কয়েকটি কবিতা | হাসান আফীফ


 

পাখি
আমার ঘর-রাঙানো বই থাকলেও – আমি খুব করে চাইতাম ঘর জুড়ে থাকবে ছোটবোনের প্যাপারক্রাফট, অরিগ্যামি। অভিমানের দেয়াল ভেঙে পাখি-  চিত্রায়ণ করতে বলবে "দুধমাখা ভাত কাকে খায়"

শৈশবে বানিজ্যমেলা থেকে মা ক্রিকেটব্যাট কিনে দিলেও : আমি তাকিয়ে থাকতাম খেলনা বাসনগুলোর দিকে —
 
একবার ইস্কুলে অঙ্কদৌড়ে প্রথম হয়েছিলাম— কামিয়েছিলাম একসেট রঙ-পেন্সিল আর কিছু সাংঘাতিক হাসি; অনাগত বোনটির জন্য তুলে রেখেছিলাম সেই থেকে কিছু গাঢ়-স্মৃতি।

শৈশব হতে আজ অবধি ক্যালেন্ডারের পাতা কতোগুলো গেছে? কে জানে, তবু :
হৃদয়ের মানচিত্রে বসে একটা মেয়ে আজীবন বানিয়ে যাচ্ছে অজস্র কাগুজে প্রজাপতি...


আমি ও আমার দাবাড়ু বন্ধু

রোমন্থন করা কবিদের স্বভাব নয় -
মিথ্যা বলাও অমরত্বের কাছে দুর্বোধ্য, বিভ্রান্তিকর 

আমি কিযে উচ্ছন্নে যাচ্ছি ইদানীংকালে; তা কে জানে?
কেই বা জানে আমার এবঙ আমার বন্ধুর কথা?
আমরা যারা টিউশনির অভাবে ভাতের হোটেলে বাসিভাত বিক্রি করি —
পৌরাণিক ঔষধে মেশাই ক্ষুধার পরম জ্বালা!

আমার বন্ধু দারুণ দাবাড়ু। 
গত একমাস: রাজধানীতে যেতে পারছে না — তার বয়বৃদ্ধ হুইলচেয়ারের চাকার গেছে হাওয়া -
ট্রফি বিক্রির মোহর ইতিমধ্যেই শেষ, ম্যাডেলগুলোয় ধরেছে জঙ
দু'এক ম্যাচ খেললে হয়তো পরবর্তী চ্যাকাপ করানো যেতো —

আমি আর আমার বন্ধু নিজেদের ভালো রাখতে জানি ;
উচ্ছন্নের গভীর গতিবিধি শিখিয়েছে ভাড়াবাড়ির মতোন ভালো থাকতে — জেনেছি বেদুঈনের মতোন পেটে আর্টিফিশিয়াল পাথর বাঁধতে  — কালচক্রের বিপরীতে আমরা হয়েছি বইবেশ্যা

রোমন্থন করা কবিদের স্বভাব নয়;
মিথ্যা বলাও অমরত্বের কাছে দুর্বোধ্য, তবু —

সাগরের কাছে গিয়ে দেখেছি তার, পাড়ে আসবার বেদনা।
নদীর কম্পমান স্রোতে দেখেছি, উপকূলে ভাঙবার তাড়না —
আর,
অর্ধঘুণে খাওয়া টেবিলে বসে দেখেছি, 
পেটের ক্ষুধার কাছে শব্দক্ষুধার কি নিদারুণ প্রেরণা!
আমি তবু - বিম্বল, বিদর্ঘ রাত আর জন্ডিসে আক্রান্ত 
আমার হলুদ চোখকে ফাঁকি দিয়ে সাব-এডিটর হতে চাই —
আমি চাই - পরবর্তী বরষায় 
আমি আর আমার বন্ধু মৈমনসিং যাবো, 
মরে যাবার আগে গমবৃক্ষে সাঁতরাবো আর - চায়ের পিরিচে ভেজাবো পুরানঢাকার বিস্কুট। 
ঠোঁটে দিয়ে সিগারেট - দর্শন করবো আটখানা গোলাপ বাগান।
হে ঈশ্বর! 
চেয়ে দেখো এদিকে, অবেলায় কিছু বনরুটি আর শরাব কিনেছি
আমাকে অবসাদ দাও!
যেন সাইকেলে করে ফিরতে পারি -
অনাগত অ্যাম্বুল্যান্সের আগেই —
যে পুলিশের মতোন তাড়া করছে আমার সেই ক্ষুধার্ত দাবাড়ু বন্ধুটিকে...


লাল সোয়েটার

ছেলেবেলায় শীতের দিন আসলেই একটি আবদার জুড়ে দিতাম — 
মায়ের চোখে মুখে,লাল সোয়েটার লাল সোয়েটার বলে 
আব্বার চোখেমুখে জুড়ে দিতাম হতাশা।

এই হতাশারে ভাবতাম সম্ভাবনা'-
সম্ভাবনার যে দ্বার খুলবার কথা আগামীবছর, 
তার দরোজায় আজো বসে আছেন আব্বা- 
যার ঘোলাটে চোখে এখনো থকথক করছে 
হেমন্তের মতোন আচমকা বৃষ্টির জল।

ওসব ঘোলাটে হেমন্তের জল পারিয়ে 
আর কত দূর যাবে মক্তবের দুখু?
আমারও শখ ছিল লাল সোয়েটারের-
প্রতিবার যয়-কদম পা আগাই 
আম্মার একটা করে জুয়েলারি হারায় যায় 
ঘরের জানালা দিয়ে ভেসে উঠে বুনোফুল।

কিভাবে আম্মারে বলি- মক্তবে আমার রেহাল নাই?


বুকক্যাফের লিরিক

আজ বিকেলে বুকের ভেতর নিম্নচাপ;
রোমাঞ্চকর গান,শুভ্র গোলাপ
ভালো লাগা ভীষণ পাপ —
আর কিছুনীল—তারপর ওই নীল ভীষণ 
বইপাড়াতে আসতে পারি; ডিপ্রেশনের প্রাণ ফিরুক
তোমার হাতে বই ছুঁবো—গান শুনাবো অই পিছু
বুকক্যাফে-তে বই ভিজুক; সময় কাঁটুক আরকিছু

হঠাৎ যদি জানলা খুলো
ফিরবে কি ফের মৃদুস্বর?
কেই বা আছে মনখারাপে
হাত বাড়াতে দূর ভীষণ?

ক্যাসেটে শুনি বিষন্ন মন; আরও কিছু কোমলপ্রাণ 
মেঘ থেমেছে পৃষ্ঠা জুড়ে; কোথা নেই আর পায়ের-ছাপ 
কাসুন্দিতে একলা হাঁটি - বন্দি হাতে কফির কাপ
রাত ফুরালো, বৃষ্টি এলো — কান্না ওসব ঠিক রবিবার
আজ বিকেলে বুকের ভেতর চিনচিনে সব নিম্নচাপ;
মন ভেঙেছে, কার কি তাতে?
যা কিছু যাক, আমারই যাক... 


মায়ের বালা

একটা হলুদ দুপুর হেঁটে যায় পাশ দিয়ে। আমার দিন-দুপুর ; সকাল-সন্ধ্যা চোখ চেনে না। বৃদ্ধ থেকে বৃদ্ধ হচ্ছে মায়ের বালা—তবু, মনের মিনারে মায়ের গড়া সংসার; ভাঙাস্লেট—পিতলের প্লেট—এনালগ টেলিভিশন... 
একটা কালো রাত ঘুমিয়ে আছে সারাটা বিছানায়। 
জোৎস্নার অবয়ব গায়ে মেখে গান গাচ্ছি। গান গাইতে গাইতে—গাইতে গাইতে, ওমন বহুরাত গিলে ফেলেছি। অপেক্ষার দিকে তাকিয়ে থাকি ; তবু, দরোজার অপাশ থেকে কেউ বলেনি "ভাত খেতে আয়, শরীর খারাপ করবে"।

এভাবে অনেকগুলো দিন যায় ; বছর কাঁটে
মায়ের সংসার যায় ; ভাঙাস্লেট, মায়ের যত্নের হাতের বালা, কাশার তৈরি পিতলের প্লেট — সব যায়
থেকে যায় ; 
সারাটা বিছানা জুড়ে হাহুতাশ _ আমার এপাশ-ওপাশ ব্যস্ত গড়াগড়ি 
দীর্ঘশ্বাস জমে হয়েছে হিমালয় — হিমালয় চূড়ায় দাঁড়িয়ে খুঁজি 

আমাদের যা যা গেছে 
 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ