কাঁচের বয়াম ও প্লাস্টিকের মাছ
শহরের আকাশটা আজ বেগুনি রঙের জেলিফিশের মতো থরথর করে কাঁপছে। অবশ্য সলিম সাহেবের কাছে এটা নতুন কিছু নয়। গত তিন মাস ধরে তার কাছে জগতটা একটা ভাঙা ক্যালাইডোস্কোপের মতো মনে হয়।
সকাল আটটা। সলিম সাহেব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই বাঁধছিলেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন, আয়নার ভেতরের সলিম সাহেব তার সাথে তাল মেলাচ্ছেন না। সলিম যখন ডান দিকে ঘাড় কাৎ করছেন, আয়নার প্রতিবিম্বটা বাম দিকে তাকিয়ে গভীর বিরক্তির সাথে হাই তুলছে।
"আজকেও কি সেই নীল টাইটাই পরবেন? বড্ড সেকেলে দেখায় আপনাকে," আয়নার প্রতিবিম্বটা হঠাৎ জ্যান্ত হয়ে কথা বলে উঠল। তার স্বরে তাচ্ছিল্য।
সলিম সাহেব চমকালেন না। এই শহরের অসংগতিগুলো এখন তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। হাতের পুরনো ঘড়িটার কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘুরছে দেখেও তিনি শান্ত গলায় বললেন, "অফিসে আজ বড় মিটিং। প্রজেক্ট নিয়ে বসের সাথে বড়সড় যুদ্ধ হতে পারে। নীল রং আস্থার প্রতীক,
আয়নার সলিম উপহাসের হাসি হাসল। "আস্থা? আপনি কি জানেন না, আপনার অফিসটা আসলে একটা বিশাল কাঁচের বয়াম? আর আপনারা সবাই সেখানে প্লাস্টিকের মাছ, যারা মনে করে তারা সমুদ্র জয় করছে!"
সলিম সাহেব আয়নার সলিমকে এক পলক ঘৃণাভরে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
বাসা থেকে বেরোতেই সলিম সাহেব দেখলেন, চেনা শহরটা আজ কোনো এক পাগলাটে শিল্পীর ক্যানভাস হয়ে গেছে। পিচঢালা পথটা আর স্থির নেই; সেটা একটা বিশাল কালনাগিনী বা অজগর সাপের মতো ধীরলয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে। ফুটপাথ দিয়ে মানুষ হাঁটছে না; মানুষগুলো পাথরের মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে আছে, আর স্বয়ং ফুটপাথটাই একটা কনভেয়ার বেল্টের মতো তাদের বয়ে নিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে।
ট্রাফিক সিগন্যালে কোনো পুলিশ নেই। সেখানে একটা ব্রোঞ্জ রঙের বিশালকায় দাবার ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে, যার চোখ দিয়ে লেজার রশ্মি বের হচ্ছে। সিগন্যালে যখন নীল আলো জ্বলছে (লাল বা সবুজের বদলে), তখন নিয়ম হলো সবাইকে সমস্বরে অট্টহাসি হাসতে হবে। সলিম সাহেব দেখলেন, চারপাশের গম্ভীর ও ফ্যাকাশে চেহারার মানুষগুলো যান্ত্রিকভাবে মুখ হা করে আকাশপানে চেয়ে হাসছে। এটা এই শহরের নতুন সামাজিক রসিকতা, শোকের সময় উৎসব আর উৎসবের সময় বিলাপ করাটাই এখানে আধুনিকতা।
অফিসে ঢুকে সলিম সাহেব দেখলেন পরিবেশটা থমথমে, যেন কোনো এক মহাপ্রলয়ের প্রস্তুতি চলছে। ফ্রন্ট ডেস্কের রাবেয়া বেগম গভীর মনোযোগ দিয়ে এক কাপ চায়ের ভেতরে একদল পিঁপড়ার সাঁতার কাটানো দেখছেন। তাদের ডুবে যাওয়া ঠেকাতে তিনি পেনসিল দিয়ে বাধা দিচ্ছেন। দপ্তরী মুকুল একাউন্টস অফিসারের প্যান্টের চেইনের সাথে একটা সোনালী শিকল দিয়ে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে—নিরাপত্তার নতুন নিয়ম হয়তো!
বস, মিস্টার হক, নিজের রাজকীয় চেয়ারে নেই। সলিম সাহেব মাথা তুলে দেখলেন, বস সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আছেন এবং ল্যাপটপে অতি দ্রুত টাইপ করছেন। তার শরীরের ভারে ফ্যানটা গোঁ গোঁ করে ঘুরছে।
"গুড মর্নিং সলিম! তোমার রিপোর্টগুলোর খবর কী? তারা কি উড়তে শিখেছে নাকি এখনো তোমার মতো মাটির সাথেই লেপ্টে আছে?" বস উপর থেকেই চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন। তার টাইটা নেতাদের জিহ্বার মতো হাওয়ায় দুলছে।
সলিম সাহেব নিজের ডেস্কের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তার জমা দেওয়া রিপোর্টগুলো ছোট ছোট কাগজের নৌকা হয়ে মেঝের কার্পেটের ওপর ভাসছে। কার্পেটটা কেন জানি আজ ঢেউ খেলানো সমুদ্রের মতো নীল হয়ে গেছে।
"স্যার, প্রমোশনের ফাইলটা সই করবেন বলেছিলেন..." সলিম সাহেব নিচু স্বরে বললেন।
বস সিলিং থেকে শব্দ করে হেসে উঠলেন। "প্রমোশন? ওহ সলিম, আমরা তো এখন ‘পদাবনতি’র প্রতিযোগিতায় নেমেছি। যে যত নিচে নামতে পারবে, সমাজ তাকে তত বড় তকমা দেবে। তুমি কি এখনো সফল হওয়ার চেষ্টা করছো? কী আদিম চিন্তাধারা!"
দুপুরের দিকে সলিম সাহেবের মনে হলো তার মস্তিষ্কটা ধীরে ধীরে বাষ্প হয়ে কান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, মেঘগুলো সব বিশাল টাইপরাইটারের কিবোর্ড হয়ে নিচে বৃষ্টি নামাচ্ছে। তবে সেটা জলের বৃষ্টি নয়—অজস্র বিরামচিহ্নের বর্ষণ। কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি আর প্রশ্নবোধক চিহ্নগুলো ঝরঝর করে পড়ছে শহরের ব্যস্ত রাস্তায়। একটি ‘কমা’ এসে সলিম সাহেবের চশমার কাঁচে আটকে গেল।
হঠাৎ তার ড্রয়ার থেকে একটা ছোট বামন বেরিয়ে এলো। বামনটার পরনে রঙচঙে কোট আর চোখে তিনটে লেন্সের চশমা। কপালে একটা দাগ আছে।
"আপনার অস্তিত্বের লাইসেন্স কি রিনিউ করা হয়েছে?" বামনটা কর্কশ স্বরে জানতে চাইল।
সলিম সাহেব পকেট হাতড়ালেন। সেখানে কেবল একটা পুরনো বাসের টিকিট আর কিছু শুকনো শিউলি ফুল। "আমি তো আছিই, তার আবার লাইসেন্স কিসের?"
বামনটা মাথা নাড়ল। "ভুল ধারণা। এই সমাজে ‘থাকা’টা একটা ইলিউশন। আপনি আসলে একটা বিশাল স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক নাটকের একটি পাঞ্চলাইন মাত্র। নাটক শেষ হলে আপনার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।"
বিকেল নাগাদ শহরটা সম্পূর্ণ ভোজবাজির মতো পাল্টে গেল। সলিম সাহেব দেখলেন, তার সহকর্মীদের চামড়াগুলো ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। তাদের শরীরের ভেতরের কোনো রক্ত-মাংস নেই, আছে শুধু সস্তা দরের প্লাস্টিকের তৈরি কিছু গিয়ার আর কলকব্জা। তাদের হৃৎপিণ্ডটা একটা ব্যাটারিচালিত ঘড়ির মতো টিকটিক শব্দ করছে।
তিনি শান্ত হয়ে নিজের চেয়ারে বসলেন। তার মনে হলো, এই তথাকথিত 'স্বাভাবিক' পৃথিবীটাই আসলে একটা বড় বিভ্রান্তি। যখন যুক্তি কাজ করে না, তখনই বোধহয় মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা শুরু হয়। তিনি আলমারি থেকে নিজের ফাইলগুলো নিলেন এবং সেগুলো জানলা দিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিলেন। ফাইলগুলো সাদা পায়রা হয়ে নীল দিগন্তে মিশে গেল।
শহরের লাউডস্পিকারে ঘোষণা হলো: "আজকের মতো সামাজিক অভিনয় শেষ। দয়া করে সবাই নিজের নিজের ব্যক্তিত্বের মুখোশ খুলে ডাস্টবিনে জমা দিন।"
সলিম সাহেব আয়না ছাড়াই নিজের মুখটা একবার স্পর্শ করলেন। দেখলেন, সেখানে কোনো চামড়া বা মাংস নেই, শুধু মসৃণ এক টুকরো আয়না। সেই আয়নায় এখন পুরো জগতটা প্রতিফলিত হচ্ছে। তিনি হাসলেন, আর সেই হাসির শব্দে আকাশের জেলিফিশগুলো আতশবাজির মতো ফেটে পড়ে পুরো শহরকে রঙিন করে দিল।
নক্ষত্র সেদ্ধর ঘ্রাণ
শ্রাবণের অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে জীর্ণ টিনের চালটা যেন কোনো রণপায়ে চলা দানবের মতো শব্দ করছে। রতন রান্নাঘরের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। তার পেটের ভেতরটা দীর্ঘ অনাহারে খাঁ খাঁ করছে, যেন তার পেটের ভেতরকার ক্ষুধাটা একটা জীবন্ত নেকড়ের মতো গোঁজাচ্ছে। বাহিরে শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি বাড়তে লাগল। বাড়লে লাগল। সাথে বিজলি চমক আর বজ্রপাত। রতনের মুখোমুখি রতনের মা উনুনের সামনে বসে আছেন। চারপাশে ভেজা কাঠের গন্ধ। ঘরের চাল ফুটো হয়ে নোনা জল পড়ছে ঠিক যেখানে রতনের মা উনুন ধরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। মা যখন খালি হাঁড়িতে ফুঁ দিচ্ছেন, উনুনের ছাই থেকে আগুনের ফুলকি নয়, বেরিয়ে আসছে ছোট ছোট নীল জোনাকি। তারা দল বেঁধে ঘরের সেই ফুটো চাল দিয়ে উড়ে গিয়ে মিশে যাচ্ছে শ্রাবণের মেঘে। ঝড়োহাওয়াতে। ধীরে ধীরে মা হাসতে লাগলো। মনে হলো মায়ের হাসিতে হামাগুড়ি দিচ্ছে কয়েকটা রাজহাঁস।
"মা, চাল নেই তো কী নাড়ছ অমন করে?" তন্দ্রাচ্ছন্ন রতন ভাঙা গলায় জানতে চাইল।
মা ফিরে তাকালেন। তার চোখের মণি দুটো আজ অবিশ্বাস্য গভীর। সেখানে যেন ঘূর্ণায়মান নক্ষত্রপুঞ্জ ধীরলয়ে ঘুরছে। মা আবারো মৃদু হাসলেন। "ওরে পাগল, আমরা তো আর সাধারণ চাল খাব না। আজ আমি হাঁড়িতে নক্ষত্র সেদ্ধ করছি। সাদা নক্ষত্র। দেখিস, এর স্বাদ খেলে তোর আর কোনোদিন ক্ষুধা পাবে না।"
মা একটা কাঠের হাতা দিয়ে বাতাসের মতো হালকা কিছু একটা নাড়াতে লাগলেন।
হঠাৎ বাঁশের দরজায় করাঘাত। পাড়ার মাতব্বর হাশেম মিয়া ছাতা বগলে ভেতরে ঢুকলেন। তার ধপধপে সাদা পাঞ্জাবিতে কাদার ছিটে। তিনি অবজ্ঞার স্বরে বললেন, "কী রে রতনের মা? ঘরে তো বাতি জ্বালানোর তেল নেই, অথচ জোনাকি দিয়ে ঘর সাজিয়েছিস! বলি, গত মাসের দেনাটা কি আকাশ থেকে নামবে?"
মা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তিনি ধীরস্থিরভাবে একটা মাটির সানকিতে করে কিছু 'শূন্যতা' আর কয়েকটা নীল জোনাকি বেড়ে হাশেম মিয়ার দিকে এগিয়ে দিলেন।
নিন মাতব্বর সাহেব, খেয়ে দেখুন। এটা হলো 'উন্নয়নের নির্যাস'। এর স্বাদ কেবল তারাই পায় যাদের ভাণ্ডার উপচে পড়ছে। আমাদের মতো কাঙালদের কাছে যা অনাহার, আপনাদের কাছে তাই পরম তৃপ্তি।"
হাশেম মিয়া হাঁ করে শূন্য থালার দিকে তাকিয়ে রইলেন। রতন দেখল, মাতব্বরের মাথার ওপর থেকে একজোড়া খাড়া শিং উঁকি দিচ্ছে। চোখ তার লাল যেন টুকটুকে র্যাফ্লেসিয়া আর্নল্ডি। মাতব্বর রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। যাওয়ার সময় তার দামী রবারের জুতো জোড়া হঠাৎ কাদা হয়ে গলে গেল। তিনি নগ্নপদে কাদা মাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘরের বাঁশের দেওয়ালগুলো যেন অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল। মা রতনের পাশে এসে বসলেন এইবার। রতন খেয়াল করল মায়ের গায়ের তালি মারা সুতি শাড়িটা এখন আর সাধারণ কাপড় নেই; সেটা হয়ে গেছে আস্ত এক টুকরো অনন্ত আকাশ। শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে উড়ছে শত শত পাখি। বৃষ্টি শেষের রংধনু শাড়ির আঁচলে।
মা যখন রতনকে কাছে টেনে নিলেন, রতনের মনে হলো সে কোনো শক্ত মেঝেতে নয়, মেঘের এক বিশাল সমুদ্রের ওপর ভাসছে। ঝিরিঝিরি শব্দে কানাকানি করছে মায়ের দরদী নিশ্বাস। মায়ের গায়ের ঘ্রাণে এখন আর ঘাম নেই, সেখানে মিশে আছে ভেজা মাটির আর পারিজাত ফুলের সুবাস।
"মা, খুব কষ্ট হচ্ছে?" রতন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
মা তার কপালে হাত রাখলেন। মায়ের হাতের স্পর্শে রতনের শরীরের জ্বালাপোড়া আর খিদে যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। মা মৃদু বলতে লাগলো "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়াজজিল্লাতি, ওয়া আউজুবিকা মিন আন আজলিমা আও উজলিমা... আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা"
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু মেঘেরা এখন তাদের ঘরের ভেতরে খেলা করছে। রতন দেখতে পেল তাদের ভাঙা কুঁড়েঘরটা পৃথিবী ছেড়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। নিচে গ্রামটা ছোট হয়ে আসছে। শহরের দামী অট্টালিকাগুলো এখন পিঁপড়ের গর্তের মতো দেখাচ্ছে। ক্ষমতা আর অর্থের জন্য ছুটতে থাকা মানুষগুলোকে মনে হচ্ছে অন্ধ পতঙ্গ।
মা আকাশের চাঁদটাকে টেনে এনে কুপি হিসেবে জ্বালিয়ে দিলেন। মা এক বাটি রুপালি তরল আলো তার সামনে ধরে বললেন, "নে বাবা, পেট ভরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।"
রতন সেই আলোকসুধা পান করল। তার জীর্ণ শরীরের হাড়গুলো এখন হীরা হয়ে জ্বলছে। অন্ধকার মহাকাশের বুক চিরে তাদের ঘরটা ধ্রুবতারার দিকে ছুটতে লাগল। রতন ঘুমিয়ে গেল। মা রতনের গায়ে একটি সবুজ হৃদয়ের চাদর টেনে দিয়ে মাতব্বের বাড়ির দিকে চলে গেল..
মাহফুজ খন্দকার
বন্ধুদের নিয়ে আসলে কখনোই সিরিয়াস কোনো গল্প লেখা যায় না। কারণ, যাদের সাথে জীবনের সেরা সময়গুলো কাটিয়েছি স্রেফ প্যান্টের বেল্ট চুরি করে আর টিফিন বক্সের শেষ দানাটা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, তাদের নিয়ে সাহিত্য করতে বসা মানেই হলো নিজের ইগোকে অপমান করা। তবুও আজ একজন বন্ধুর গল্প আপনাদের বলবো।
ওর নাম মাহফুজ। মাহফুজ খন্দকার। আমার ক্লাসমেইট। ক্লাসের সবচেয়ে কালো, দীর্ঘদেহী আর এক জ্যান্ত ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’। ওর ক্লাসে ঢোকা মানেই ছিল শান্ত পরিবেশটা মুহূর্তেই সার্কাসে রূপ নেওয়া। আমাদের আরেক বন্ধু আমান ছিল ওর চিরস্থায়ী ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’। কোনো কারণ ছাড়াই আমানকে আসতে-যেতে একটা করে ঘুষি মারা ছিল মাহফুজের নিত্যদিনের ব্যায়াম। বেচারা আমান সহ্য করা ছাড়া কিছুই করতে পারতো না, কারণ মাহফুজের নামে বিচার দেওয়া মানেই ছিল নিজের ল্যাংগটা করে নাচানো।
মাহফুজের পড়াশোনায় মন ছিল না বললেই চলে। পরীক্ষার হলে সে ইনভিজিলেটরকে উল্টো প্রশ্ন করে বসত, "স্যার, আপনার চশমার পাওয়ার কত? আমি তো ছোট লেখাগুলো একদম দেখতে পারছি না!" মাঠে ও ছিল এক বিভীষিকা। বল নিয়ে যখন দৌড়াত, মনে হতো এক ক্ষ্যাপা ষাঁড় লাল কাপড় দেখেছে। আমরা যখন রেজাল্টের দিন ভয়ে কাঁপতাম, ও তখন স্কুল গেটে আয়েশ করে বাদাম চিবাত আর হাসতে হাসতে বলত, "চিন্তা করিস না, পরের বছরও আমি এই স্কুলেই আছি। তোদের সিনিয়রিটি রক্ষা করার জন্য অন্তত একজন তো লাগবে!"
আমরা সবাই টেনেটুনে স্কুল পার করে কলেজে পা রাখলাম। আমাদের গলার স্বর বদলে গেল, পোশাকে এল নতুনত্বের ছোঁয়া। কিন্তু মাহফুজের জগতটা যেন ক্লাস নাইন-এর ওই চারদেয়ালেই থমকে রইল। ও পরপর দুইবার ফাইনাল পরীক্ষা দিল, কিন্তু ফেলের হ্যাটট্রিক করা যেন ওর জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই নিয়ে ওর মধ্যে কোনো আফসোস বা হীনম্মন্যতা ছিল না। ও বলত, "আরে, সিলেবাসটা আমার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না, তাই একটু সময় নিয়ে পড়ছি।"
আমরা যখন ভার্সিটির ফর্ম ফিলআপ আর ক্যারিয়ার নিয়ে ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত, মাহফুজ তখনো স্কুলের পেছনের কড়ই তলায় বসে আমাদের জুনিয়রদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু জীবন তো আর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। হঠাৎ একদিন বাবার বদলির খবর এল। শহর ছাড়তে হলো আমার। বাক্স-পেঁটরা গোছানোর ভিড়ে মাহফুজের সেই চওড়া হাসি আর মাঠে ওর সেই দানবীয় দৌড়গুলো স্মৃতির আলমারিতে বন্দি হয়ে গেল। ধীরে ধীরে ব্যস্ততা আর নতুন শহরের নতুন মানুষের ভিড়ে মাহফুজের সাথে যোগাযোগটা আলগা হয়ে এল। মাঝে মাঝে মনে হতো, ও কি আজও সেই টেনের ক্লাসরুমেই বসে আছে?
দীর্ঘ সাত-আট বছর কেটে গেল। আমি এখন জীবনের এক যান্ত্রিক গলি দিয়ে হাঁটছি। একদিন হুট করেই পুরনো সেই পরিচিত অবয়বটার দেখা পেলাম এক নির্জন রাস্তার মোড়ে। দেখলাম, সেই দানবীয় চেহারার মানুষটা আজ বেশ রোগাটে হয়ে গেছে। রাস্তার এক কোণে বসে পরম মমতায় একটা নেড়ি কুকুরকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছে। সামনে গিয়ে ডাক দিতেই ও চট করে তাকাল। চোখের সেই চঞ্চলতা এখনো মরেনি। আমাকে দেখেই সেই পরিচিত বাঁকা হাসি দিয়ে জড়িয়ে ধরল। "কিরে, আমাকে কি ভুলে গেলি?" ওর গলার স্বর আগের চেয়ে ক্ষীণ, কিন্তু আন্তরিকতায় কোনো কমতি নেই। ও নাছোড়বান্দা হয়ে আমাকে নিজের বাড়িতে টেনে নিয়ে গেল।
ওর বাড়িতে পা রাখতেই আমার মনে হলো আমি কোনো লুইস ক্যারলের ফ্যান্টাসি গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। ড্রয়িংরুমের দেয়াল জুড়ে সারি সারি ঘড়ি, কিন্তু কোনোটারই সেকেন্ডের কাঁটা নেই। শুধু মিনিট আর ঘণ্টার কাঁটাগুলো একেক দিকে মুখ করে নিথর হয়ে আছে। ঘরটায় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
আমি হেসেই জিজ্ঞেস করলাম, "কিরে, ঘড়িগুলোর সব হার্ট অ্যাটাক হয়েছে নাকি?"
ও ওর সেই পরিচিত হাসিতে উত্তর দিল, "সময়কে থামিয়ে দেওয়ার এটা একটা নিনজা টেকনিক। দেখ, আমি যদি সময়কে না দেখি, তবে সময়ও আমাকে খুঁজে পাবে না। আসলে আমি আর সময় এখন লুকোচুরি খেলছি।"
কথাগুলো শুনতে মজার মনে হলেও ওর গালের হাড়গুলো বড্ড বেশি উঁচু হয়ে উঠেছিল। মাহফুজ জানালো, ওর ভেতরে এখন একদল ‘অদৃশ্য এলিয়েন’ বাসা বেঁধেছে। ওরা নাকি ভেতরে ভেতরে একটা বড় শহর বানাচ্ছে, আর সেই শহর বানানোর জন্য ওর শরীরের পুরনো ইট-সুরকিগুলো খুলে নিয়ে যাচ্ছে।
এরপর ও আমাকে বারান্দায় নিয়ে গেল। সেখানে কোনো ফুল বা ফলের গাছ নেই, তার বদলে সারি সারি রঙ-বেরঙের ছাতা উল্টো করে রাখা। আমার অবাক চাহনি দেখে ও বলল, "বৃষ্টি পড়ার জন্য ছাতা লাগে না রে, আকাশ থেকে যখন রঙের ফোঁটা পড়ে, তখন এগুলো লাগে। জানিস, ইদানীং আমি রাতে যখন ঘুমাই, দেখি আমার বিছানাটা একটা বড় নীল তিমির পিঠ হয়ে গেছে। আমি সারা রাত সমুদ্রের নিচে ঘুরে বেড়াই।"
ওর দুচোখে একটা অদ্ভুত ঘোলাটে আলো। ও হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, "বল তো, আমি এখন তোর সাথে কথা বলছি নাকি আমার ছায়াটা কথা বলছে? মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আসল আমি ওই পুরনো ক্লাসরুমে এখনো ফেইল করে বসে আছি, আর এই যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, এটা স্রেফ একটা প্রজেকশন।"
এর মধ্যেই এক প্রতিবেশী এলেন ওকে দেখতে। হাতে আধ ডজন ডাব আর মুখে ‘ইশ’ মার্কা করুণার ছাপ। লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ইস, ছেলেটা সোনার মতো ছিল। এমন অসুখ কেন যে হয়! ডক্টর কী বলেছে? স্টেজ কত?"
মাহফুজ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সোফায় আয়েশ করে বসল। বলল, "ডক্টর বলেছে আমি আসলে ডাইনোসর হয়ে যাচ্ছি। স্টেজ হচ্ছে ‘জুরাসিক পার্ক’। আচ্ছা চাচা, আপনার মাথায় তো বেশ ঘন চুল, আমাকে কয়েকটা ধার দেবেন? আমি তো ভাবছি সামনের সপ্তাহ থেকে আমার মাথাটাকে একটা সোলার প্যানেল হিসেবে ইউজ করব।"
লোকটা যখন হাঁ করে তাকিয়ে আছে, ও আরও এক ধাপ এগিয়ে বলল, "চাচা, ডাবের পানি খেলে কি অদৃশ্য হওয়া যায়? ভাবছি আর কদিন পর আমি যখন দেয়াল দিয়ে হেঁটে যাব, তখন আপনাকে একটা ভয় দেখাব।" লোকটা ‘তাড়া আছে’ বলে এমনভাবে পালালেন যেন পেছনে কোনো ভূত লেগেছে। মাহফুজ খিলখিল করে হেসে উঠল। "দেখলি? মানুষ নিজের মৃত্যু দেখছে প্রতিদিন, অথচ অন্য কারো বিদায়ের ঘণ্টা শুনলেই তাদের হার্টবিট বেড়ে যায়।"
সন্ধ্যায় বিদায় নেওয়ার আগে ও ওর মাথার টুপিটা খুলল। জানালার চাঁদের আলোয় দেখলাম, সেই একমাথা কোঁকড়া চুল আর নেই। পুরো মাথাটা একদম মসৃণ এক সাদা মুক্তোর মতো। ও হাসতে হাসতে বলল, "দেখ, জিরো মেইনটেইনেন্স! আমি আসলে মহাকাশচারী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। চুলে অনেক ওজন থাকে, তাই বিসর্জন দিয়ে একদম হালকা হয়ে গেলাম....
আমি আর কথা না বাড়িয়ে তাকে বিদায় দিয়ে চলে আসলাম। ফেরার পথে পেছে তাকিয়ে দেখলাম আমার পেছনে ছুটে আসছে মাহফুজের বন্ধ করে রাখা ঘড়িগুলো...
0 মন্তব্যসমূহ