বিয়ে যে কত্ত মজা গো খালি খাওন আর খাওন | মিনহাজ রাফি

 



বন্ধুদের মধ্যে একজনের বিয়ে মানে বাকিদের জন্য একটা শোকসংবাদ, আবার নতুন বিনোদনের উৎস। কিন্তু রাকিবের বিয়েটা ছিল একদমই আলাদা। কোনো শোরগোল নেই।  কোনো আমেজ নেই, গায়ে হলুদ নেই। হুট করে একদিন সে মেসেঞ্জারে একটা ছবি পাঠাল। যেখানে তার পাশে লাল শাড়িতে আবছা একজন বসে আছে। নিচে ক্যাপশন "আলহামদুলিল্লাহ, আমি কবুল বলে ফেলেছি।"

​ব্যস, তিন বন্ধুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।

​তাদের এই বন্ধুদের চক্রটা ছিল অনেকটা সেই পুরনো আমলের অটুট দেয়ালের মতো। চারজনের গ্রুপ। গ্রুপের নাম চিরকুমার সংঘ। সালাম, জাহিদ, আবির, রাকিব গ্রুপের মেম্বার। তাদের মূলমন্ত্র ছিল—বিয়ে হলো স্বাধীনতার কবর। তাদের আড্ডার মূল আলোচ্য বিষয়ই ছিল বিবাহিত পুরুষদের করুণ দশা। জাহিদ তো প্রায়ই বলত, "ভাইরে, ব্যাচেলর লাইফ হলো ওপেন ওয়ার্ল্ড গেম, আর বিয়ে হলো ওয়ান-রুম প্রিজন।" সেই দলের সবচেয়ে কট্টর সদস্য ছিল রাকিব। যে কি না গত বছরও একটা বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে বরের বিমর্ষ মুখ দেখে বলেছিল, "আহারে বেচারা! জ্যান্ত দাফন হয়ে গেল।"

​সেই রাকিবই কি না এভাবে গোপনে, কোনো নোটিশ ছাড়া এই কাণ্ড ঘটিয়ে বসল!

​ঘটনাটা শুরু হয়েছিল একটা শান্ত শুক্রবারের দুপুরে। ওরা তখন জাহিদের মেসে বসে লুডু খেলছিল আর পরিকল্পনা করছি যে সামনের মাসে সবাই মিলে বান্দরবান যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে চিরকুমার সংঘ ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে নোটিফিকেশন এল। 

রাকিবের সেই ছবি দেখে প্রথমে কিছুক্ষণ সবাই স্তব্ধ হয়ে রইলো। কারোর আঙুল কিবোর্ডে চলছে না। জাহিদ তার হাতের লুডুর ছক্কাটা মেঝের ওপর ফেলেই দিল।

​সালামই প্রথম নীরবতা ভাঙল। সে টাইপ করল, "ছবিটা কি এডিট করা নাকি কোনো নাটকের শুটিং?"

রাকিবের রিপ্লাই এল সাথে সাথেই, "না রে ভাই, সত্যি। পারিবারিক সম্মতিতে মসজিদে ছোটখাটো অনুষ্ঠান হয়েছে। দোয়া করিস।"

​এটা তো শুধু একটা বিয়ে নয়, এটা হলো বিশ্বাসের চরম বিশ্বাসঘাতকতা! যে ছেলেটা কাল পর্যন্ত বলত "মেয়েদের সাথে কথা বলা মানে সময়ের অপচয়," সে আজ এক ঝটকায় ফুল টাইম স্বামী হয়ে গেল?

​সালাম মোবাইলটা আছাড় দেওয়ার ভঙ্গি করে চিৎকার করে উঠল, "আমি মানি না! এই বিয়ে আমি মানি না! কোনো ধুমধাম নেই, কোনো কাচ্চির সুঘ্রাণ নেই, একটা কার্ড পর্যন্ত পাঠালো না এটা তো রীতিমতো ডিক্টেটরশিপ!"

​জাহিদ লুড্ডু ছয় ছক্কার দিকে তাকিয়ে বলল, "আরে ভাই, খাওয়া-দাওয়া গোল্লায় যাক। রাকিবের মতো ছেলে কীভাবে এটা পারল? ও না সেদিন বলছিল সে জীবনেও বিয়ে করবে না আর করলেও আমাদের সবার আগে জানাবে?

​আবির আবার একটু ইমোশনাল টাইপের। সে উদাস হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাদের বান্দরবান ট্যুরটা মনে হয় আর হলো না রে। এখন থেকে রাকিবকে ডাকলে ও বলবে বউ রাগ করবে, বাজারে যেতে হবে অথবা আজ শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আসবে'। ব্যাস, আমাদের গ্রুপের একটা উইকেট চিরতরে পড়ে গেল।"

​আসলেই তো! রাকিব ছিল তাদের আড্ডার মধ্যমণি। ঝগড়া মেটানো হোক কিংবা কোনো রেস্টুরেন্টে বিল কমানোর জন্য ম্যানেজারের সাথে তর্ক করা সব জায়গাতেই রাকিব ছিল ফ্রন্ট লাইনে। সেই মানুষটা এখন বউয়ের পারমিশন ছাড়া বাসা থেকে বের হতে পারবে না ভাবতে তাদের বুক ফেটে কান্না আসছিল।

​বন্ধুমহলে যখন কেউ বিয়ে করে, তখন বাকিদের অনুভূতি অনেকটা সেই সৈন্যদের মতো হয়, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করছে আর হঠাৎ দেখল তাদের সেনাপতি হোয়াইট ফ্ল্যাগ দেখিয়ে শত্রুপক্ষে যোগ দিয়েছে। তাদের অবস্থাও ঠিক তেমন।

​সবচেয়ে বেশি অবাক হচ্ছিলাম বিয়ের ধরন দেখে। কোনো শোরগোল নেই কেন? আমরা তো ভেবেছিলাম রাকিব যখন বিয়ে করবে, তখন আমরা ওর গায়ে হলুদে সারা পাড়া মাথায় তুলব। ওর বিয়ের পাঞ্জাবি আমরা চুজ করব। বরযাত্রী হিসেবে গিয়ে কনের বড় বোনদের সাথে গেট ধরা নিয়ে তুমুল ঝগড়া করব। অথচ ছেলেটা কাউকে সে সুযোগই দিল না। অনেকটা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মুভির মতো হুট করে রিলিজ দিয়ে দিল, কোনো ট্রেইলার নেই, কোনো প্রমোশন নেই!

​সালাম আবার টাইপ করল, "আচ্ছা, মেয়েটা কে? এটা কি সেই পুরনো মুভির মতো ঘরপালানো বিয়ে'?"

রাকিবের আবার রিপ্লাই, "আরে না না, একদম অ্যারেঞ্জড। আব্বুর বন্ধুর মেয়ে। তোরা শান্ত হ, এক মাস পর তোদের বড় করে খাওয়াব।"

​খাওয়ানোর কথা শুনে জাহিদ একটু ঠান্ডা হলো ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই মুখ কালো করে বলল, এক মাস পর তো ও নিজে খাওয়াবে না, ওর হয়ে ভাবি পারমিশন দিবে। আমরা কি সেই রাকিবকে আর পাব? যে রাকিব রাত দুইটায় বাইক নিয়ে বের হয়ে বলত 'চল আজ নেভাল গিয়ে চা খেয়ে আসি'?"

​ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত শ্মশান নিস্তব্ধতা নেমে এল। রাকিবের সেই হাসিমুখের সেলফিটা তাদের সবার স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছিল। তার হাসি দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন বিশ্বজয় করে ফেলেছে, আর তারা পড়ে আছে হারানো দিনের স্মৃতি নিয়ে।

​সালাম শেষমেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গ্রুপে লিখল, "ঠিক আছে বন্ধু, শুভকামনা।  দাওয়াত দিস। তবে মনে রাখিস, আজকের দিনটা আমাদের জন্য জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হবে।


২.

রাকিবের বিয়ের সেই আকস্মিক শক কাটিয়ে উঠতে বন্ধুদের পুরো এক মাস সময় লেগেছিল। এই এক মাসে রাকিবের কোনো দেখা নেই। গ্রুপে টেক্সট দিলে রিপ্লাই আসে চার ঘণ্টা পর। আর ফোনে তো তাকে পাওয়াই দুষ্কর। বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, "রাকিবের দফারফা হয়ে গেছে রে। নির্ঘাত বউয়ের আঁচল ধরা গোলাম হয়ে গেছে এখন।" তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, এক মাস পর রাকিব যখন সামনে আসবে, তাকে চেনা যাবে না। গাল ভেঙে চুয়ালে গিয়ে ঠেকবে, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পড়বে আর অফিসের সাধারণ ফরমাল শার্টটাও হয়তো ইস্ত্রি ছাড়া থাকবে।

​অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। রাকিব সবাইকে সপরিবারে (যদিও পরিবার বলতে ওই বন্ধুগুলোই) তার নতুন বাসায় দাওয়াত দিল।

​সালাম, জাহিদ আর আবির তিনজন মিলে যখন রাকিবের দরজায় নক করল, তখন তাদের বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছিল। 

​দরজা খুলল স্বয়ং রাকিব। কিন্তু একি! রাকিবের গায়ে রেশমি পাঞ্জাবি, চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করা, আর তার চেহারা দিয়ে যেন নূরের জ্যোতি বের হচ্ছে। সে বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের সাজসজ্জা দেখে মনে হচ্ছিল কোনো রাজপ্রাসাদের ছোটখাটো অংশ। চারদিকে একটা মিষ্টি সুবাস ছড়াচ্ছে।

​রাকিব সোফায় বসল একদম রাজকীয় ভঙ্গিতে। সে বসতে না বসতেই ভেতর থেকে ঘোমটা মাথায় দিয়ে এক রূপবতী তরুণী বেরিয়ে এলেন। ইনিই সেই 'ভাবি'। হাতে একটা বিশাল বড় রূপালি ট্রলি, যাতে দশ-বারো পদের নাস্তা সাজানো।

​ভাবি ঘরে ঢুকেই মৃদু হেসে সালাম দিলেন। তার কণ্ঠস্বর যেন কোনো হার্পের সুর।

রাকিব আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে বলল, "আরে শোনো না লক্ষ্মীটি, জাহিদ তো আবার চিনি  ছাড়া চা খায়। ওরটা কি একটু আলাদা করে করেছ?"

​ভাবি বিনম্র ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বললেন, "তুমি চিন্তা করো না, আমি সব মনে রেখেছি। জাহিদ ভাইয়ের জন্য স্পেশাল চিনি ছাড়া চা, আবির ভাইয়ের জন্য হালকা চিনি আর সালাম ভাইয়ের জন্য মালাই চা সব রেডি। তোমরা আগে এই হাতে বানানো পিঠাগুলো খাও, আমি বিরিয়ানিটা দমে বসিয়ে আসছি।"

​বন্ধুরা তিন জোড়া চোখ বড় বড় করে একে অপরের দিকে তাকাল। জাহিদ বিড়বিড় করে বলল, "এটা কি বাস্তব? নাকি রাকিব কোনো জিনের বাদশাহর মেয়েকে বিয়ে করে এনেছে?"

​আড্ডার মাঝখানে রাকিবের কপালে সামান্য একটু ঘাম দেখা দিল (হয়তো সিলিং ফ্যানটা একটু ধীরে ঘুরছিল)। সে একবার শুধু হাত দিয়ে কপাল মুছতে গেল, অমনি কোত্থেকে ভাবি একটা টিস্যু বক্স আর দামী পারফিউম মাখানো রুমাল নিয়ে উদয় হলেন। তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে রাকিবের কপাল আর ঘাড়ের ঘাম মুছে দিলেন। রাকিবের চেহারায় তখন এমন এক তৃপ্তির ছাপ, যেন সে মোঘল সম্রাট শাহজাহান আর ভাবি তার মমতাজ।

​সালামের হাতে তখন একটা ভাজা পিঠা। সে মুখ হাঁ করেছে খাবে বলে, কিন্তু দৃশ্য দেখে তার হাঁ করা মুখ আর বন্ধ হচ্ছে না। ভাবি এখানেই থামলেন না। তিনি একটা ছোট প্লেটে করে চামচ দিয়ে নিজের হাতে রাকিবকে পায়েস তুলে খাইয়ে দিতে লাগলেন।

রাকিব খুব সাধারণ ভঙ্গিতে বলল, "আরে থাক না, বন্ধুদের সামনে লজ্জা দিচ্ছ কেন?"

ভাবি মিষ্টি করে হেসে বললেন, "বন্ধুরা তো ঘরের মানুষ। আর তোমার যত্ন নেওয়া তো আমার ইবাদত।"

​এই এক লাইনে সালামের হাতের পিঠা প্লেটে পড়ে গেল। তারা সবাই জানত রাকিব ছিল সবচেয়ে অগোছালো ছেলে। নিজের মোজা খুঁজে পেত না, মেসের ডাইনিংয়ে কোনোদিন লবণ কম হলে চিল্লাপাল্লা করে পাড়া মাথায় তুলত। সেই রাকিব এখন একটা সোফায় মূর্তির মতো বসে আছে আর তাকে ঘিরে সেবা-শুশ্রুষার এমন এলাহি কারবার চলছে!

​ভাবি যখন রান্নাঘরে গেলেন, তখন সালাম ফিসফিস করে বলল, "ভাই, এটা কি কোনো মায়া নাকি জান্নাতের ট্রেইলার দেখছি আমরা? পৃথিবীতে কি এমন স্ত্রী এখনো অবশিষ্ট আছে?"

​জাহিদ বলল, "আমার তো মনে হচ্ছে আমরা কোনো সোপ অপেরার সেটে ঢুকে পড়েছি। তুই কি খেয়াল করেছিস? রাকিবের গলার স্বর পর্যন্ত বদলে গেছে। ও যেন কোনো আধ্যাত্মিক সুখে মজে আছে।"

​আবির উদাস হয়ে বলল, "আমি তো ভেবেছিলাম রাকিবকে বাজার করার লিস্টি নিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখব। কিন্তু এখানে তো উল্টো চিত্র! এখানে ও তো হুকুম দিচ্ছে না, বরং হুকুম দেওয়ার আগেই সব হাজির হয়ে যাচ্ছে।

​রাকিব তখন আয়েশ করে একটা আঙুর মুখে দিয়ে বলল, "কিরে তোরা খাচ্ছিস না কেন? তোদের ভাবি অনেক কষ্ট করে বিরিয়ানি রান্না করছে। তোরা খেয়ে না গেলে ও খুব মন খারাপ করবে। সত্যি বলতে কি, বিয়ের পর আমি বুঝলাম মানুষ আসলে একা বাঁচার জন্য সৃষ্টি হয়নি। একজন যোগ্য জীবনসঙ্গিনী থাকলে দুনিয়াটাই স্বর্গ হয়ে যায়।"

​খাওয়াদাওয়া পর্বটা ছিল রীতিমতো রাজকীয়। বিরিয়ানির সুগন্ধ আর ভাবির হাতের জাদুকরী রান্নায় বন্ধুদের পেট এবং মন দুটোই তখন টইটম্বুর। দস্তরখান গুটিয়ে নেওয়ার পর রাকিব খুব আয়েশ করে একটা রুপোলি খিলিপান মুখে দিল। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে সে এমনভাবে বসল, যেন সে কোনো সালতানাতের প্রধান উজির, আর বাকি বন্ধুরা তার প্রজা। পান চিবোতে চিবোতে তার মুখে ফুটে উঠল এক গভীর আত্মতৃপ্তির আভা।

​কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করার পর রাকিব তার বিবাহিত জীবনের লেকচার সেশন শুরু করল। তার কণ্ঠস্বরে ছিল এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর মায়া।

​রাকিব ড্রয়িংরুমের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, "দেখ বন্ধু, তোরা তো এখনো সেই স্কুলের বাচ্চাদের মতো রয়ে গেলি। তোদের কাছে জীবন মানে হলো শুধু উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো আর রাত জেগে আড্ডা দেওয়া। কিন্তু সত্যি বলি, তোরা আসলে জীবনের আসল মানেটাই বুঝলি না। বিয়ে মানে কি শুধু একটা সামাজিক বন্ধন বা আইনি দলিল? উঁহু, মোটেও না! বিয়ে মানে হলো একটা সলিড সাপোর্ট সিস্টেম।"

​সে একটু থামল, যেন বন্ধুদের মাথার ভেতর কথাটা ঢোকার সুযোগ দিচ্ছে। তারপর আবার শুরু করল, "কল্পনা কর, মাঝরাতে তোর ধুম জ্বর এল। মেসে থাকলে জাহিদ বড়জোর একটা প্যারাসিটামল এগিয়ে দিয়ে আবার ল্যাপটপে গেম খেলতে বসবে। কিন্তু এখানে? এখানে কেউ একজন আছে যে সারা রাত তোর শিয়রে বসে কপালে জলপট্টি দেবে। কপালে চুমু দিবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তোকে খুঁজতে হবে না ইস্ত্রি করা শার্টটা আলমারির কোন কোণায়। সবকিছু তোর হাতের নাগালে সাজানো থাকবে। এই যে পরম নিশ্চিন্ততা, এর কোনো দাম হয়?"

​সালাম আর জাহিদ তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাকিবের কথা গিলছে। কিন্তু আবির, যে কি না স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে রাজি, সে হঠাৎ প্রতিবাদ করে উঠল। আবির একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "আরে রাখ তোর সাপোর্ট সিস্টেম! এই যে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কারোর কাছে জবাবদিহি করা, আড্ডার মাঝখানে ফোন এলে দৌড়ে বাসায় যাওয়া, রাত জেগে গেম খেলার বদলে ফিসফিস করে কথা বলা এই স্বাধীনতা হারানো কি এতই সহজ? আমরা অবিবাহিতরা হলাম মুক্ত বিহঙ্গ, খাঁচায় বন্দি হতে যাব কেন?"

​রাকিব এবার হাসল। করুণাময় হাসি যা কোনো অভিজ্ঞ গুরু তার অবুঝ শিষ্যদের দিকে তাকিয়ে হাসে। সে আবিরের কাঁধে হাত রেখে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, "স্বাধীনতা! শব্দটা শুনতে বেশ লাগে, তাই না? কিন্তু বন্ধু, সেই স্বাধীনতা দিয়ে তুই কী করবি, যদি দিন শেষে ঘরে ফেরার পর তোকে বরণ করে নেওয়ার মতো কোনো মায়া না থাকে? ঘরে যদি ভালোবাসা আর যত্ন না থাকে, তবে সেই স্বাধীনতার নাম হলো যাযাবর জীবন। খাঁচায় বন্দি পাখিও যদি নিয়মিত আদর আর খাবার পায়, সে আর বনের অনিশ্চয়তাকে ভয় পায় না।"

​রাকিব আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের নিখুঁত পাঞ্জাবির কলারটা একটু ঠিক করে নিল।  "আবির, তুই তো আমাকে ১০ বছর ধরে চিনিস। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল তো, আমি কি অখুশি? আমার এই চেহারার উজ্জ্বলতা, এই মানসিক শান্তি কি তোর সেই তথাকথিত স্বাধীনতায় আছে?"

​রাকিবের চেহারায় তখন আক্ষরিক অর্থেই সুখের জেল্লা উপচে পড়ছে। তার চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো বিরক্তি নেই। বন্ধুদের মনে হলো, রাকিব যেন কোনো গোপন খনির সন্ধান পেয়ে গেছে, যা তারা এখনো পায়নি। সেই মুহূর্তে সালাম, জাহিদ আর আবিরের মনে হলো তাদের ব্যাচেলর লাইফটা আসলে এক মরুভূমি, আর রাকিব এখন এক সুশীতল মরূদ্যানে বাস করছে। রাকিবের এই প্ররোচনা তাদের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিল।

​রাকিব বিদায় বেলায় ভাবিকে ডেকে বলল, "লক্ষ্মীটি, বন্ধুদের একটু বিদায় জানিয়ে যাও।"

ভাবি এসে আবার সালাম দিয়ে বললেন, "আবার আসবেন ভাইয়ারা। সামনের বার আপনাদের পছন্দমতো আরও কিছু রাঁধব।"

​রাকিবের বাসার দরজা যখন বন্ধ হলো, তখন তিন বন্ধু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কেউ কোনো কথা বলছিল না। পার্কিং লটে এসে সালাম প্রথম মুখ খুলল, "ভাই, কাল থেকে আমি পাত্রী দেখা শুরু করছি। জীবনটা আর এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না...


৩.

রাকিবের বাসার সেই মায়াবী বিকেলটা বন্ধুদের মগজে এক বিষাক্ত সুগার কোটেড ভাইরাসের মতো ঢুকে গিয়েছিল। বেশ কয়েকদিন ধরে সালাম, জাহিদ আর আবিরের চোখে ভাসছে সেই রাজকীয় আতিথেয়তা, ভাবির সেই দেবীতুল্য সেবা আর রাকিবের সেই সম্রাটোচিত সুখ। তাদের মনে তখন একটাই জেদ কাজ করছে রাকিব যদি পারে, তবে আমরা কেন এই মরুভূমিতে পড়ে থাকব? আমরাও তো মানুষ, আমাদেরও তো জলপট্টি দরকার!

​পরের ছয় মাসের মধ্যে যেন এক প্রলয় ঘটে গেল। প্রথমে বিয়ের পিঁড়িতে বসল সালাম। মাস দুয়েক পর জাহিদ। আর সবচেয়ে কট্টরপন্থী স্বাধীনতাপ্রিয় আবির, যে কি না বলেছিল বিয়ে মানেই পরাধীনতা, সে-ও একদিন কার্ড নিয়ে হাজির হলো। একে একে ডমিনো স্টাইলে সবার উইকেট পড়ে গেল। সবারই ধারণা ছিল, তারা প্রত্যেকেই একেকজন রাকিব হবে, আর তাদের ড্রয়িংরুমেও সারাক্ষণ বিরিয়ানির সুগন্ধ আর যত্নের জোয়ার বইবে।

​কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্যরকম। বিয়ের ছয় মাস পার হতেই সেই রঙিন স্বপ্নগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করল।

​সালামের ভাবনার জগৎটা ছিল সবচেয়ে সহজ-সরল। সে ভেবেছিল বিয়ে মানেই রোমান্টিক ডিনার আর বিকেলে হাত ধরে হাঁটা, খুনসুটি,  ভালোবাসাবাসি। কিন্তু বিয়ের তিন মাস পর সালামকে দেখলে মনে হয় সে কোনো এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ডেলিভারি বয়। আগে সালাম আড্ডায় আসত সবার আগে। আর এখন?

​সেদিন বিকেলে বন্ধুরা যখন অনেক কষ্টে আড্ডার আয়োজন করল, সালামের দেখা নেই। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর সালামের টেক্সট এল গ্রুপে: "দোস্ত, আসতে পারব না। শাশুড়ির থাইরয়েডের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, সেটা আনতে হবে। আর বাসায় যাওয়ার পথে বউয়ের জন্য একটা  নতুন মেকআপ বক্স নিয়ে যেতে হবে। বাজারে নাকি নতুন আসছে।  

​সালামের জীবন এখন অফিস আর বাজারের ব্যাগের মাঝখানে আটকে গেছে। তার ড্রয়িংরুমে বিরিয়ানির সুগন্ধের বদলে এখন ওষুধের গন্ধ। সে যখনই একটু সময় বের করে আড্ডার কথা ভাবে, তখনই তার মোবাইলে এক বিশালাকার বাজারের ফর্দ এসে হাজির হয়। রাকিবের বাড়িতে দেখা সেই সেবা এখন সালামের জন্য একপাক্ষিক। সে এখন সেবা পায় না, বরং সে সারাদিন সার্ভিস দিয়ে বেড়ায়। তার ফেসবুক প্রোফাইলটা, যেখানে আগে ট্যুরের ছবি থাকত, এখন সেখানে সে বিড়ালের খাবারের রিভিউ আর গ্যাসের ওষুধের বিজ্ঞাপন শেয়ার করে।

​জাহিদের অবস্থা আরও করুণ। জাহিদের বউ অত্যন্ত আধুনিকা এবং প্রযুক্তিমনস্ক। আর এই প্রযুক্তির পুরোটা প্রয়োগ হয় জাহিদের ওপর। জাহিদ যখনই আড্ডায় আসার অনুমতি পায়, তাকে যেন কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরে থাকতে হয়।

​সেদিন কোনোমতে জাহিদ আড্ডায় বসল। কিন্তু বসলে কী হবে? প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর তার ফোনটা বিকট শব্দে বেজে ওঠে।

​ফোন ১: "কোথায় তুমি? ব্যাকগ্রাউন্ডে আবিরের গলা কেন শোনা যাচ্ছে না? ওর সাথে কথা বলিয়ে দাও, কোথায় তোমরা? পাশে কোনো মেয়ে আছে?

​ফোন ২: "ভিডিও কল দাও। তোমার পেছনে যে গাছটা দেখা যাচ্ছে, ওটা কি পার্কের গাছ নাকি কোনো রেস্টুরেন্টের? ক্যামেরাটা ৩-৬০ ডিগ্রি ঘোরাও তো দেখি আশেপাশে কেউ আছে কি না!"

​জাহিদের অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, সে আড্ডার বসে বউকে আড্ডার লাইভ টেলিকাস্ট দেখাতে হয়। তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এখন আইক্লাউড স্টোরেজে জমা পড়ে গেছে। সে এখন কোনো কথা বলার আগে তিনবার ভাবে যে এটা তার বউ ভিডিও কলে শুনলে কী রিয়্যাকশন দেবে। জাহিদ আগে ছিল গ্রুপের সবচেয়ে সাহসী ছেলে, এখন সে আড্ডায় বসে ভয়ে ভয়ে ফোনের চার্জ চেক করে যদি চার্জ শেষ হয়ে ফোন বন্ধ হয়ে যায়, তবে বাসায় গিয়ে তাকে নির্ঘাত জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

​আবিরের কথাও বলা যাক।  আবির ছিল তাদের গ্রুপের শো-অফ মাস্টার। ব্র্যান্ডের ঘড়ি, ইস্ত্রি করা শার্ট আর পারফেক্ট হেয়ারস্টাইল ছাড়া সে ঘর থেকে বের হতো না। সেদিনের আড্ডায় আবির যখন ঢুকল, জাহিদ আর সালাম একে অপরের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল।

​আবিরের গায়ের শার্টের মাঝখানের একটা বোতাম নেই। কলারটা এমনভাবে কুঁচকে আছে যেন কোনো গরু সেটা চিবিয়ে ফেলে রেখেছে। চুলে চিরুনি পড়েনি অন্তত দুই দিন। চোখের নিচে এমন গভীর কালি, যেন সে গত এক মাস ধরে কোনো কয়লা খনিতে কাজ করে এসেছে।

​জাহিদ করুণা মাখা গলায় জিজ্ঞেস করল, "আবির, তোর এই দশা কেন ভাই? তুই তো ছিলি আমাদের মডেল!"

আবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "মডেলগিরি শেষ রে ভাই। এখন আমি শুধু একজন মালবাহী গাধা। সারাদিন বউয়ের নানা আবদার আর ঘরের কাজ করতে করতে নিজের আয়না দেখার সময় পাই না। শার্ট ইস্ত্রি করা তো দূরের কথা, সকালের নাস্তাটুকু খুজে পাওয়া জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। বউ বেলা করে ঘুমায়। রাকিবের বাসায় দেখেছিলাম বউ গায়ের ঘাম মুছে দেয় আর আমার বাসায় আমি নিজেই নিজের চোখের জল মুছি, বউ টের পাওয়ার আগেই!"

​তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর ভাবে, "রাকিবের মতো সেই সুখের জেল্লা আমাদের কপালে কেন জুটল না রে....?" 


৪.

সালাম, জাহিদ আর আবিরের ধৈর্যের বাঁধ সেদিন বিকেলেই ভেঙে গিয়েছিল।  ছয়মাস ধরে রাকিবের সাথে তাদের তেমন যোগাযোগ নাই। তাদের মনে হচ্ছিলো রাকিব সুখে শান্তি আছে বউয়ের সাথে আর তারা কোনো এক অদৃশ্য মরীচিকার পিছু ধাওয়া করে নিজেদের সাজানো-গোছানো জীবনটাকে নরক বানিয়ে ফেলেছে। রাকিবের সেই জান্নাতী সংসার দেখার পর থেকে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। আর আজ, বিয়ের ছয় মাস পর, তারা যখন বিধ্বস্ত শরীর আর বিদ্ধস্ত মন নিয়ে আবার সেই রাজপ্রাসাদের দরজায় নক করল, তখন তাদের রক্তে বইছিল ক্ষোভের আগুন...

​দরজা খুলল রাকিব। কিন্তু একি! গতবারের সেই রাজকীয় জৌলুস কই? রাকিবের পরনে একটা ঢিলেঢালা হাফ প্যান্ট আর পুরনো টি-শার্ট। ড্রয়িংরুমের সেই স্বর্গীয় সুবাসের বদলে এখন সেখানে নোনা ধরা দেয়ালের গন্ধ। ঘরের কোণায় পিৎজার খালি বক্স পড়ে আছে, আর টিভিতে নেটফ্লিক্সে কোনো একটা রোমান্টিক মুভি চলছে। রাকিব অত্যন্ত আয়েশ করে সোফায় পা তুলে বসে পপকর্ন চিবোচ্ছে।

​বন্ধুদের দেখেই রাকিব খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, "কিরে? হঠাৎ তোরা এই অসময়ে? তোদের না এখন বাজার করার বা ভিডিও কলে হাজিরা দেওয়ার সময়?"

​রাকিবের এই তাচ্ছিল্য ভরা প্রশ্ন যেন আগুনে ঘি ঢালল। ​সালাম চিৎকার করে উঠল, "রাকিব, তুই আমাদের জীবনটা তছনছ করে দিলি! তুই বলেছিলি বিয়ে মানে রাজকীয় জীবন, বিয়ে মানে ইস্ত্রি করা শার্ট আর কপালে জলপট্টি আরো কত কি........। কিন্তু আজ দেখ আমাদের অবস্থা! অফিস শেষ করে বাসায় ফেরার সময় আমাদের বুক কাঁপে। আমাদের কোনো স্বাধীনতা নেই, কোনো আড্ডা নেই সারাদিন শুধু খোটা শোনা আর মাসের শেষে ইএমআই দেওয়ার টেনশন। তুই কেন আমাদের এই মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলি?"

​জাহিদ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল ঘর একদম ফাঁকা। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "তোর বউ কই? তাকে ডাক! আমাদের সামনে নিয়ে আয় তাকে। আমরা তার পা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই, সে তোকে এমন কী জাদু করেছে যে তুই এই নরকের বাজারেও নেটফ্লিক্স দেখে আয়েশ করছিস? আর আমাদের বউরা আমাদের জীবনটাকে নরক বানিয়ে ফেলেছে!"

​রাকিব কোনো কথা বলল না। সে শান্ত ভঙ্গিতে টিভিটা পজ করল। তারপর অত্যন্ত ধীরেসুস্থে সোফায় সোজা হয়ে বসলো। 

​বন্ধুরা তখনো উত্তেজনায় কাঁপছে। রাকিব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব শান্ত গলায় বলল, "তোরা যাকে ভাবি হিসেবে দেখেছিলি, সে আসলে আমার বউ নয়। কারণ, আমি ত বিয়েই করিনি, আমার কোনো বউ নেই রে।"

​মুহূর্তের জন্য ঘরটা নিথর হয়ে গেল। বাইরের রাস্তার ট্রাফিক জ্যামের হর্ন ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। সালাম, জাহিদ আর আবির যেন কোনো হরর মুভির ক্লাইম্যাক্স দেখছে। তাদের মস্তিষ্ক এই তথ্যটা প্রসেস করতে পারছিল না।

​আবির তোতলাতে তোতলাতে বলল, "মাআয়ায়া-মানে? ওইদিন যে মেয়েটা বিরিয়ানি খাওয়াল? নিজের হাতে তোকে পায়েস তুলে দিচ্ছিল, কপালে জলপট্টি দেওয়ার গল্প শুনিয়ে আমাদের চোখে জল এনে দিল সে কে? 

​রাকিব সশব্দে হেসে উঠল। সে হাসি যেন থামতেই চায় না। হাসতে হাসতে সে বলল, "আরে না না, ও আমার ছোটবেলার বন্ধু আর কাজিন নিপা। ও থিয়েটারে অভিনয় করে, ওর অভিনয়ের খুব নামডাক আছে। সেদিন তাকে দিয়ে আমি তোদের ইনস্পায়ার করার জন্য, অভিনয় করিয়েছিলাম।  তোরা যা দেখেছিলি, ওই যে যত্ন, ওই যে স্বামী ভক্তি ওটা ছিল পিওর মেথড অ্যাক্টিং! 

​জাহিদ এবার তেড়ে এল। কলার চেপে ধরলো রাকিবের।  "মাদারচোদ...তুই কেন এই পুন্দানি করলি? আমাদের জীবন নিয়ে এই এক্সপেরিমেন্ট করার অধিকার তোকে কে দিয়েছে? আমরা এখন সংসার নামের এই যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছি শুধু তোর ওই নাটকের ওপর ভিত্তি করে!"

​রাকিব এবার গম্ভীর হলো। "শোন, রাগ করিস না। আমার বাসা থেকে বিয়ের জন্য খুব চাপ দিচ্ছিল। মেয়ে দেখাও শুরু হয়ে গেছিল। কিন্তু আমি কিভাবে সাঁতার না শিখে সমুদ্রে ডুব দিই বলতো? আমি আসলে দেখতে চেয়েছিলাম বিয়ের পরিণতিটা কেমন হয়। বই-পুস্তকে বা নাটকে তো অনেক কিছু দেখা যায়, কিন্তু বাস্তব জীবনটা কেমন কাটে সেটা চাক্ষুষ প্রমাণ করার জন্যই তোদের ওপর এই এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছি। তোদের তিনজনের তিন রকমের দাম্পত্য দেখে আমার বিয়ের সাধ এখন মিটে গেছে। আমি আর জীবনের বিয়ে করছি না...

​রাকিব আবার সোফায় হেলান দিয়ে বসল। "আমার তো এখন মুক্তি! আমার পাসপোর্ট রেডি, কাল সকালেই আমি থাইল্যান্ডের ফ্লাইটে উঠছি। ওখানে গিয়ে সমুদ্রের পাড়ে বসে আয়েশ করব।" সে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে এক মারণ হাসি হাসল। "কিরে, তোরা যাবি আমার সাথে? ও সরি, আমি তো ভুলেই গেছি! তোদের তো আগে পারমিশন নিতে হবে। পারমিশন দিবে কিনা সেটারও গ্যারান্টি নাই। আর দিলেও বউ কি ভিডিও কল ছাড়া তোদের এয়ারপোর্টের গেট পর্যন্ত যেতে দিবে? হাহাহা!"

​সালাম, জাহিদ আর আবির তখন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। তাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। যে বন্ধুকে তারা আদর্শ স্বামী ভেবে অনুসরণ করেছিল, সে আসলে তাদের দিয়ে নিজের কৌতূহল মেটানোর গিনিপিগ বানিয়েছে।

​রাকিব পপকর্নটা আবার মুখে দিয়ে বলল, "যাই হোক, তোরা আমাকে গালি দিচ্ছিস ঠিকই, কিন্তু আসলে তোদের আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। বিয়ে করা তো ফরজ কাজ রে ভাই। আমার কারণেই তো তোরা সেই ফরজ কাজটা সময়মতো করতে পারলি! আমি না থাকলে তোরা সারা জীবন ওই অপরিষ্কার মেসে বসে লুডু খেলতিস। অন্তত এখন তোদের একটা ঘর আছে, বউ আছে—আর সবচেয়ে বড় কথা, তোরা এখন জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেয়ে গেছিস...

​বন্ধুরা রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল। দরজার কাছে গিয়ে সালাম একবার পেছনে ফিরে তাকাল। সে দেখল রাকিব আবার রিমোট হাতে নিয়ে মুভি প্লে করেছে। 

​রাকিবের ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আবির বিড়বিড় করে বলল, "আমাদের ডুবিয়ে দিয়ে সে এখন থাইল্যান্ডে গিয়ে বিকিনি পরা মাছ দেখবে, হায়রে কপাল...






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ