১.
আমরা ক্ষুধার্ত মানুষ,
কেবল দু'মুঠো ভাতে এক চিমটি শান্তি হলেই খুশি।
আমাদের জীবনের সমস্যা—যেকোনো বিপ্লবের চাইতে কম নয়।
পৃথিবীর যাবতীয় দাঙ্গা, ফ্যাসাদ—আমাদের জন্য অহেতুক মাথাব্যথা।
আমাদের মাথায় চেপে থাকে—পরের বেলায় কী খাবো,
আর একশোটা টাকা পেলে এক দিনের ওষুধ আনা যেতো
এবং স্কুলের বেতনের জরিমানার চিন্তা।
আমরা গোগ্রাসে শরৎ, বিভূতি, ছফার আস্বাদনে মত্ত থাকি আমাদের ভাতঘুমে।
আমাদের হতাশা নিরসনের উপায় কেবল প্রেমিকের দুদণ্ড পাশে বসে অযথা আলাপ।
আমাদের ইনসমনিয়ার রাত কেটে যায় ঘুমের তড়িকা খুঁজতে খুঁজতে।
মাঝরাত পেরিয়ে গেলে আমরা পুরাতন স্মৃতি মনে করে কাঁদতে থাকি কোনো গজলের সুরে সুরে;
আমাদের প্রাক্তন রহস্যদের দ্বার উন্মোচন হয়—
একসময় ঘুমিয়ে পড়ি নোনতা জলের রেখা চোখে ধরে।
স্বর্গ পাবার লোভে আমরা কেবল কাজের ফাঁকে ঈশ্বরের নাম জপি।
আমাদের আনন্দ—শখের গাছভর্তি ফুলে আর ভেজা বালুচরে;
দুঃখ চিরন্তন হয়ে বসে আমাদের সিলিংফ্যানে।
আরও একটু চিন্তা নিয়ে টেবিল ল্যাম্পটা বন্ধ করলাম,
বিদ্যুৎ বিল বড্ড বাড়ছে।
২.
তুমি চাইলেই যে শীতল পাটি হইয়া যায়—
ঠাণ্ডা করে তোমার মন, শরীর;
অবেলায় কোনো বৃষ্টি পাইলে, তারে ভুইলা যাইও না, চাঁদ।
অবান্তর কথা কইয়া যে তোমার কষ্ট ভুলায়,
হাতে কইরা আগায়া দেয় জলের গেলাস—
ঝরণার সামনে গিয়া, তার হাত ছাইড়ো না।
অবশেষে যে তোমারে ভালোবাসলো,
আঁচলে বাঁইধা থুইবার চাইলো—
তারে ফিরায়া দিও না।
সে তোমারে তার ঈশ্বরের স্থান দিয়া ফালাইছে— জাইনো।
৩.
পাখিরা উড়ে গেছে যে যার এদিক-ওদিক—
কর্মহীনের মতো বসে ছিল কিছু টংয়ের দোকানে কিংবা পাড়ার মাঠে।
পাখিরা কি তবে মানুষ হলো?
ফানুস হলো নীল আকাশে— অরুণ আলোয়, শীতল হাওয়ায়?
ওরাও কেন স্বপ্ন দেখে ঘর বানাবার— অট্টালিকায়, বটের ছায়ায়?
ওরাও কেন রোজ সকালে কাজের খোঁজে হেঁদিয়ে মরে,
ফিরে আসে সন্ধ্যে করে?
ওরাও কি শান্তি খোঁজে?
অবশেষে ক্লান্ত হয়ে, নিরাশ হয়ে দু’চোখ বোজে?
ওরাও কি রোজ বাবার চশমা, মায়ের ওষুধ, ছেলের জামা, স্ত্রীর জমার ভাবনা করে?
আমরা ভাবি, পাখির মতো স্বাধীন হবো—
আকাশটাকে মুঠোয় পুরে উড়ে যাবো সকাল-বিকেল।
একটু যদি ক্লান্ত লাগে, জিরিয়ে নেবো পথের ধারে।
টাকা দুই-এক গচ্ছা গেলেও শান্ত মনে ফিরবো ঘরে।
এমন যদি হতো,
ইচ্ছে হলে আমিও হতাম বাবুই কিংবা চড়ুই।
অ্যালার্ম বাজলে চমকে তাকিয়ে দেখি,
আমি আজও মানুষই আছি— হয়নি বাবুই পাখি।
পাখিরাও আজ মানুষ হবে,
ব্যস্ত দিনের ফানুস হবে— ঠিক আমারই মতো।
আমরা কেবল ভোর হতে দেখবো,
দেড় প্রহরের বৃষ্টি শেষে টকটকে লাল ভোর।
৪.
আজ ভোরের প্রথম কিরণ এসে পড়েছে গতরাতের উচ্ছিষ্ট দাহের ওপর।
অপঘাতে মৃত্যু বলে বিধাতা দায় এড়িয়েছেন যেখানে।
সে কোনো তরুণী ছিল না,
কিংবা উঠতি কিশোরী।
তার প্রেমিক ধোঁকাবাজ ছিল না, কিংবা বজ্জাত স্বামী।
সংসারের ঘানিতে পিষ্ট এক এয়ো বৃদ্ধা সে,
ঈশ্বরকে ডাকবে বলে সন্ধ্যেকালে জলের ধারে নাইতে গেল।
সেই যে গেল, আর এল না ফিরে।
সন্ধ্যে শেষে রাত্রি নামে।
বছর পঁয়তাল্লিশের নিয়মে ভাটা পড়ল তখন;
ঠাকুরঘরে উপাসনা কে করে আজ!
সেই অন্ধকারে তলিয়ে গেল গৃহলক্ষ্মী।
ডুবে মরল এক ঈশ্বরনিষ্ঠ বৃদ্ধা।
ভক্তিতে নয়, সংসারের জল-সমাধি।
আর একদল ঈশ্বরপ্রেমী তার নাম দিল, অপঘাত।
রাত গড়ায়, হরিধ্বনি রব তোলে কারা যেন বুড়ির বুক চিরে।
বুড়ি মরেছে, অপঘাতে।
ভোরের কিরণে চিতার ধোঁয়া সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে যায়।
বিধাতার এতে দায় নেই।
এসেছে যে, তারে যেতে হবে —
নতুনেরে স্থান ছেড়ে দিতে হবে।
তোমার বিধাতা তা-ই বলে।
আমার বিধাতা— নিরব কেবল।
৫.
এইবার যদি ঈশ্বর প্রতারণা না করেন,
তবে তোমারে আমার হওনের থাইকা কেউ আটকাইবার পারবো না।
এইবার আমার কপালে ভালোবাসা আসবার রাস্তা কেউ ভাঙবার পারবো না।
এত মায়া দিয়া যদি কেউ বাইন্ধা থোয়, আমি সারাজীবন এমনে চাইয়া কাটাই দিবার পারমু।
খালি এই একটা বার যদি আমারে বিশ্বাস করাও—
জীবনের শেষ দিনও আমি ভালো থাকবার পারি;
স্বর্গসুখ ত্যাগ দিবার পারি তোমার লাইগা।
একটা বার যদি আমার হাত ধইরা ছাইড়া না যাও,
আমারে না কান্দাও,
আমারে না দেও বিষের বেদনা—
আমি বক্ষখানা পাইতা দিমু তোমারে থাকনের লাইগা।
এর চাইতে বড় জায়গা তুমি কই পাইবা?
আমি প্রত্যেক দিন ঈশ্বররে কই—
হে ঈশ্বর, এইবার যদি উতড়াইয়া যাই সমস্ত প্রতারণা থাইকা!
আমি স্বর্গ থুইয়া তারে খুঁইজা নিমু,
যে আমার লাইগা এক বুক আশা বান্ধে।

0 মন্তব্যসমূহ