আমাদের ঘরের পেছনে একটা পুরোনো সেগুন গাছ ছিল। বৈশাখের মাতাল হাওয়া এলে সে গাছের পাতারা নিজেদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন তুলত, আর শীতের পাতাঝরা সন্ধ্যায় পুরো উঠোন ছেয়ে যেত কড়কড়ে শুকনো পাতায়। অন্ধকার নামলেই মা একমনে সেই পাতারাশি কুড়িয়ে এনে উঠোনের এক কোণায় জটলা পাকাতেন। দেশলাইয়ের একটা কাঠির কাঁপতে থাকা আলো সেই পাতায় ছুঁতেই চটচট করে আগুন জ্বলে উঠত। ধোঁয়া আর ধূপের মতো একটা ওমের সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াত। মা বলতেন, “আয় মনু, হাত সেঁকে নে।” আমি আর মা সেই আগুনের ওমে হাত রেখে চুপচাপ বসে থাকতাম। আকাশের তারারা তখন ধীরে ধীরে ফুটত, আর আমার মনে হতো, দুনিয়ার সব শীত বোধহয় এই আগুনের আগুনে গলে জল হয়ে যাচ্ছে।
তখন আমার বয়স দশ কি এগারো। স্কুলের চারুকলার ক্লাসটা ছিল আমার কাছে রূপকথার কোনো দরজার মতো। আমাদের শিক্ষক বিজন বাবু যখন সাদা ক্যানভাসে তুলির একটা টানে নীল আকাশ বা লাল সূর্য ফুটিয়ে তুলতেন, আমার বুকের ভেতর কেমন যেন এক অবুঝ হাহাকার জেগে উঠত। ক্লাসের অন্য ছেলেরা যখন কাঠের জলরঙের বাক্স খুলে সারি সারি রঙিন টিউব সাজিয়ে বসত—লেমন ইয়েলো, ক্রিমসন রেড, কোবাল্ট ব্লু—আমি তখন তাদের দিকে এক অদ্ভুত তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকতাম। কাঠের বাক্সের ঢাকনা খুললে কাঠ আর কাঁচা রঙের মেশানো যে তীব্র, মাদকতাময় একটা গন্ধ বের হতো, তা আমার নিঃশ্বাসে বিঁধে যেত।
একদিন বিকেলবেলা, মা তখন বারান্দায় বসে সূচ-সুতো দিয়ে পুরোনো কাঁথায় পাড় বুনছিলেন। রোদের একটা তির্যক আলো এসে মায়ের ক্ষয়ে যাওয়া গালে পড়েছিল। আমি মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে খুব আস্তে করে বলেছিলাম,
“মা, আমাকে একটা বারো রঙের জলরঙের বাক্স কিনে দেবে? বিজন স্যার বলেছেন, রঙ না থাকলে আমি নাকি ভালো ছবি আঁকতে পারব না।”
মা হাতের সেলাইটা থামিয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখ দুটো থমকে গিয়েছিল। তারপর আমার চুলে হাত বুলিয়ে, রান্নার ধোঁয়া আর পুরোনো সূচের গন্ধমাখা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন,
“তোর তো ড্রয়িং খাতাটাই এখনো কেনা হয়নি রে মনু। খাতাটা আগে কিনি, তারপর রঙের বাক্স।”
সেই ‘তারপর’ আর কোনোদিন আসেনি। চারুকলার ক্লাসে অন্য ছেলেরা যখন ক্যানভাসে রঙের নদী ভাসাত, আমি তখন পেট ব্যথা বা মাথা ঘোরার বাহানা করে বারান্দায় এসে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতাম। দূর আকাশের মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, ঈশ্বর কি শুধুই ধনীদের ক্যানভাসে রঙ ছিটান?
আমাদের ক্যানভাস কেন চিরকাল শুধু পেন্সিলের কালো দাগে ঢাকা পড়ে থাকে? মনের ভেতরে এক গভীর অভিমান, এক নিরবচ্ছিন্ন ক্ষোভ জমে জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল। আমি ধরে নিয়েছিলাম, আমার মা আমাকে ভালোবাসেন, কিন্তু আমার এই ছোট্ট স্বপ্নটাকে ছোঁয়ার ইচ্ছাটা তাঁর নেই।
সময় কেটেছে নদীর স্রোতের মতো। নদীর তলার পাথর যেমন ঘষে ঘষে মসৃণ হয়ে যায়, আমার অভাবের ক্ষতগুলোও তেমনি সময়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আজ আমার বয়স পঁয়ত্রিশ। চট্টগ্রাম শহরের এক কোণে আমার গুছানো সংসার। ইট-কাঠের বহুতল ভবনের সাততলায় আমার ফ্ল্যাট, বারান্দায় সারি সারি টবে লাল-নীল পাতাবাহারের মেলা। ডেভলপমেন্ট ফার্মের লাল ফিতার ব্যস্ততা, মাস শেষে পকেটের মসৃণ ভার—সবই আছে। আর আছে আমার দশ বছরের মেয়ে, দিয়া।
দিয়া ছবি আঁকতে ভালোবাসে। ওর ঘরের এক কোণায় দামি কাঠের ইজেল, সারি সারি ইতালিয়ান ক্যানভাস, টিউব ভর্তি অ্যাক্রিলিক, অয়েল পেস্টেল আর জলরঙের রাজত্ব। ও যখনই কোনো রঙের নাম মুখে আনে, আমি পরদিনই শহরের সবচেয়ে নামি দোকান থেকে তা এনে ওর টেবিলে সাজিয়ে দিই।
আমার স্ত্রী একদিন আমায় মৃদু হেসে বলেছিল,
“তুমি ওকে একটু বেশিই দিচ্ছ। একটা দশ বছরের বাচ্চার এত দামি রঙের কী দরকার?”
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ভারী গলায় বলেছিলাম,
“আমি চাই না দিয়া কোনোদিন রঙ না পাওয়ার সুতীব্র তৃষ্ণাটা জানুক। অপূর্ণতার স্বাদ বড় বিষাক্ত। ওটা একবার বুকে বিধলে সারা জীবন রক্তক্ষরণ হয়।”
কিন্তু জীবন বড় অদ্ভুত এক চিত্রকর। সে কখন কোন ক্যানভাসে কী রঙ ছিটায়, তা আগে থেকে বোঝা যায় না।
কয়েকদিন আগের ঘটনা। দিয়াদের স্কুলের বাৎসরিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ছিল। আমি অফিসের কাজ ফেলে গিয়েছিলাম ওর আঁকা দেখতে। প্রতিযোগিতা শেষে যখন বিজয়ী শিশুদের নাম ঘোষণা করা হলো, দিয়া হয়েছিল দ্বিতীয়। আর প্রথম হয়েছিল ওরই এক সহপাঠী—মেয়েটির বাবা শহরের এক অতি সাধারণ রিকশাচালক। পুরষ্কার নেওয়ার পর মেয়েটি আনন্দে ভাসতে ভাসতে দৌড়ে গিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। সেই রিকশাচালক বাবা তার ঘামে ভেজা, নোংরা গামছাটা দিয়ে পরম মমতায় মেয়ের চোখ মুছে দিচ্ছিল। তাদের চারপাশে যেন এক স্বর্গীয় আলোর বৃষ্টি হচ্ছিল।
আমি পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখছিলাম। কিন্তু হঠাৎ চোখ গেল দিয়ার দিকে। দিয়া তার রূপালী ট্রফিটা হাতে নিয়ে চরম বিরক্তি আর অবহেলায় একটা কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমি ওর কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বললাম,
“কী হয়েছে দিয়া? তুমি তো সেকেন্ড হয়েছ, এত সুন্দর একটা ট্রফি পেয়েছ! মুখ এমন অন্ধকার করে আছ কেন?”
দিয়া ট্রফিটা আমার দিকে এক প্রকার ছুঁড়ে দিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল,
“ফার্স্ট তো হতে পারলাম না! আর এই প্লাস্টিকের ট্রফিটা দেখতে একদম ভালো না, আব্বু। বাড়ি যাওয়ার পথে ওটা ডাস্টবিনে ফেলে দিও তো।”
ওর কথাটা আমার বুকে এসে একটা ধারালো চাবুকের মতো লাগল। একটি শিশু বিজয়ের আনন্দ বোঝে না, অর্জনের মূল্য বোঝে না, অন্যের আনন্দে তার কোনো সহানুভূতি নেই—শুধু প্রথম না হতে পারার এক অহংকারী অভিমান! আমি ওকে কোটি টাকার রঙ দিয়েছি, ক্যানভাস দিয়েছি, আরাম দিয়েছি—কিন্তু অনুভূতির যে নরম মাটি, অন্যের ঘাম আর ত্যাগের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ—সেটা কি আমি ওকে দিতে পেরেছি? আমি নিজের শৈশবের অপূর্ণতা ঢাকতে গিয়ে ওকে এক সংবেদনহীন, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ বানিয়ে ফেলছি না তো?
পরদিন সকালে আমি দিয়াকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হলাম গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাস, তারপর রিকশা, সবশেষে কাঁচা মাটির পথ।
গ্রামে আমাদের পুরোনো ভিটায় মা এখন একা থাকেন। ইট-সিমেন্টের চারদেয়ালের আবদ্ধতা মা সইতে পারেন না বলে শহরে আসেন না। সেখানে মাটির সুবাস আছে, পুরোনো স্মৃতির গন্ধ আছে। আমরা যখন পৌঁছালাম, তখন গ্রামের বুকে শিয়রের শীত নেমে এসেছে। চারপাশে কুয়াশার পাতলা চাদর, গাছে গাছে ঝিঁঝিঁ পোকার সুর। দিয়া খুব বিরক্ত হচ্ছিল—সেখানে ওয়াইফাই নেই, শীতের রাতে গিজারের গরম জল নেই, চারপাশ কেমন নীরব আর অস্পষ্ট।
সন্ধ্যা নামতেই মা উঠোনের এক কোণায় সেই চার দশক আগের মতো শুকনো পাতার স্তূপ বানিয়ে আগুন জ্বালালেন। দেশলাই ফুঁড়তেই আগুনের লালচে আলো অন্ধকারে নাচতে শুরু করল। বাতাসে সেই চিরচেনা শুকনো পাতার পোড়া গন্ধ—আমার নস্টালজিয়ার জানালাগুলো যেন এক নিমেষে খুলে গেল।
দিয়া তার ঠাকুর মার পাশে ইতস্তত বসে কি যেন আঁকছিলো। মা আমাদের জন্য মাটির ভাঁড়ে গরম চা আর মুড়ি ভেজে নিয়ে এলেন। তারপর মা এসে বসলেন একখানা পুরোনো মোড়ায়। আগুনের কাঁপতে থাকা আলো মায়ের মুখের অজস্র বলিরেখায় গিয়ে আছড়ে পড়ছিল যেন এক একটা বলিরেখা এক একটা বিষাদের নদী।
হঠাৎ মা আমার দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু, কাঁপা গলায় বললেন,
“মনু, তোর মনে আছে রে? তুই ছোটবেলায় একটা জলরঙের বাক্স চেয়েছিলি?”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এই এতগুলো বছর পর, অত দূরের একটা ছোট আবদার মায়ের বুকের কোন কোণে জমে ছিল! আমি চোখ নিচু করে বললাম,
“হ্যাঁ মা, মনে আছে। তুমি তো কিনে দাওনি। বলছিলে পরে দেবে।”
মা আগুনে কয়েকটা শুকনো সেগুন পাতা ছুঁড়ে দিলেন। পাতার চটচট শব্দে নীরবতা ভাঙল। মা দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত, বিষণ্ণ গলায় বললেন,
“তোর বাবা যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তখন তোর বয়স মাত্র সাত। আমি মানুষের বাড়ি বাড়ি সেলাইয়ের কাজ করে তোদের চারটে ডাল-ভাতের জোগান দিতাম। তুই যে মাসে রঙের বাক্সটা চাইলি, ঠিক সেই মাসেই আমার সেলাই মেশিনের সুঁচ আর ভেতরের মূল চাকাটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। হাতের জমানো সবকটা টাকা দিয়ে আমাকে মেশিনটা সারাত হয়েছিল রে মনু। কারণ ওই কালোরঙের লোহাটা না ঘুরলে, পরদিন তোদের পেটে একমুঠো ভাতও জুটত না।”
কথাগুলো বলতে বলতে মায়ের চোখ থেকে দুটো ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল আগুনের শিখার ওপর। টপ করে একটা শব্দ হলো।
মা আবার বললেন,
“সেই রাতে তুই না খেয়ে, অভিমান করে ঘুমিয়ে পড়েছিলি। আমি সারারাত তোর শিয়রে বসে কেঁদেছিলাম। আমি ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম—কেন আমি আমার ছেলেকে একটা রঙের বাক্স কিনে দিতে পারলাম না! এই শুকনো পাতার আগুন জ্বালিয়ে আমি তোর ফুটফুটে হাতদুটো সেঁকে দিতাম, কারণ তোকে একটা ভালো সোয়েটার কিনে দেওয়ার সাধ্যও আমার ছিল না।”
আমি আর মাটির দিকে তাকাতে পারলাম না। আমার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।
আমি পাশে তাকিয়ে দেখলাম, দিয়া অবাক হয়ে ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর সে আস্তে আস্তে ঠাকুমার হাতের দিকে হাত বাড়াল। মায়ের হাতদুটো শক্ত, কুঁচকে যাওয়া, আর আঙুলের ডগায় সেলাইয়ের সূঁচ ফোটার অজস্র কালচে দাগ।
দিয়া খুব সাবধানে, পরম মমতায় ঠাকুমার সেই খসখসে হাত দুটো নিজের ছোট দুটি হাতের মুঠোয় পুরে নিল। তারপর আগুনের দিকে এগিয়ে ধরে আগুনের তাপে সেঁকে দিতে লাগল।
দিয়া খুব নিচু গলায় বলল,
“ঠাকুমা, তোমার খুব কষ্ট হতো, তাই না? তোমার বুঝি খুব কান্না পেত?”
মা দিয়ার মাথায় হাত রেখে এক অদ্ভুত মায়াবী হেসে বললেন,
“সন্তানের মুখের মিষ্টি হাসিটুকু দেখতে পেলে মায়েদের কোনো কষ্ট আর কষ্ট থাকে না রে দাদু। সব দুঃখ জল হয়ে যায়।”
সে রাতে যখন আমরা শহরের দিকে ফিরে আসছিলাম, বাসের জানালার বাইরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের গ্রামগুলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছিল। বাসের আবছা আলোয় দেখলাম, দিয়া তার কোল থেকে ড্রয়িং খাতাটা বের করেছে। সে পেন্সিল দিয়ে খুব মন দিয়ে কিছু একটা আঁকছে।
আমি ওর পাশে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম,
“কী আঁকছ, দিয়া?”
দিয়া খাতাটা আমার দিকে ঘুরিয়ে ধরল। ক্যানভাসে কোনো দামি অ্যাক্রিলিক নেই, কোনো রাজকীয় রাজপ্রাসাদ নেই। সাধারণ পেন্সিলের শেডে আঁকা একটি ছোট্ট উঠোন, এক কোণে আগুনের লালচে আভা, আর তার পাশে বসে থাকা তিনজন মানুষ—যাদের হাতগুলো একে অপরকে পরম উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরে আছে।
দিয়া আমার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
“আব্বু, কাল স্কুলে গিয়ে আমি রিকশাচালক কাকুর মেয়েটিকে ট্রফিটার জন্য সত্যি সত্যি অভিনন্দন জানাব। আর এই ছবিটা আমি ঠাকুমাকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে উপহার দেব।
আমি জানালার কাঁচের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। দূর শহরের আলোগুলো কুয়াশার আড়ালে ঝাপসা দেখাচ্ছিল। আমার চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল।
আমি এতদিন ধরে আমার শৈশবের হারানো রঙগুলো দিয়ার ক্যানভাসে খুঁজছিলাম, কিন্তু আজ আমার মা, তাঁর শুকনো পাতার আগুনে পুড়িয়ে, আমার মেয়েকে জীবনের সত্যিকারের ভালোবাসার রঙটা চিনিয়ে দিয়ে গেলেন....
তখন আমার বয়স দশ কি এগারো। স্কুলের চারুকলার ক্লাসটা ছিল আমার কাছে রূপকথার কোনো দরজার মতো। আমাদের শিক্ষক বিজন বাবু যখন সাদা ক্যানভাসে তুলির একটা টানে নীল আকাশ বা লাল সূর্য ফুটিয়ে তুলতেন, আমার বুকের ভেতর কেমন যেন এক অবুঝ হাহাকার জেগে উঠত। ক্লাসের অন্য ছেলেরা যখন কাঠের জলরঙের বাক্স খুলে সারি সারি রঙিন টিউব সাজিয়ে বসত—লেমন ইয়েলো, ক্রিমসন রেড, কোবাল্ট ব্লু—আমি তখন তাদের দিকে এক অদ্ভুত তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকতাম। কাঠের বাক্সের ঢাকনা খুললে কাঠ আর কাঁচা রঙের মেশানো যে তীব্র, মাদকতাময় একটা গন্ধ বের হতো, তা আমার নিঃশ্বাসে বিঁধে যেত।
একদিন বিকেলবেলা, মা তখন বারান্দায় বসে সূচ-সুতো দিয়ে পুরোনো কাঁথায় পাড় বুনছিলেন। রোদের একটা তির্যক আলো এসে মায়ের ক্ষয়ে যাওয়া গালে পড়েছিল। আমি মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে খুব আস্তে করে বলেছিলাম,
“মা, আমাকে একটা বারো রঙের জলরঙের বাক্স কিনে দেবে? বিজন স্যার বলেছেন, রঙ না থাকলে আমি নাকি ভালো ছবি আঁকতে পারব না।”
মা হাতের সেলাইটা থামিয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখ দুটো থমকে গিয়েছিল। তারপর আমার চুলে হাত বুলিয়ে, রান্নার ধোঁয়া আর পুরোনো সূচের গন্ধমাখা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন,
“তোর তো ড্রয়িং খাতাটাই এখনো কেনা হয়নি রে মনু। খাতাটা আগে কিনি, তারপর রঙের বাক্স।”
সেই ‘তারপর’ আর কোনোদিন আসেনি। চারুকলার ক্লাসে অন্য ছেলেরা যখন ক্যানভাসে রঙের নদী ভাসাত, আমি তখন পেট ব্যথা বা মাথা ঘোরার বাহানা করে বারান্দায় এসে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতাম। দূর আকাশের মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, ঈশ্বর কি শুধুই ধনীদের ক্যানভাসে রঙ ছিটান?
আমাদের ক্যানভাস কেন চিরকাল শুধু পেন্সিলের কালো দাগে ঢাকা পড়ে থাকে? মনের ভেতরে এক গভীর অভিমান, এক নিরবচ্ছিন্ন ক্ষোভ জমে জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল। আমি ধরে নিয়েছিলাম, আমার মা আমাকে ভালোবাসেন, কিন্তু আমার এই ছোট্ট স্বপ্নটাকে ছোঁয়ার ইচ্ছাটা তাঁর নেই।
সময় কেটেছে নদীর স্রোতের মতো। নদীর তলার পাথর যেমন ঘষে ঘষে মসৃণ হয়ে যায়, আমার অভাবের ক্ষতগুলোও তেমনি সময়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আজ আমার বয়স পঁয়ত্রিশ। চট্টগ্রাম শহরের এক কোণে আমার গুছানো সংসার। ইট-কাঠের বহুতল ভবনের সাততলায় আমার ফ্ল্যাট, বারান্দায় সারি সারি টবে লাল-নীল পাতাবাহারের মেলা। ডেভলপমেন্ট ফার্মের লাল ফিতার ব্যস্ততা, মাস শেষে পকেটের মসৃণ ভার—সবই আছে। আর আছে আমার দশ বছরের মেয়ে, দিয়া।
দিয়া ছবি আঁকতে ভালোবাসে। ওর ঘরের এক কোণায় দামি কাঠের ইজেল, সারি সারি ইতালিয়ান ক্যানভাস, টিউব ভর্তি অ্যাক্রিলিক, অয়েল পেস্টেল আর জলরঙের রাজত্ব। ও যখনই কোনো রঙের নাম মুখে আনে, আমি পরদিনই শহরের সবচেয়ে নামি দোকান থেকে তা এনে ওর টেবিলে সাজিয়ে দিই।
আমার স্ত্রী একদিন আমায় মৃদু হেসে বলেছিল,
“তুমি ওকে একটু বেশিই দিচ্ছ। একটা দশ বছরের বাচ্চার এত দামি রঙের কী দরকার?”
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ভারী গলায় বলেছিলাম,
“আমি চাই না দিয়া কোনোদিন রঙ না পাওয়ার সুতীব্র তৃষ্ণাটা জানুক। অপূর্ণতার স্বাদ বড় বিষাক্ত। ওটা একবার বুকে বিধলে সারা জীবন রক্তক্ষরণ হয়।”
কিন্তু জীবন বড় অদ্ভুত এক চিত্রকর। সে কখন কোন ক্যানভাসে কী রঙ ছিটায়, তা আগে থেকে বোঝা যায় না।
কয়েকদিন আগের ঘটনা। দিয়াদের স্কুলের বাৎসরিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ছিল। আমি অফিসের কাজ ফেলে গিয়েছিলাম ওর আঁকা দেখতে। প্রতিযোগিতা শেষে যখন বিজয়ী শিশুদের নাম ঘোষণা করা হলো, দিয়া হয়েছিল দ্বিতীয়। আর প্রথম হয়েছিল ওরই এক সহপাঠী—মেয়েটির বাবা শহরের এক অতি সাধারণ রিকশাচালক। পুরষ্কার নেওয়ার পর মেয়েটি আনন্দে ভাসতে ভাসতে দৌড়ে গিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। সেই রিকশাচালক বাবা তার ঘামে ভেজা, নোংরা গামছাটা দিয়ে পরম মমতায় মেয়ের চোখ মুছে দিচ্ছিল। তাদের চারপাশে যেন এক স্বর্গীয় আলোর বৃষ্টি হচ্ছিল।
আমি পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখছিলাম। কিন্তু হঠাৎ চোখ গেল দিয়ার দিকে। দিয়া তার রূপালী ট্রফিটা হাতে নিয়ে চরম বিরক্তি আর অবহেলায় একটা কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমি ওর কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বললাম,
“কী হয়েছে দিয়া? তুমি তো সেকেন্ড হয়েছ, এত সুন্দর একটা ট্রফি পেয়েছ! মুখ এমন অন্ধকার করে আছ কেন?”
দিয়া ট্রফিটা আমার দিকে এক প্রকার ছুঁড়ে দিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল,
“ফার্স্ট তো হতে পারলাম না! আর এই প্লাস্টিকের ট্রফিটা দেখতে একদম ভালো না, আব্বু। বাড়ি যাওয়ার পথে ওটা ডাস্টবিনে ফেলে দিও তো।”
ওর কথাটা আমার বুকে এসে একটা ধারালো চাবুকের মতো লাগল। একটি শিশু বিজয়ের আনন্দ বোঝে না, অর্জনের মূল্য বোঝে না, অন্যের আনন্দে তার কোনো সহানুভূতি নেই—শুধু প্রথম না হতে পারার এক অহংকারী অভিমান! আমি ওকে কোটি টাকার রঙ দিয়েছি, ক্যানভাস দিয়েছি, আরাম দিয়েছি—কিন্তু অনুভূতির যে নরম মাটি, অন্যের ঘাম আর ত্যাগের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ—সেটা কি আমি ওকে দিতে পেরেছি? আমি নিজের শৈশবের অপূর্ণতা ঢাকতে গিয়ে ওকে এক সংবেদনহীন, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ বানিয়ে ফেলছি না তো?
পরদিন সকালে আমি দিয়াকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হলাম গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাস, তারপর রিকশা, সবশেষে কাঁচা মাটির পথ।
গ্রামে আমাদের পুরোনো ভিটায় মা এখন একা থাকেন। ইট-সিমেন্টের চারদেয়ালের আবদ্ধতা মা সইতে পারেন না বলে শহরে আসেন না। সেখানে মাটির সুবাস আছে, পুরোনো স্মৃতির গন্ধ আছে। আমরা যখন পৌঁছালাম, তখন গ্রামের বুকে শিয়রের শীত নেমে এসেছে। চারপাশে কুয়াশার পাতলা চাদর, গাছে গাছে ঝিঁঝিঁ পোকার সুর। দিয়া খুব বিরক্ত হচ্ছিল—সেখানে ওয়াইফাই নেই, শীতের রাতে গিজারের গরম জল নেই, চারপাশ কেমন নীরব আর অস্পষ্ট।
সন্ধ্যা নামতেই মা উঠোনের এক কোণায় সেই চার দশক আগের মতো শুকনো পাতার স্তূপ বানিয়ে আগুন জ্বালালেন। দেশলাই ফুঁড়তেই আগুনের লালচে আলো অন্ধকারে নাচতে শুরু করল। বাতাসে সেই চিরচেনা শুকনো পাতার পোড়া গন্ধ—আমার নস্টালজিয়ার জানালাগুলো যেন এক নিমেষে খুলে গেল।
দিয়া তার ঠাকুর মার পাশে ইতস্তত বসে কি যেন আঁকছিলো। মা আমাদের জন্য মাটির ভাঁড়ে গরম চা আর মুড়ি ভেজে নিয়ে এলেন। তারপর মা এসে বসলেন একখানা পুরোনো মোড়ায়। আগুনের কাঁপতে থাকা আলো মায়ের মুখের অজস্র বলিরেখায় গিয়ে আছড়ে পড়ছিল যেন এক একটা বলিরেখা এক একটা বিষাদের নদী।
হঠাৎ মা আমার দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু, কাঁপা গলায় বললেন,
“মনু, তোর মনে আছে রে? তুই ছোটবেলায় একটা জলরঙের বাক্স চেয়েছিলি?”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এই এতগুলো বছর পর, অত দূরের একটা ছোট আবদার মায়ের বুকের কোন কোণে জমে ছিল! আমি চোখ নিচু করে বললাম,
“হ্যাঁ মা, মনে আছে। তুমি তো কিনে দাওনি। বলছিলে পরে দেবে।”
মা আগুনে কয়েকটা শুকনো সেগুন পাতা ছুঁড়ে দিলেন। পাতার চটচট শব্দে নীরবতা ভাঙল। মা দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত, বিষণ্ণ গলায় বললেন,
“তোর বাবা যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তখন তোর বয়স মাত্র সাত। আমি মানুষের বাড়ি বাড়ি সেলাইয়ের কাজ করে তোদের চারটে ডাল-ভাতের জোগান দিতাম। তুই যে মাসে রঙের বাক্সটা চাইলি, ঠিক সেই মাসেই আমার সেলাই মেশিনের সুঁচ আর ভেতরের মূল চাকাটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। হাতের জমানো সবকটা টাকা দিয়ে আমাকে মেশিনটা সারাত হয়েছিল রে মনু। কারণ ওই কালোরঙের লোহাটা না ঘুরলে, পরদিন তোদের পেটে একমুঠো ভাতও জুটত না।”
কথাগুলো বলতে বলতে মায়ের চোখ থেকে দুটো ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল আগুনের শিখার ওপর। টপ করে একটা শব্দ হলো।
মা আবার বললেন,
“সেই রাতে তুই না খেয়ে, অভিমান করে ঘুমিয়ে পড়েছিলি। আমি সারারাত তোর শিয়রে বসে কেঁদেছিলাম। আমি ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম—কেন আমি আমার ছেলেকে একটা রঙের বাক্স কিনে দিতে পারলাম না! এই শুকনো পাতার আগুন জ্বালিয়ে আমি তোর ফুটফুটে হাতদুটো সেঁকে দিতাম, কারণ তোকে একটা ভালো সোয়েটার কিনে দেওয়ার সাধ্যও আমার ছিল না।”
আমি আর মাটির দিকে তাকাতে পারলাম না। আমার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।
আমি পাশে তাকিয়ে দেখলাম, দিয়া অবাক হয়ে ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর সে আস্তে আস্তে ঠাকুমার হাতের দিকে হাত বাড়াল। মায়ের হাতদুটো শক্ত, কুঁচকে যাওয়া, আর আঙুলের ডগায় সেলাইয়ের সূঁচ ফোটার অজস্র কালচে দাগ।
দিয়া খুব সাবধানে, পরম মমতায় ঠাকুমার সেই খসখসে হাত দুটো নিজের ছোট দুটি হাতের মুঠোয় পুরে নিল। তারপর আগুনের দিকে এগিয়ে ধরে আগুনের তাপে সেঁকে দিতে লাগল।
দিয়া খুব নিচু গলায় বলল,
“ঠাকুমা, তোমার খুব কষ্ট হতো, তাই না? তোমার বুঝি খুব কান্না পেত?”
মা দিয়ার মাথায় হাত রেখে এক অদ্ভুত মায়াবী হেসে বললেন,
“সন্তানের মুখের মিষ্টি হাসিটুকু দেখতে পেলে মায়েদের কোনো কষ্ট আর কষ্ট থাকে না রে দাদু। সব দুঃখ জল হয়ে যায়।”
সে রাতে যখন আমরা শহরের দিকে ফিরে আসছিলাম, বাসের জানালার বাইরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের গ্রামগুলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছিল। বাসের আবছা আলোয় দেখলাম, দিয়া তার কোল থেকে ড্রয়িং খাতাটা বের করেছে। সে পেন্সিল দিয়ে খুব মন দিয়ে কিছু একটা আঁকছে।
আমি ওর পাশে গিয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম,
“কী আঁকছ, দিয়া?”
দিয়া খাতাটা আমার দিকে ঘুরিয়ে ধরল। ক্যানভাসে কোনো দামি অ্যাক্রিলিক নেই, কোনো রাজকীয় রাজপ্রাসাদ নেই। সাধারণ পেন্সিলের শেডে আঁকা একটি ছোট্ট উঠোন, এক কোণে আগুনের লালচে আভা, আর তার পাশে বসে থাকা তিনজন মানুষ—যাদের হাতগুলো একে অপরকে পরম উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরে আছে।
দিয়া আমার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
“আব্বু, কাল স্কুলে গিয়ে আমি রিকশাচালক কাকুর মেয়েটিকে ট্রফিটার জন্য সত্যি সত্যি অভিনন্দন জানাব। আর এই ছবিটা আমি ঠাকুমাকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে উপহার দেব।
আমি জানালার কাঁচের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। দূর শহরের আলোগুলো কুয়াশার আড়ালে ঝাপসা দেখাচ্ছিল। আমার চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল।
আমি এতদিন ধরে আমার শৈশবের হারানো রঙগুলো দিয়ার ক্যানভাসে খুঁজছিলাম, কিন্তু আজ আমার মা, তাঁর শুকনো পাতার আগুনে পুড়িয়ে, আমার মেয়েকে জীবনের সত্যিকারের ভালোবাসার রঙটা চিনিয়ে দিয়ে গেলেন....

0 মন্তব্যসমূহ