মধ্যরাতের মহাজোট | মিনহাজ রাফি


 
ঈদুল আজহার আগের রাত, আনুমানিক ২:৩০ মিনিট। ​বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। লাক্সারি হাইটসের আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো এসে পড়েছে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা বিএমডব্লিউ, অডি আর প্রাডোর ওপর। কিন্তু আজ রাতে এই দামী গাড়িগুলোর কোনো দাম নেই। আজ পুরো গ্যারেজের দখল নিয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গবাদিপশু সমাজ। চারদিকের বাতাসে কাঁচা ঘাস, খড় আর গোবরের মিশ্রিত গন্ধ। সিকিউরিটি গার্ড মকবুল মিয়া এক কোণায় টুলের ওপর বসে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। মানুষেরা যখন ওপরের ফ্ল্যাটগুলোতে এসি চালিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। ঠিক তখনই নিচের আন্ডারগ্রাউন্ডে শুরু হলো এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত গোপন মতবিনিময় সভা।

​সভার সভাপতিত্ব করছে চারতলার ফ্ল্যাটের মালিকের বিশাল সাইজের লাল রঙের কুষ্টিয়ার বলদ লাল তুফান। তার গলার লাল টুকটুকে প্লাস্টিকের মালাটা একটু ঝাঁকিয়ে, গলার দড়িটা দাঁত দিয়ে টেনে আলগা করে সে সবাইকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় একটা দীর্ঘ ডাক দিল—‘হাম্বা’। এটা আসলে সভার সূচনা সংকেত।

​লাল তুফান গম্ভীর, আভিজাত্যপূর্ণ ও রাজনৈতিক মুরুব্বি কণ্ঠে বলা শুরু করল:
​"উপস্থিত কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ এবং মিরকাদিমেরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে আসা সহযোদ্ধাগণ আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। আগামীকাল সকালের সূর্য ওঠার সাথে সাথেই আমাদের জীবনের ফাইনাল ম্যাচ। আল্লাহর নামে আমরা আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছি, এইটা আমাদের সৌভাগ্যও বটে। কিন্তু এই ভবনের তথাকথিত এলিট মানুষগুলোর কর্মকাণ্ড দেখে গত দুই দিন ধরে আমার জাবর কাটার রুচি চলে গেছে। আজ রাতে এই মিটিং ডাকার মূল কারণআমাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা এবং মানুষের শো-অফ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে যাওয়া। 

​লাল তুফানের কথা শেষ হতে না হতেই গ্যারেজের ৫ নম্বর পিলারের পাশ থেকে তীব্র রাগে ফুঁসে উঠল সাদা পাহাড়। সে ছয় ফুট উচ্চতার ধবধবে সাদা এক মিরকাদিমের গরু। চেহারার মধ্যে একটা বনেদি ও রাজকীয় ভাব আছে।
​সাদা পাহাড় শহুরে আভিজাত্যে ক্ষুব্ধ হয়ে বলতে লাগল:
​"প্রেসিডেন্ট ভাই, আপনার কথার সাথে আমি শতভাগ একমত! আমার খামারি আমাকে রাজকীয়ভাবে বড় করেছে। সকাল-বিকাল ফ্যান চালিয়ে রেখেছে, খৈল-ভুসি খাইয়েছে। কিন্তু এই ফ্ল্যাটের মালিক আমাকে হাটে কোনো পশু হিসেবে দেখেনি, দেখেছে একটা স্ট্যাটাস সিম্বল বা সামাজিক মর্যাদার হাতিয়ার হিসেবে। বিকেলে ওনার ১০ বছরের ছেলে বন্ধুদের নিয়ে এসে ফেসবুকে লাইভ করছিল। আমার সামনে নাচানাচি করে দুই একটা টিকটকও করলো। ওহ্‌, ভাবতেই আমার শিং দুটো লজ্জায় গরম হয়ে যাচ্ছে! ​ছেলেটা ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করে বলছিল ‘হোয়াটস আপ গাইস, আই এম পপন ভিডিও,মিট আওয়ার নিউ মেম্বার, দাম মাত্র ৩ লক্ষ টাকা! ডোন্ট ফরগেট টু লাইক অ্যান্ড সাবস্ক্রাইব!’ ​ভাইরে ভাই, আমার কি কোনো পার্সোনাল ডিগনিটি নাই? আমি কি ওনাদের নতুন আইফোন ১৬ নাকি আইপ্যাড যে এভাবে লাইভে এসে প্রাইজ ট্যাগ দেখাতে হবে? তার ওপর ওনার স্ত্রী এসে আমার সাথে সেলফি তোলার জন্য ঠোঁট বাঁকা করে পাউট করছিলেন! কি ঢং সে মহিলার। আমার তো মনে হচ্ছিল ওনাকেই একটা আলতো করে গুতো দিয়ে দিই। কিন্তু আমি আবার মেয়েদের সম্মান করি তাই কিছু করি নাই। তবে কর্মকান্ড আমাদের গবাদিপশু সমাজের ওপর স্পষ্ট মানসিক নির্যাতন!"

​সাদা পাহাড়ের ঠিক পাশেই বাঁধা ছিল মিস্টার ফিটনেস। সে কালো কুচকুচে নেপালি ক্রসব্রিডের এক তেজী ষাঁড়। জিম করা বডির মতো তার শরীরের পেশিগুলো খাঁটি সরিষার তেলে চকচক করছে। সে ক্ষোভের চোটে পেছনের পা দিয়ে গ্যারেজের পাকা মেঝেতে খট খট শব্দ করে লাথি মারল।

​মিস্টার ফিটনেস (ফিটনেস ফ্রিক ও ডায়েট সচেতন ভঙ্গিতে):
​"আরে সাদা ভাই, আপনার তাও ভালো সেলফি তুলছে। আমার মালিক তো একটা আস্ত কিপটা ও শো-অফ খোর! সাড়ে সাত লাখ টাকা দিয়ে হাটে সবার সামনে বুক ফুলিয়ে আমাকে কিনে এনেছে, আমাকে নিয়ে পুরো রাস্তায় শো-অফ করেছে কিন্তু গ্যারেজের দারোয়ানকে দিয়ে যে ঘাস আর ভুসি ওনারা খাওয়াচ্ছেন, সেটার কোয়ালিটি অত্যন্ত থার্ড ক্লাস! বাসি।  খড়গুলোও দিয়েছে ভেজা ভেজা...  ভেজা খড় কি আমাদের রুচিতে পড়ে আপনারাই বলেন...
​অন্যদিকে ওনারা একটু আগে ফুড ডেলিভারি অ্যাপ দিয়ে কতগুলো  বার্গার আর পিজ্জা অর্ডার করে আনালেন।  কমে তো ৩ ৪ হাজার টাকার হবে। ওনাদের নিজেদের খাবারের বাজেট আকাশচুম্বী, আর আমাদের ডায়েটের ওপর ওনাদের কোনো বাজেট নাই! অথচ কোরবানির পর ফেসবুকে লম্বা চওড়া পোস্ট দেবেন 'আলহামদুলিল্লাহ, সম্পূর্ণ অর্গানিক ও চর্বিমুক্ত মাংস’। মানুষের এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বিমুখী নীতি আমি আর সহ্য করতে পারছি না! প্রোটিন ছাড়া কি এমন বডি বানানো সম্ভব?"

​ঠিক এই সময় পার্কিং লটের একদম অন্ধকার কোণ থেকে, একটা প্রাডো গাড়ির চাকার আড়াল থেকে ম্যা-ম্যা করে করুণ সুরে কেঁদে উঠল এক ছোটখাটো, রোগা-পটকা ছাগল। তার নাম বুড্ডু।

​বুড্ডু হীনম্মন্যতায় ও  ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো:
​"ভাই সাহেবরা, আপনারা তো বড় বড় সেলিব্রেটি। দাম লাখের ওপরে, গ্যারেজের মাঝখানে জায়গা পাইছেন। আমার দিকে একটু তাকান। তলার ফ্ল্যাটের মালিক আমাকে কিনে এনেছে মাত্র পঁচিশ হাজারে। সস্তা বলে আমাকে এনে এই বড় গাড়ির চাকার আড়ালে, অন্ধকূপে বেঁধে রেখেছে। কেউ আমাকে একটা শুকনো ঘাসও জিজ্ঞেস করতে আসে নাই। 
​সবচেয়ে বড় অপমানটা কী জানেন? একটু আগে ওপরের ফ্ল্যাটের একটা ছোট বাচ্চা ওনার দামি বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে নিচে নেমেছিল। বিড়ালটা আমার দিকে তাকিয়ে এমন একটা লুক দিল, যেন সে-ই এই গ্যারেজের মালিক! আর বাচ্চাটা আমাকে দেখে বলল ‘হায় আল্লাহ মামণি, এটা তো একটা আস্ত ছাগল না, এটা একটা বড় সাইজের কালো বিড়াল!’ ভাই, সাইজে ছোট হইতে পারি, কিন্তু আমারও তো একটা সেলফ-রেস্পেক্ট আছে। সাইজ আর দাম দিয়ে লিভিং বিয়িংকে বিচার করা এই গুলশানের সোসাইটির মজ্জাগত রোগ। উনাদের কিছু কিছু জিনিস তো ছোট হয়, দাঁড়াতে পারে না,  আমরা কি তাদেরকে কখনো বিচার করেছি....?

​বুড্ডুর কান্না দেখে গ্যারেজের ড্রেন ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কুচকুচে কালো এক মহিষ চোখ বড় বড় করে তাকাল। তার নাম গাবতলীর ডন। তার নাকের রিংটা নড়ে উঠল।

​গাবতলীর ডন ভারী ও গম্ভীর ব্যারিটোন ভয়েসে বলল:
​"শোনো পল্টু ছাগল, কান্নাকাটি বন্ধ করো। এই অ্যাপার্টমেন্টের মানুষদের সাইকোলজি আমি খুব ভালো করে স্টাডি করেছি। এই হালারা হলো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কাল সকালে যখন আমাদের কোরবানি দেওয়া হবে, এরা মাংসের কোয়ালিটি বা কোরবানির পবিত্রতা দেখার আগে দেখবে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড ঠিক আছে কি না। আইফোনের পোট্রেট মোডে আমাদের রক্তাক্ত লাশের ছবি তুলে ওনারা ক্যাপশন দেবেন ‘ফিলিং ব্লেসড উইথ ফ্যামিলি’।
​তাই আমার একটা সলিড প্রপোজাল আছে। কাল সকালের আগে আমরা একটা নীরব ও অহিংস ধর্মঘট করব। কেউ ওনাদের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দেব না। কোনো সেলফি তুলতে দেব না। যখনই কেউ ফোন উঁচিয়ে ধরবে, আমরা সবাই একসাথে ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে লেজ নাড়াতে থাকব। ওনাদের ক্যান্ডিড ছবি তোলার শখ আমরা কাল সকালেই মিটিয়ে দেব! নো ডিরেক্ট ফেস, ওনলি ব্যাক সাইড!"

​সবাই যখন গাবতলীর ডনের এই বুদ্ধি শুনে টেবিল চাপড়ানোর মতো করে খুর দিয়ে মাটিতে আওয়াজ করছিল, তখন সভাপতি লাল তুফান সবাইকে থামার জন্য মাথা নাড়াল।

​সভাপতি লাল তুফান:
​"চমৎকার এবং যুগান্তকারী প্রস্তাব, ডন ভাই! তবে আমাদের আরও একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবেশগত বিষয়ে একমত হতে হবে। কালকে কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর এই অলস মানুষগুলো কিন্তু আমাদের বর্জ্য বা ময়লা দ্রুত পরিষ্কার করতে অলসতা করবে। তারা সব ময়লা-রক্ত রাস্তার মোড়ে বা ম্যানহোলের পাশে ফেলে দিয়ে ঘরের এসি ছেড়ে নাক ডেকে ঘুমাবে, আর চারদিকে গন্ধ ছড়াবে। অথচ পরদিন সকালে পত্রিকায় এবং টকশোতে দোষ হবে কার? আমাদের! মানুষ বলবে ‘কোরবানির পশুর জন্য শহর নোংরা হয়েছে’। ​তাই আমাদের শেষ এবং প্রধান দাবি মানব সমাজ যেন পরিবেশ সচেতন হয়। তারা যেন আমাদের চামড়া আর বর্জ্য সঠিকভাবে নির্দিষ্ট সময়ে প্রসেস করে। আমরা আমাদের জীবন আনন্দচিত্তে বিলিয়ে দিচ্ছি মানুষের কল্যাণে, অন্তত চারপাশের পরিবেশটা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তো ওনাদের নাগরিক হিসেবে নেওয়া উচিত!"

​লাল তুফানের এই পরিবেশবাদী ও যৌক্তিক বক্তব্যের পর পুরো গ্যারেজের পরিবেশ গম্ভীর হয়ে গেল। সব পশুই মাথা নেড়ে এই দাবিকে সমর্থন জানাল।

​ঠিক এই সময়ে গ্যারেজের লিফটের দরজাটা টুং শব্দ করে খুলে গেল সিকিউরিটি গার্ড মকবুল মিয়া ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে দাঁড়াল। লিফট থেকে নামছেন অ্যাপার্টমেন্টের সেক্রেটারি সাহেব, ওনার হাতে একটা বড় পানির বালতি আর লাঠি। ওনার পাউডার মাখানো ফর্সা চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে উনি সকালের প্রস্তুতি দেখতে এসেছেন।
​মহাজোটের আন্ডারগ্রাউন্ড বৈঠক তখনই সমাপ্ত ঘোষণা করা হলো। লাল তুফান, সাদা পাহাড়, মিস্টার ফিটনেস, গাবতলীর ডন এবং ছোট ছাগল বুড্ডু সবাই একসাথে অত্যন্ত সুরেলা, রাজকীয় এবং ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে শেষবারের মতো চিৎকার করে স্লোগান দিয়ে উঠল: ​"হাম্বা! ব্যা-আ-আ! হাম্বা!"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ