গতকাল খালু বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করে মাজেদা খালা থেকে দেড় হাজার টাকা পেয়েছি। সেটা দিয়ে একটা স্মার্টফোন কিনলাম। সেকেন্ড হ্যান্ড, তবে ক্যামেরাটা মোটামুটি। আর একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুললাম। নাম দিলাম সহজ ‘হিমু’। প্রোফাইল পিকচারে কোনো ছবি দিলাম না। কভারে দিলাম মরা জোছনার এক ফালি আলো। ব্যস।
আমার প্রথম স্ট্যাটাস ছিল:
"আজ আকাশটা বড় বেশি নীল। রূপা, তুমি কি নীল অপরাজিতা হয়ে ফুটতে পারো না?
বলাই বাহুল্য, এই স্ট্যাটাসের কোনো মানে নেই। কিন্তু আধঘণ্টার মধ্যে দেখা গেল সাতশ শেয়ার। মানুষের মধ্যে একটা অদ্ভুত বাতিক আছে যা তারা বোঝে না, তাকেই তারা মহৎ মনে করে। কমেন্ট বক্সে হুলুস্থুল পড়ে গেল। কেউ লিখল, ‘গভীর! বড্ড গভীর!’ কেউ লিখল, ‘ভাইয়া, আপনি কি জীবনানন্দ দাশের পুনর্জন্ম?’
আমি কোনো রিপ্লাই দিলাম না। হিমুরা কখনো কমেন্টের রিপ্লাই দেয় না। তারা শুধু নিরাসক্তভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
পরের এক সপ্তাহে আমার ফলোয়ার সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি এত বেশি ফলোয়ার বাড়বে আমি কল্পনাও করিনি। আমি প্রতিদিন রাত একটায় একটা করে পোস্ট দেই। কোনোদিন লিখি, "পিঁপড়াদের মিছিল আজ উত্তর দিকে যাচ্ছে, হয়তো কোনো রাষ্ট্রবিপ্লব হবে।" কোনোদিন লিখি, "এক কাপ চা আর আধখানা চাঁদ—বাকিটা ইতিহাস।"
লোকে আমাকে নিয়ে রিসার্চ শুরু করল। ইউটিউবে ভিডিও হলো—'কে এই রহস্যময় হিমু?' টকশোতে আলোচনার বিষয় হলো, 'আধুনিক তরুণ প্রজন্মের ওপর মিস্টিক পোস্টের প্রভাব'। আমি হয়ে গেলাম যাকে বলে মেগা ইনফ্লুয়েন্সার। অথচ আমার পকেটে তখনও সেই মরা ইঁদুরের মতো কুঁকড়ে থাকা ১০ টাকার একটা নোট ছাড়া আর কিছু নেই।
আসল ঝামেলা শুরু হলো ব্র্যান্ডগুলোকে নিয়ে। আধুনিক যুগে মানুষ আল্লাহকে পরে চেনে, আগে চেনে মার্কেটিং ম্যানেজারদের।
একদিন আমার ইনবক্সে মেসেজ এল ক্রিঞ্জ গেজেট নামক এক বিশাল কোম্পানি থেকে। তারা আমাকে তাদের লাখ টাকার একটা নতুন স্মার্টওয়াচের প্রমোশন করে দেওয়ার জন্য। তাদের শর্ত আমি যেন একটা স্ট্যাটাস দেই যেখানে স্মার্টওয়াচটার কথা পরোক্ষভাবে বলা থাকবে।
আমি তাদের একটা মেসেজ দিলাম: "স্মার্টওয়াচ দিয়ে সময় মাপা যায়, কিন্তু শূন্যতাকে নয়। আমি শূন্যতার কারবারি।"
ব্যাস! এই মেসেজটার স্ক্রিনশট তারা ভাইরাল করে দিল। তারা প্রচার করল—"হিমু আমাদের ঘড়ি রিজেক্ট করে দিয়েছেন কারণ আমাদের ঘড়ি এতটাই নিখুঁত যে তা হিমুর মতো রহস্যময় মানুষের সময়কে বেঁধে ফেলতে পারে না।"
তাদের ঘড়ি বিক্রি দশ গুণ বেড়ে গেল! আমি বুঝতে পারলাম, এ তো মহাবিপদ। আমি কিছু না করেও ভাইরাল হচ্ছি, আবার রিজেক্ট করেও ভাইরাল হচ্ছি।
এরপর একদিন আমার আস্তানায় (যা আসলে মেসের এক চিলতে বারান্দা) হাজির হলো এক বিখ্যাত টি-শার্ট ব্র্যান্ডের মালিক। সাথে তার সুন্দরী পিআর ম্যানেজার। তারা সোজা আমার পায়ের কাছে একটা বিশাল প্যাকেট রাখল।
ম্যানেজার মেয়েটি আদুরে গলায় বলল, "হিমু ভাইয়া, আমরা আপনার জন্য এক সেট বিশেষ হলুদ পাঞ্জাবি বানিয়েছি। পকেট ছাড়া। আমরা চাই আপনি এই পাঞ্জাবি পরে একটা মিরর সেলফি দিন।"
আমি বললাম, "হিমুরা আয়না দেখে না। তারা অন্ধকারের প্রতিবিম্ব দেখে।"
মালিক লোকটা গদগদ হয়ে বলল, "অসাধারণ! ভাইয়া, এই ডায়লগটা আমরা আমাদের ব্র্যান্ডের ট্যাগলাইন হিসেবে ব্যবহার করতে চাই। আপনি শুধু এই পাঞ্জাবিটা একটু ধরুন, আমি একটা ছবি তুলি।"
আমি পাঞ্জাবিটা ধরলাম না। আমি মশারির ভেতর ঢুকে গেলাম। লোকটা আমার মশারিরই একটা ছবি তুলে নিয়ে গেল এবং পরদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিল— আজ মশারির রহস্যময় জালে বন্দি। আমাদের নতুন লাক্সারি প্রোডাক্ট "হিমু মশারি"—এখন হিমুর পছন্দের তালিকায়!"
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই সমাজ আমাকে দিয়ে ব্যবসা করাচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম, ভাইরাল হওয়ার ভূত একবার ঘাড়ে চাপলে সেখান থেকে নামার কোনো পথ নেই। এমনকি আপনি যদি চুপ থাকেন, সেই চুপ থাকাটাও একটা কন্টেন্ট।
একদিন রূপার ফোন এল। মানে আমাদের বর্তমান জমানার রূপা। সেও এখন মস্ত বড় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। দুইদিন হলো কন্টেন্ট মনিটাইজেশন পেল। এর মধ্যেই নাকি ১০ ডলার ইনকাম করে ফেলছে।
সে বলল, "হিমু, তুমি তো এখন স্টার। চলো একটা কুইক কোলাব (Collaboration) করি। একটা রিলস বানাব 'হিমু বনাম রূপা'। আমি তোমার পাঞ্জাবি টেনে ধরব আর তুমি জোছনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। ভিউজ হবে মিলিয়ন মিলিয়ন!"
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। বললাম, "রূপা, আমার হৃদয়ের রিলস ত তুমি, কিন্তু এসব আমি পারব না।
রূপা রেগে গিয়ে ফোন কেটে দিল। তার পরের দিন রূপা একটা রিলস আপলোড করলো। টাইটেল ছিল "ইগোস্টিক ইনভলুয়েন্সারদের মুখোশ উন্মোচন!" সেটা আরও বেশি ভাইরাল হলো।
শেষমেশ আমি ঠিক করলাম এই সোশ্যাল মিডিয়ার ভূত তাড়াতে হবে। আমি একটা স্ট্যাটাস দিলাম:
"আমি আসলে হিমু নই। আমি মোহসিন। আমার পকেটে টাকা নেই বলে আমি পাঞ্জাবি ধুই না। আমি জোছনা নিয়ে লিখি কারণ আমার ঘরে ইলেকট্রিসিটি নেই, লোডশেডিং হয়। আর আমি যে ব্র্যান্ডগুলোর নাম নিই না, তার কারণ তারা আমায় ফ্রি-তে কিছু দেয় না। আমি একজন চরম লোভী এবং সাধারণ মানুষ।"
আমি ভাবলাম, এবার অন্তত লোকে আমাকে গালি দিয়ে আনফলো করবে। আমি মুক্তি পাব।
কিন্তু ফল হলো উল্টো। কমেন্ট সেকশনে কান্নার রোল পড়ে গেল।
"কী বিনয়! কী সততা! নিজের স্টারডম বিসর্জন দিয়ে তিনি নিজেকে সাধারণ বলছেন!"
"এই যুগে এমন সৎ মানুষ পাওয়া বিরল। এটাই হলো আসল হিমুত্ব!"
"ভাইয়া আপনার এই কনফেশন পোস্টটা পড়ে আমার চোখে জল চলে এল। আপনিই আমাদের আসল আইডল!"
ব্র্যান্ডগুলো আরও পাগল হয়ে গেল। এবার এক ডিটারজেন্ট পাউডার কোম্পানি এল। তারা বলল, "আপনি যেহেতু পাঞ্জাবি ধুয়ে পরিষ্কার করতে পারছেন না টাকার অভাবে, আমাদের কোম্পানি আপনার আজীবনের কাপড় ধোয়ার দায়িত্ব নিল। আমাদের ক্যাম্পেইনের নাম 'পরিষ্কার মন, পরিষ্কার পাঞ্জাবি, হিমুর পছন্দের ডিটারজেন্ট'।"
আমি বুঝলাম, আধুনিক যুগে রহস্যময় থাকা বা সত্য বলা কোনোটাতেই রেহাই নেই। ভাইরাল হওয়ার এই চক্র থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো ডিভাইস ত্যাগ করা।
আমি ফোনটা ড্রেনে ফেলে দিলাম। হলুদ পাঞ্জাবিটা খুলে এক ভিখারিকে দিয়ে দিলাম। সে পাঞ্জাবিটা পেয়েই বলল, "ধুর মিয়া, পকেট ছাড়া এইটা দিয়া কী করুম? মোবাইল রাখুম কই?"
আমি হাসলাম। খালি গায়ে, কোনো ডিভাইস ছাড়া রাস্তার মোড়ে দাঁড়ালাম। রাত তখন গভীর। আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ উঠেছে।
হঠাৎ একটা গাড়ি থামল আমার সামনে। কাঁচ নামিয়ে একজন লোক বলল, "আরে! আপনি তো সেই বিখ্যাত ভাইরাল হিমু না? আপনার এই নগ্ন গায়ের লুকটা তো দারুণ! এটা কি কোনো নতুন বডি পজিটিভিটি ক্যাম্পেইন? আমি কি একটা সেলফি পেতে পারি?"
আমি দৌড় শুরু করলাম। আমার পেছনে ধাওয়া করছে একদল ভ্লগার, তাদের হাতে জ্বলজ্বল করছে স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশলাইট....

0 মন্তব্যসমূহ