উড়ে গেছে বুনোহাঁস রেখে স্মৃতির সরোবর, আর এখানটায় ভরে গেছে বেদনার কচুরিপানা। আকাশ এখনও লাল হয়ে ওঠে হামেশাই। শীত শীত মধ্যরাতে কাঁথা না পেয়ে জুবুথুবু শুয়ে থাকা- এই তো জীবন! ছারপোকা লেগে থাকে শরীর জুড়ে, কিছুই করার নেই, তার থেকে বেদনার পাঁজরে সুঁচের মতো বিঁধে থাকে অবহেলা। সাগর শান্ত হয়ে গেছে, হৃদয় শান্ত হবে কবে?
পাখা মেলেছে সব আশার হাওয়া পাখি হয়ে, আর ব্যক্তিগত পাখি হয়ে গেছে হাওয়া। তীব্র ব্যাকুলতায় আঙ্গুল বাড়িয়ে পাই- শুধুই শূন্যতা। এখানে একা, নিঃসঙ্গ জীবনে বাঁচার একটু উপলক্ষ খুঁজতে গেলে প্রতিধ্বনিত হয় অবমাননার তীক্ষ্ণ আওয়াজ। রাত-দুপুরে রেলের হুইসেল, নীল আগুনের শিখা পুড়িয়ে দিচ্ছে আশার মোমবাতি। তবু রেইনফরেস্টের বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের চিরকাল আড়ালে-আবডালে অযত্নে বেঁচে থাকা।
তিন
তোমার দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে হাঁপিয়ে গেলে, একদিন পৃথিবীজুড়ে নেমে এলে সমস্ত বিষাদ আর নির্লিপ্ততা, আমি নীরব কোনো আখ্যানে ফিরে আসবো। চুপচাপ অপ্রকৃতস্থ কোনো মানুষের মতো ফিরিয়ে নিয়ে সব প্রত্যাশা, এই পৃথিবীর কাছে আমি প্রেমিক হিসেবে এক তুমুল অপচয়- এইটুকু স্বীকার করে চিরকালের মতো চুপচাপ হয়ে গেলে- তুমি হয়তো একদিন বুঝে যাবে, তোমার হৃদয়ের দরজায় একদিন এসেছিলো তুমুল ভালোবাসা।
তবু সবটুক নীরবতা মেনে নিয়ে, তোমার কাছে ভালোবাসা পৌঁছাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে আমি এইটুকু মেনে নেবো- এক ব্যর্থ মানুষ আর অযোগ্য হৃদয় ছাড়া আমার আর কিছুই নেই, কেউ নেই। সাইবেরিয়ার বরফ যদি গলে যেতে পারে, তবু তুমি আমার হতে পারবে না, শুচিস্মিতা? জানি হতে পারবে না। হায়, কিছুই না পাওয়ার নিয়তি যে আমার!
সবটুকু জেনে কড়া নেড়ে যাই তোমারই কাছে। ‘তোমাকে পাবো না’ এই সত্যের বিরুদ্ধে অসম-অলৌকিক যুদ্ধ আমাকে বেদনা ছাড়া দিতে পারবে তোমার নির্লিপ্ততাই। তবু কড়া নাড়ি এক পৃথিবী দুঃখ আমার হবে- এই প্রাপ্তির স্বপ্নে।
এক পৃথিবী দুঃখ? তাতে কী! কিছু তো একটা অন্তত পাবো।
চার
আমি জানি তুমি আমাকে দেখছো। প্রতিবার আয়নায় দাঁড়িয়ে লেপটে যাওয়া কাজল তুলতে গিয়ে, তুমি মূলত আমাকেই তুলে ফেলো। আমি জানি তুমি আমাকে দেখো। তোমার নাকফুলের ঠিক মাঝে আমি বসে আছি অনেক বছর হয়।
বলিনি নক্ষত্র হও, বরং তুমি আমার মৃত্যুর ফেরেশতা হয়ে থাকো, শেষ প্রাণ হিসেবে তোমার সদম্ভ বিচরণ হোক আমার অন্তিম মুহূর্তে!
তোমাকে দেখছি, তোমাকে দেখছি- ভরা সন্ধ্যায়, উত্তপ্ত দুপুরে, দেখছি তাহাজ্জুদের পবিত্র ওয়াক্তে। আমার বুকের ভেতর পাথর হয়ে যাওয়া অনুভূতির মিনারে বসে থাকো তুমি। বুকটা ভারি হয়ে আসে, আর হুহু করে বেরিয়ে আসে লু হাওয়া।
জানি, তুমি আমাকে দেখছো, নীল সমুদ্রের ফেনীল বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া কোনো অপার্থিব দৃশ্যে। জানি, আমাকে ভালোবেসে চরম উচ্চতায় উঠে যায় তোমার ঘৃণার পারদ। আর তোমাকে ঘৃণা করে আমি যেন বিনির্মাণ করি নিবেদনের এক মনোরম ইমারত; যেখানে সব ঘৃণা- ভালোবাসার এক সবুজ মিনার!

0 মন্তব্যসমূহ