কী সম্পর্ক? ক্রেতারা এসে আমাকে দেখে বলে 'এটার মাংস নাকি স্বাদ হবে না, শুধু চর্বি'। কেন ভাই? কষ্ট করে খেয়েদেয়ে শরীর বানাইছি, এখন চর্বির দোষ দিয়ে আমার দাম কমাবে? এটা বডি শেমিং ছাড়া আর কিছু না!"
এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা রোগা-পটকা আরেকটা দেশি বলদ এইবার বলতে লাগলো:
​"আপনারা তো ভিআইপি, আপনাদের দুঃখ বিলাসী দুঃখ! আমার দিকে তাকান। আমার খামারি অলরেডি হতাশ। আমার নাম দিছে পকেট ফ্রেন্ডলি বলদ। হাটে কোনো কাস্টমার আসলেই খামারি চিৎকার করে বলে "বাজেট কম? এই লন, একদম গরিবের গরু!' ভাই, গরিবের গরু মানে কী? আমার কি আত্মসম্মান নাই? সাইজে ছোট হইতে পারি, কিন্তু আমার ভেতরেও তো একটা গ্লোবাল গরুর আত্মা আছে। বড় গরুর দাম নাকি চার লাখ, আর আমার দাম ধরে রাখছে মাত্র সত্তর হাজার! এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাই!"
​সাংবাদিক ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে:
​"জী... মানে মন্টু ভাই... আপনাদের দাবিটা আসলে কী?"
​ব্ল্যাক প্যান্থার ক্যামেরার লেন্সের একদম কাছে মুখ এনে:
​"আমাদের দাবি পরিষ্কার। এই যে হাটে টোকেন সিস্টেম করা হয়েছে, হাসিল ঘরের ডিজিটাল বুথ করা হয়েছে, সব মানুষের সুবিধার জন্য। আমাদের সুবিধা কই?
​১. যারা শুধু হাটে এসে দামাদামি করে হাটের পরিবেশ গরম করে কিন্তু আসলে ছাগল কেনার বাজেটও নাই, তাদের হাটে ঢোকা নিষিদ্ধ করতে হবে।
২. গরুর পাছায় চড় মেরে মাংসের আন্দাজ করা যাবে না। আমাদের কি সুড়সুড়ি লাগে না?
৩. এবং সবচেয়ে বড় দাবি কোরবানির হাটের ক্রেতাদের জন্য একটা আচরণবিধি বা ম্যানার্স কোর্স চালু করতে হবে। হাটে এসে গরুর সামনে দাঁড়িয়ে গরুর সমালোচনা করা যাবে না। 'ঐ এটার সাইজ তো ছাগলের মতো', 'এটার ভুঁড়ি ঝুলে গেছে' এসব ফালতু কথা বলে আমাদের মেন্টাল হেলথ নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে। আমাদেরও একটা সেলফ-রেস্পেক্ট আছে!"
​বক্তব্য শেষ করে মন্টু ওরফে ব্ল্যাক প্যান্থার মাইকটা সাংবাদিকের হাতে ফেরত দিয়ে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে একটা জাবর কাটার অ্যাকশন দিল।
​সাংবাদিক হতভম্ব হয়ে: "দর্শক... আপনারা দেখছিলেন গাবতলী হাট থেকে সরাসরি... গরুর মুখপত্র। স্টুডিওতে ফিরে যাচ্ছি।"
​পাশ থেকে মেজবাহ ভাই সহ আরও গোটা দশেক গরু লেজ উঁচিয়ে 'হাম্বা' বলে লাইভ ব্রডকাস্টের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজিয়ে দিল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ