প্রেক্ষাপট: বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন। রাষ্ট্রপতি ও উপাচার্য উপস্থিত। বিশেষ বক্তা হিসেবে মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন হিমু।
বক্তৃতা শুরু:
“ধন্যবাদ সঞ্চালক মহোদয়। আপনি আমাকে বিশেষ বক্তা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কিন্তু বিশেষ বিশেষণটি আসলে একটি বর্জনমূলক শব্দ। যখন আপনি কাউকে বিশেষ বলেন, তখন আপনি পরোক্ষভাবে বাকিদের সাধারণ বলে অপমান করছেন। এই যে কয়েক হাজার ছাত্র এখানে বসে আছে, তারা কি সাধারণ? হেগেলের ভাষায় বললে, তারা সবাই একেকটি সাবজেক্টিভিটি বা বিষয়ী।
আপনারা দ্রুত শেষ করতে বলেছেন। বলেছেন সময় কম। কিন্তু সময় কি কোনো ভাড়ার বস্তু যে আপনি আমাকে মেপে দেবেন? সময় তো একটা ধারাবাহিকতা। আমরা যাকে প্রেজেন্ট বা বর্তমান বলি, সেন্ট অগাস্টিন প্রমাণ করে গেছেন যে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ আমি যেই মুহূর্তে বলছি বর্তমান, সেই মুহূর্তটি অতীত হয়ে যাচ্ছে। তাহলে আপনারা আমাকে কোন সময়ে কথা বলতে দিচ্ছেন?
যাইহোক, আজ আপনারা সার্টিফিকেট নিচ্ছেন। ল্যাটিন শব্দ ‘সার্টিফিকেটাম’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ হলো সত্যতা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই কাগজ কি আপনার জ্ঞানের সত্যতা নিশ্চিত করে? আহমদ ছফা একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে একেকটি শিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানা।’ উনি একেবারে সঠিক বলছেন। জয় ছফা ভাইয়ের জয়।
আপনারা আজ কালো গাউন পরেছেন। এই যে গাউন, এটি মূলত ইউরোপীয় যাজকদের পোশাক। আমরা ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হয়েছি বলে দাবি করি, অথচ মস্তকে বহন করছি সেই ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া একাডেমিক রিগালিয়া’। ফ্রাঞ্জ ফ্যানো তার দ্য রেচেড অফ দ্য আর্থ বইতে পরিষ্কার বলেছেন যে, মানসিকভাবে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা একটা প্রহসন মাত্র।
এই মঞ্চে আমার বাম পাশে যিনি বসে আছেন, তিনি একজন বড় বিজ্ঞানী। তিনি আমাকে একটু আগে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি শেষ করুন।’ বিজ্ঞানের এই যে গতির প্রতি মোহ, এর শুরু হয়েছিল নিউটন থেকে। কিন্তু আইনস্টাইন এসে তো ল্যাজেগোবরে করে দিলেন। তিনি বললেন, আলো বাঁকা হয়ে চলে। আমি তাকে প্রশ্ন করতে চাই, সত্যও কি আলোর মতো বাঁকা হয়ে চলে?
আমি যখন মুহসিন হলে থাকতাম, তখন আমার এক বন্ধু ছিল যে সারাদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা দেখত। আমি তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কী দেখছ?’ সে বলল, ‘নিজেকে দেখছি।’ আমি তাকে বললাম, ‘তুমি যা দেখছ তা তো ইমেজ বা প্রতিবিম্ব মাত্র।’ জাঁক লাকাঁ এই পর্যায়টাকে বলেছেন মিরর স্টেজ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও এখন সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে কেবল নিজের ইমেজ দেখছে, নিজের সারবস্তু বা রিয়ালিটি চিনতে পারছে না।
আপনারা আমার মাইকটা কি একটু ভলিউম বাড়িয়ে দেবেন? শব্দবিজ্ঞান বা অ্যাকোস্টিকস অনুযায়ী, শব্দ যখন নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নামে, তখন তা অর্থহীন গুঞ্জনে পরিণত হয়। এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এতদিন আমরা পড়াশোনা করলাম এই পড়াশোনার অবস্থাও তাই। এখানে চিৎকার অনেক, কিন্তু আলাপ নেই।
(সঞ্চালকের ইশারা: আপনার সময় শেষ)
সময় শেষ? আচ্ছা, আমি বসে পড়ছি। কিন্তু বসে পড়া মানেই তো থেমে যাওয়া নয়। গ্যালিলিও যখন চার্চের ভয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন, তখনো তিনি বিড়বিড় করে বলেছিলেন, ‘E pur si muove’—তবুও পৃথিবী ঘোরে। আমিও বসে পড়ছি, কিন্তু আমার চিন্তার চাকা তো ঘুরছে। সেই চাকা থামানোর ক্ষমতা কোনো সমাবর্তনের প্রোটোকলের নেই।”
(অতঃপর হিমু ধীরস্থিরভাবে নিজের আসন গ্রহণ করলেন এবং হলরুম জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো।)

0 মন্তব্যসমূহ