কর্পোরেট দাস | মিনহাজ রাফি


এক. 

​অ্যালার্মের আওয়াজটা ঠিক ভোঁতা একটা ছুরির মতো। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ছয়টায় এটা মগজের সবচেয়ে নরম অংশটায় এসে আঘাত করে।

​শুভ্র চোখ মেলল। চোখের কোণটা কিঞ্চিৎ চিটচিট করছে। সিলিং ফ্যানের তিনটে পাখা অলস ভঙ্গিতে ঘুরছে, অথচ বাতাসে কোনো শীতলতা নেই। ঘরের কোণে জমে থাকা কালচে অন্ধকারটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে। শুভ্রর ইচ্ছে করল আরও কিছুক্ষণ, মাত্র আধঘণ্টা চোখ বুজে পড়ে থাকতে। কিন্তু ব্রেইনের ভেতর বসা এক অদৃশ্য হিসাবরক্ষক তখনই চিৎকার করে উঠল—‘দেরি হলে ৮টা ২০-এর লোকাল বাসটা মিস হবে। আর বাস মিস মানেই বসের লাল দাগ!’

পড়ালেখা শেষ করে যখন সে চট্টগ্রাম শহরে পা রেখেছিল, তখন সকালের সংজ্ঞাটা এমন কেরানি-মার্কা ছিল না। তখন সকাল মানে ছিল চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কড়া লিকারের চা, সস্তায় কেনা ‘সানডাউন’ সিগারেট আর টেবিলজুড়ে এলোমেলো ছড়ানো আল মাহমুদ, শক্তি কিংবা জীবনানন্দের কবিতার বই। ডান হাতের আঙুলগুলো এখনো ঘুমের ঘোরে চেনা কর্ডের খোঁজে অবচেতনভাবেই নিশপিশ করে ওঠে। কিন্তু বাস্তবের গিটারটা এখন আলমারির ওপর ধুলোবালির এক পুরু আস্তরণ মেখে বোবা হয়ে পড়ে আছে।

​বিছানা ছেড়ে মেঝেতে পা রাখতেই কোমরের ডান দিকটায় একটা পরিচিত, তীব্র চিলিক দিয়ে ওঠা ব্যথা জানান দিল—বয়স তিরিশ পার হয়েছে হে যুবক, এবং তুমি এখন আর কোনো স্বাধীন কবি নও, তুমি একজন পুরোদস্তুর কর্পোরেট দাস।

​"আজকেও কি নাস্তা না খেয়েই দৌড় দেবে? শরীরটা তো শেষ করতে বসছ!" রান্নাঘর থেকে মীনাক্ষীর ক্লান্ত, একঘেয়েমিতে ভরা গলা ভেসে এল। প্রাত্যহিক এই অনুযোগ এখন শুভ্রর কান ছুঁয়েও যেন ছোঁয়াই না।

​"একটু লেট হয়ে গেছে মীনু। অফিসে গিয়ে ক্যান্টিন থেকে কিছু মুখে গুঁজে নেব," কোনোমতে শার্টের বোতাম আটকাতে আটকাতে ওয়াশরুমে ঢুকল শুভ্র।

​বেসিনের আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকাল সে। চোখের নিচে গভীর কালচে ছোপ। গাল দুটো পুষ্টিহীনতায় সামান্য বসে গেছে। শুভ্রর নিজেরই বিশ্বাস হতে চায় না—এই ফ্যাকাশে মুখটা কি আসলেই সেই তরুণের, যে একসময় চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে আড্ডার মধ্যমণি হয়ে গলা ছেড়ে গান গাইত? কিংবা ডিসি হিলের সিঁড়িতে বসে লিটল ম্যাগাজিনের ভবিষ্যৎ আর লিখনশৈলী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক জুড়ত বন্ধুদের সাথে? 


দুই.

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল আটটা। বহদ্দারহাট মোড়টা প্রতিদিন এই সময়টায় কোনো চেনা শহর থাকে না, রূপ নেয় এক নির্মম যুদ্ধক্ষেত্রে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনো এক অদৃশ্য খাঁচার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে আর সেখান থেকে হন্যে হয়ে বেরিয়ে এসেছে একদল ক্ষুধার্ত, তাড়িত কয়েদি। তাদের লক্ষ্য কোনো খাদ্য নয়, লক্ষ্য কেবল একটা বাসের পাদানিতে একটুখানি পায়ের জায়গা খুঁজে নেওয়া। জীবনের তাগিদে, জীবিকার লোভে মানুষ এখানে মানুষ থাকে না; হয়ে ওঠে একেকটা মরিয়া প্রতিযোগী।

​শুভ্রও প্রতিদিন এই চেনা নরকের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ৩ নম্বর রুটের একটা লক্কড়-ঝক্কড় মিনিবাস এসে ব্রেক কষতেই চারপাশ থেকে পিলপিল করে একঝাঁক মানুষ সেটার দিকে ধেয়ে গেল। চারদিকে কনুইয়ের গুঁতো, জামা টেনে ধরার আকুতি আর চড়া গলার চিৎকার। শুভ্র তার সমস্ত নাগরিক ভদ্রতা ঝেড়ে ফেলে, কেবল গায়ের জোরে আর একটা মরিয়া টানে বাসের পেছনের লোহার হাতলটা চেপে ধরল। কোনোমতে ভেতরে ঢুকতেই বাসের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। চারদিকে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত, বিষণ্ণ মানুষের শরীরের ভ্যাপসা গন্ধ, বাসের তপ্ত ইঞ্জিনের তাপ আর দরদর করে ঝরতে থাকা ঘামের গন্ধ মিলেমিশে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করেছে।

​বগলের নিচে জরুরি ফাইলটা কোনোমতে চেপে ধরে শুভ্র এক হাতে ওপরের লোহার রডটা আঁকড়ে ধরে ঝুলে রইল। বাসটা যখন গিয়ার বদলে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে, কড়কড়-ঘড়ঘড় শব্দে চলতে শুরু করল, শুভ্রর হঠাৎ মনে হলো সে কোনো গণপরিবহনে নেই। সে আসলে একটা চলমান যান্ত্রিক ইঁদুরের খাঁচায় বন্দি, যা তাকে প্রতিদিন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এক নির্দিষ্ট গন্তব্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই পাশের এক বয়স্ক ভদ্রলোক বাসের ঝাঁকুনিতে ভারসাম্য সামলাতে না পেরে অনবরত কনুই দিয়ে শুভ্রর পাঁজরে গুঁতো দিতে লাগলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, শুভ্রর কোনো রাগ হলো না, কোনো বিরক্তিও জাগল না। তার ভেতরের সমস্ত অনুভূতিকে যেন এক তীব্র, শীতল উদাসীনতা গ্রাস করে নিয়েছে। সে বাঁ হাত দিয়ে পকেটে হাত দিল। আঙুলে ঠেকল একটা গোল্ডলিফ আর একটা সস্তা প্লাস্টিকের লাইটার। এক মুহূর্তের জন্য শুভ্রর মনটা হু হু করে উঠল। সে ভাবল, ইস! এই বাস থেকে যদি এখনই নেমে যাওয়া যেত! শান্ত পায়ে হেঁটে জিইসি মোড়ের কোনো একটা পরিচিত টং দোকানে গিয়ে যদি দাঁড়ানো যেত। চাঅলা মামাকে ডেকে বলা যেত, "মামা, কড়া করে এক কাপ লিকার দাও তো, চিনি কম।" তারপর আয়েশ করে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা আকাশের মেঘে উড়িয়ে দেওয়া যেত। বাতাসে ভাসতে ভাসতে সেই নীলচে ধোঁয়া হয়তো তার হারিয়ে যাওয়া সমস্ত অলীক স্বপ্নের মতো শূন্যে মিলিয়ে যেত।

​কিন্তু স্বপ্ন দেখার ফুরসত নেই। বাস এসে থামল আগ্রাবাদে—শুভ্রর গন্তব্য।

​ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শুভ্রর বুকটা কেঁপে উঠল। অফিসে ঢুকতেই যেন নিয়তির মতো সামনে এসে দাঁড়ালেন সেকশন ইনচার্জ মকবুল সাহেব। ভদ্রলোকের মাথার চুল প্রায় সব পড়ে গেছে, যা-ও দু-চারটে অবশিষ্ট আছে, তা যেন সারাক্ষণ ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে। থমথমে গলায়, চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে তিনি বললেন, "লেট মি রিমাইন্ড ইউ শুভ্র সাহেব, এই মাসে এটা নিয়ে আপনার থার্ড লেট কাউন্ট।"

​শুভ্র মাথা নিচু করে, আমতা আমতা করে বলল, "স্যার, ওল্ড চিল্ড্রেন পার্কের সামনে আজকে তীব্র জ্যাম ছিল..."

​"জ্যাম চাটগাঁ শহরে নতুন কিছু না শুভ্র সাহেব! অজুহাত দেবেন না," মকবুল সাহেবের গলা আরও চড়ে গেল, "আপনার পাংচুয়ালিটির যদি এই দশা হয়, তবে বছরের শেষে ইনক্রিমেন্টের আশাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। যান, ডেস্কে যান। অডিট ফাইলগুলো লাঞ্চের আগেই আমার টেবিলে রেডি চাই।"

​শুভ্র আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের নিস্প্রাণ কিউবিকলে গিয়ে বসল। কম্পিউটারের স্ক্রিনটা এক তীব্র নীল আলো নিয়ে জ্বলে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল একের পর এক এক্সেল শিট, জটিল ডেটা আর ফাইলের অন্তহীন স্তূপ। মাউসের একটানা ‘ক্লিক ক্লিক’ শব্দে তার লালিত কবিতাগুলো, আর গিটারের চেনা সুরগুলো এক একটা করে ডুকরে কেঁদে মরে যেতে লাগল।


তিন.

ঘড়ির কাঁটায় যখন পাঁচটা ছুঁইছুঁই, তখন আগ্রাবাদের বহুতল ভবনগুলোর কাচ বেয়ে এক ফালি ম্লান আলো এসে পড়ে ডেস্কে। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে আগে অফিস থেকে ছুটি মেলে বটে, কিন্তু শুভ্র ভালো করেই জানে—এই ছুটি স্রেফ চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে সাময়িক রেহাই, জীবন থেকে কোনো মুক্তি নয়।

​বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে যখন সে আকাশের দিকে তাকায়, বহুতল ভবনের কংক্রিটের ফাঁক গলে তখন এক চিলতে রক্তিম সূর্য মরণকামড় দিয়ে ডুবে যাচ্ছে। ঠিক এই গোধূলিলগ্নে শুভ্রর মনটা এক ঝটকায় ছুটে চলে যায় জামালখানের চেনা আড্ডাটার দিকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিকান্দার ভাইয়ের সেই টিনের চালের চায়ের দোকান। এতক্ষণে নিশ্চয়ই রনি, ফয়সাল, ইশতিয়াকরা এসে জুটেছে। কাচের কাপে চামচের টুংটাং শব্দে মুখরিত চারপাশ। রাজনীতির মোড় কোন দিকে ঘুরছে, বৈশ্বিক মন্দা দেশের অর্থনীতিকে কোথায় গিয়ে ঠেকাবে—এই নিয়ে হয়তো চড়া গলায় তুমুল তর্ক জমে উঠেছে। আড্ডার মাঝখানেই কেউ একজন হয়তো হঠাৎ চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে উদাত্ত গলায় আবৃত্তি শুরু করে দিয়েছে আল মাহমুদের সেই চেনা লাইন—‘আমার মায়ের কপালে ছিল না কোনো রাজমুকুট...’

​শুভ্রর বুকটা এক তীব্র হাহাকারে হু হু করে উঠল। তার প্রবল ইচ্ছে করল সমস্ত নিয়মকানুন, এই শার্ট-প্যান্ট আর কর্পোরেট ভদ্রতার খোলস ভেঙে এখনই একটা হুডখোলা রিকশা নিয়ে জামালখান চলে যেতে। কিংবা ষোলশহর স্টেশনে গিয়ে ট্রেনের লাইনের ধারে পাথরের ওপর পা ঝুলিয়ে বসতে। শাটল ট্রেনের কু-ঝিকঝিক শব্দ আর অন্ধকারের বুকে সিগারেটের লালচে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ায় চারপাশটা ঝাপসা করে দিতে। তখন তার বুকেও থাকবে এক অদ্ভুত, আদিম স্পর্ধা; ঠোঁটের কোণে লেগে থাকবে মিছিলের সেই পুরনো স্লোগান—‘লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই!’

​কিন্তু পকেটের ভেতর ফোনটা তীব্র কম্পনে কেঁপে উঠতেই কল্পনার রঙিন বুদবুদ এক নিমেষে ফেটে গেল। স্ক্রিনের আলোয় ‘মা’ নামটা ভেসে উঠছে। শুভ্র বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কলটা রিসিভ করল।

​"হ্যালো মা, বলো।"

​"বাবা শুভ্র, ভালো আছিস? শরীরটা ঠিক আছে তো তোর?" ওপাশ থেকে মায়ের জড়ানো, বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে আসা গলার আওয়াজ। মা গ্রামের বাড়িতে একা থাকেন। ছোট ভাইটা পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় একটা ছোটখাটো চাকরিতে ঢুকেছে, যা পায় তা দিয়ে তার নিজেরই চলে না।

​"হ্যাঁ মা, আমি ভালো আছি। তুমি সময়মতো ওষুধ খেয়েছ তো?" শুভ্র নিজের গলার ক্লান্তি আড়াল করার চেষ্টা করে।

​"খেয়েছি রে বাবা। কিন্তু... ঘরের পেছনের চালটা দিয়ে জল পড়ছে। এবার তো বর্ষাটা একটু আগেই এসে গেল। আর তোর ছোট ভাইটাও কাল ফোন করে কাঁদছিল, ওর নাকি সামনের মাসে মেসের ভাড়া আটকে গেছে। তুই কি এই মাসে কিছু টাকা বাড়তি পাঠাতে পারবি বাবা?"

​মায়ের গলার এই মৃদু, কুণ্ঠিত হাহাকার শুভ্রকে কল্পনার আকাশ থেকে টেনে হিঁচড়ে বাস্তবের মাটির আরও গভীরে ডাবিয়ে দিল। এই হাহাকারের কোনো পাল্টা যুক্তি হয় না, কোনো কবিতা দিয়ে এই ভাঙা চাল মেরামত করা যায় না। 

​"আমি কাল-পরশুই বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেব মা। তুমি একদম চিন্তা কোরো না, নিজের খেয়াল রেখো," শুভ্র সান্ত্বনা দেয়। নিজের ভেতরের মহাশূন্যতাটা চেপে রেখে সে গলায় এক চিলতে মিথ্যে আশ্বাস ফুটিয়ে তোলে।

​ফোনটা কেটে পকেটে চালান করে সে আবারও বহদ্দারহাটগামী বাসের দীর্ঘ লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়। এবার ঘরে ফেরার পালা। সারাদিনের খাটুনি আর মনের ওপর চেপে বসা এই অদৃশ্য পাথরের ভারে শরীরটা এত নিস্তেজ লাগছে যে, বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝোলার মতো ন্যূনতম শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। শরীর ও মন—উভয়কেই যেন আঠার মতো জড়িয়ে ধরেছে এক চিরন্তন, মরণপন ক্লান্তি।


চার.

বহদ্দারহাটের জ্যাম আর বাসের ধস্তাধস্তি পেরিয়ে শুভ্র যখন বাসার দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে সাতটা। কলিংবেলের আওয়াজে দরজাটা খুলল মীনাক্ষী। তার চেহারায়ও এক ফ্যাকাশে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। একটা বেসরকারি প্রাইমারি স্কুলে সারাদিন বাচ্চাদের চিৎকার-চেঁচামেচি সামলানো, তারপর দুটো টিউশনি শেষ করে সে-ও মাত্র আধঘণ্টা আগে ঘরে ফিরেছে। দুজনের কারও শরীরেই চনমনে ভাব নেই, যেন দুটো যান্ত্রিক পুতুল কোনোমতে টিকে আছে।

​"এক কাপ চা করে দেব? খাবে?" মীনাক্ষী ব্যাগটা সোফায় রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল। তার গলায় কর্তব্যের টান থাকলেও তীব্র ক্লান্তি মিশে ছিল।

​"না, থাক। এখন আর লিকার গিলে লাভ নেই। একটু ঠান্ডা জল দাও তো," শুভ্র গায়ের শার্টের বোতাম আলগা করতে করতে মলিন সোফাটায় গা এলিয়ে দিল।

​মাথার ওপর সস্তা সিলিং ফ্যানটা পুরোনো ডাইনামোর গোঁ গোঁ শব্দ করে বাতাস কাটার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। মীনাক্ষী ফ্রিজ থেকে জলের বোতল আর গ্লাস নিয়ে এসে শুভ্রর পাশে বসল। এক ঢোকে পুরো গ্লাসটা খালি করে শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

​"আজকে দুপুরে বাড়িওয়ালা ফোন দিয়েছে," মীনাক্ষী গ্লাসটা টেবিল রাখতে রাখতে বলল। "সামনের মাস থেকে নাকি আরও এক হাজার টাকা ঘরভাড়া বাড়াবে। এই দামে না পোষালে এই মাসেই ঘর ছেড়ে দিতে বলেছে।"

​শুভ্র চোখের ওপর হাত রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো ছাদের প্লাস্টারটা যেন একটু একটু করে খসে তার বুকের ওপর পড়ছে। সে ক্লান্ত গলায় বলল, "বাজারে সব জিনিসের দাম ডাবল হচ্ছে মীনু, শুধু আমার বেতনটা এক জায়গায় ফিক্সড। কীভাবে যে এই বাড়তি টাকা জোগাড় করব, মাথায় ধরছে না।"

​"তুমিও যেমন! একটু বসের সাথে ভালো করে কথা বলে ইনক্রিমেন্টের দাবি করতে পারো না?" মীনাক্ষী একটু নড়েচড়ে বসল। "আর শোনো, পরশু দিন আমার কাজিনের বিয়ে, যেতেই হবে। একটা ভালো গিফট না নিয়ে গেলে মুখ দেখানো যাবে না। অন্তত হাজার খানেক টাকা রেখো হাতখরচ বাদে।"

​"টাকা কি আকাশ থেকে পড়বে মীনু? মায়ের ওষুধের টাকা, গ্রামের বাড়ির ভাঙা চাল মেরামতের খরচ, আবার ছোট ভাইয়ের মেস ভাড়া সব একলা আমাকে টানতে হয়। আমি জাদুকর নই যে কাগজ দিয়ে টাকা বানাব!"

​"আমি কি আমার বাপের বাড়ির জন্য টাকা ওড়াতে চাচ্ছি?" মীনাক্ষীও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, চেঁচিয়ে উঠল। " আমি ত যেতেই চাচ্ছি না কিন্তু সামাজিকতা বলে তো একটা জিনিস আছে দুনিয়ায়! 

​শুরু হয়ে গেল সেই চেনা, প্রাত্যহিক এবং একঘেয়ে ঝগড়া। যে ঝগড়ার কোনো শেষ নেই, কোনো যৌক্তিক সমাধান নেই। এটা কোনো আদর্শের লড়াই নয়, স্রেফ নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গ্লানি আর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ক্ষোভের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

​খানিক পর ঘরটা আচমকাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মীনাক্ষী অভিমানে আর ক্লান্তিতে বিছানার অন্যপাশে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ল। শুভ্র সোজা হেঁটে বারান্দায় গিয়ে গ্রিলটা চেপে ধরল।

​রাতের চট্টগ্রাম শহরটা দূর থেকে আলোঝলমলে, মায়াবী দেখায়। চকচকে নিয়ন আলো আর সোডিয়ামের আলোয় চারপাশটা কত রঙিন! কিন্তু এই কৃত্রিম আলোর নিচে শুভ্রর মতো কত হাজার হাজার তরুণ যে প্রতিদিন নিজেদের লালিত স্বপ্নগুলোকে, তাদের ভেতরের শিল্পীটাকে এভাবে তিল তিল করে জবাই করছে, তার হিসাব রাখার কেউ নেই। পকেট থেকে শেষ গোল্ডলিফ সিগারেটটা বের করল সে। প্লাস্টিকের সস্তা লাইটারটা জ্বালতেই অন্ধকারের বুকে ছোট্ট এক চিলতে আগুনের শিখা জ্বেলে উঠল। সিগারেটে আলতো টান দিয়ে বুক ভরে ধোঁয়াটা ভেতরে নিল শুভ্র, তারপর আস্তে করে ছেড়ে দিল।

​বিকেলের সেই নির্জন ছাদে বসে শান্ত মনে সূর্য ডোবা দেখার আজন্ম আকাঙ্ক্ষা, ষোলশহরের চায়ের টংয়ের সেই উন্মাদ আড্ডা, কিংবা ডায়েরির পাতায় নতুন কোনো কবিতার পঙক্তির জন্ম হওয়া, সবকিছু এই মরণঘাতী ধোঁয়ার সাথে মিশে রাতের চাটগাঁর আকাশে শূন্যে বিলীন হয়ে গেল। অবশিষ্টাংশ হিসেবে রইল কেবল এক নিরেট, জীবন্ত লাশ।


পাঁচ.

রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁইছুঁই। চারপাশের কোলাহলময় শহরটা এখন এক নিঝুম, নিস্তব্ধ রূপ ধারণ করেছে। শুভ্র নিঃশব্দে এসে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিল। পাশে মীনাক্ষী গভীর ঘুমে মগ্ন; তার বুকের ওঠানামা নিয়মিত, ছন্দময়। ঘরের এই শান্ত পরিবেশেও শুভ্রর চোখে ঘুম নেই, চোখের পাতা দুটো যেন এক অদ্ভুত অবাধ্যতায় ভারী হয়েও বুজতে চাইছে না।

​সিলিংয়ের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুভ্রর মনে হলো, এই নরম বিছানাটা আসলে একটা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে কবর। একটা চেনা গোরস্থান। প্রতি রাতে সে যখন সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে এই বিছানায় এসে নিজের শরীরটাকে ছেড়ে দেয়, তখন আসলে সে স্রেফ ঘুমোতে যায় না। সে যায় এক সুপরিকল্পিত দাফনকার্যে অংশ নিতে—তার নিজেরই ভেতরের জ্যান্ত, প্রাণবন্ত মানুষটাকে মাটির নিচে চাপা দিতে।

​যে তরুণটা চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে গিটারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে  ধরতো জেমসের বেদনাসিক্ত অশান্ত এই মন /খুঁজে ফেরে মেটায় প্রয়োজন/ যতদূর জানে এ ব্যাকুল হৃদয়/ নীল বিষের পেয়ালা মনের বাঁধন......; যে ছেলেটা জামালখানের চড়া আড্ডায় বিপ্লব আর নতুন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখত,  যে মুক্ত ও উদাসীন মানুষটা কোনো এক বিকেলে উদ্দেশ্যহীন পায়ে চাটগাঁর চেনা-অচেনা গলিগুলোতে হেঁটে বেড়াতে ভালোবাসত তাকে প্রতি রাতে, এই ঠিক দুই কামরার ফ্ল্যাটের বিছানায় অতি গোপনে মাটি চাপা দেওয়া হয়। আর সেই স্বপ্নের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে জন্ম নেয় এক নির্বিকার কর্পোরেট ইঁদুর। এক যান্ত্রিক প্রাণী, যার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য হলো পরদিন সকালে টিকে থাকার এক অন্তহীন এবং লক্ষ্যহীন প্রতিযোগিতায় অন্ধের মতো দৌড়ানো।

​রাত যত বাড়তে থাকে, শুভ্রর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, ভারী বিষাদ পাথরের মতো চেপে বসতে থাকে। এক চরম একাকীত্ব আর গ্লানি তাকে গ্রাস করে। আস্তে আস্তে তার ক্লান্ত চোখ দুটো বুজে আসছিল, চেতনার জগৎটা আবছা হয়ে আসছিল।

​ঠিক তখনই, যেন এক অলৌকিক জাদুবলে ঘরের চারপাশের দেয়ালগুলো, আলমারি, আর ছাদটা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। শুভ্র নিজেকে আবিষ্কার করল এক বিশাল, দিগন্তবিস্তৃত সবুজ মাঠের মাঝখানে। তার পিঠে আজ কোনো অডিট ফাইলের ভারী বোঝা নেই, চোখে নেই বহদ্দারহাটের লোকাল বাসের সেই মরিয়া ক্লান্তি। তার দুই হাত মুক্ত, আর কোলজুড়ে পরম মমতায় জড়িয়ে আছে তার সেই পুরনো, প্রিয় গিটারটা। সে গান ধরলো — সোলসের। তুমি কি সেই সুরভি পেয়েছে/স্বপনের দ্বার খুলেছোকিছু জানিনিমন শুধু মন ছুঁয়েছেও সেতো মুখ খুলেনি/সুর শুধু সুর তুলেছে /ভাষা তো দেয় নি.....;  সে মনের আনন্দে গিটারের তারের ওপর আঙুল বোলাল, আর এক স্বর্গীয় সুরের ঝংকার বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল স্বাধীন কোনো পরিযায়ী পাখির মতো। দূরে কোথাও একটা রূপালী নদী এঁকেবেঁকে বয়ে যাচ্ছে, আর সেই নদীর ওপার থেকে ভেসে আসছে এক গম্ভীর অথচ চেনা কণ্ঠস্বরে আবুল হাসানের কবিতা আবৃত্তির শব্দ—‘বহুদূরে ট্রেনের হুইসেল, যায় দিন যায়! বোনের মোন এক লাজুক পাড়া গাঁ তার ডাক শুনে থাকে অপেক্ষায়।...’। শুভ্রর মনে হলো, এই তো তার আসল জীবন, এই তো তার চিরচেনা মুক্তি!

টিক তিক তিক তিক... টিক তিক তিক তিক...

​এক লহমায় সবুজ মাঠ, নদী আর গিটারের সুরের মায়াজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কুৎসিত, কর্কশ আর তীব্র এক যান্ত্রিক শব্দে বাজতে শুরু করেছে টেবিলের ওপর রাখা সস্তা ডিজিটাল ঘড়িটার অ্যালার্ম। 

​সকাল সাড়ে ছয়টা বেজে গেছে।

​শুভ্র তীব্র এক ঝাঁকুনি দিয়ে চোখ মেলল। মাথার ওপর সিলিং ফ্যানের তিনটে পাখা ঠিক আগের মতোই অলস, নিস্প্রাণ ভঙ্গিতে ঘুরে চলেছে।

​শুভ্র ভারী শরীরটা নিয়ে বিছানা থেকে মেঝেতে পা বাড়াল। যান্ত্রিক ইঁদুরটার পেছনের চাবিকাঠিটা নিয়তি আবারও নিষ্ঠুরভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছে। সে এখন ছুটবে, একনাগাড়ে ছুটে চলবে সারাদিন, যতক্ষণ না রাতের সেই অন্ধকার ঘর আর বিছানা নামের কবরটা আবার তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ