শামুকের মার্জনা
আলতো ভ্রমে মুখোমুখি
স্রোত ও মহামারি—
প্রতিশ্রুতিহীন সাঁতারু মূর্ছনা;
চাঁদের চেরাগ ঘষে ঘষে হুমড়ি খেয়ে পড়ে
অনাদরণীয় অহেতুক যাপন।
অথচ কে পায় কার ক্ষয়,
স্বীকৃত তাড়না, মেঘবালিশ রেখে যায়
কার নিছক মর্ম স্বীকারোক্তি।
বিষণ্ণ উজানমুখীর জৈব স্মৃতি
রেখে আসি জৈনিক শোকে,
কিঞ্চি তুলে রাখি পরাহত আয়ুর শূন্যতায়...
এ'সমস্ত কিছু মাড়িয়ে
নিবিড় শুশ্রূষায় যদি পাই হতচ্ছাড়া
পরাশ্রিত সমুদ্রগীত, বিস্তৃত হৃদয়
ছিঁড়তে
ছিঁড়তে
শুনে নিব অনাথ শামুকের লুকায়িত মার্জনা।
একটি ধূমপায়ী কবিতা
একটা ঘোড়দৌড়ের ভেতর
সোনালু পাতা নিয়ে
ভিড়ে যাচ্ছে নীলরঙা নৌযান—
তারকাখচিত আগ্রহী উনুন
পোড়া ডিমভাজির ভেতর
তাকিয়ে থাকে সম্মতির বৈধতায়।
বিসমিল্লাহ মোড় হতে
একাগ্র নিম্নচাপ এসে ঝুলে আছে
অনিমেষ নাবিকের মতো।
আমি কিংবা আমরা—
নিঃসঙ্গ ফেরেস্তাদের মোহে
পালক হয়ে ঝড়ে পড়ি, লাগামছাড়া।
প্রসঙ্গের বাইরে ভাষা ও নিরবতার
শাসনে জীয়নকাঠি
কতটুকু ছুঁয়ে দেয় মিথ?
ঋতুস্নানে নীল হয়ে ওঠে বিদিত সারগাম।
এই তো—
মহাকালের শুকনো পাতার মর্মর
রোদ মেখে শুয়ে পড়বে
সুশীল সংযমে
সাক্ষাৎকার
একটি বৃক্ষের সাক্ষাৎকার নিতে
এগোতেই বহনে আনতে হলো
নিজের জীবনবৃত্তান্ত—
যেন অস্তিত্বের বহুকালের
স্তরভেদী নথি,
যার প্রতিটি বাক্য শেকড়ে জমে থাকা
প্রাচীন অক্ষরের মতো কঠোর ও গভীর।
সেখানে দিনযাপন একেকটি বলয়,
নিঃশ্বাস একেকটি অরণ্যের বিধি,
আর জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত
সব প্রশ্ন
নিঃশব্দ নাবালক পাতার আড়ালে
একতেই উত্তরের মতো
ঝুলে আছে।
সাপ্তাহিক ছুটির কবিতা
নাই-নাই করে নাই হয়ে গেল সমস্তকিছু।
দৃশ্যত বেদনারা ঝুলে রইলো প্রাগৈতিহাসিক
সুতোর সংসারে,
নাশপাতিসকাল পেরিয়ে ইদানীং ভুলে যেতে হয়
শ্বাশ্বত হাহুতাশের গূঢ় আয়াত;
দৌড়োতে হয় যত দূর, ততবারই গিলতে হয়
চাঁদের কৌঠা-ভর্তি সর্বনাশী অট্টহাসি।
স্মৃতিরা গান বেঁধে যায় তেঁতুলতলায়—সবিনয়ে
মরা নদী রেখে গাঙচিল উড়ে যায় অন্যত্র ~
গ্র্যাজুয়েট বেকার বন্ধুটার মতো
রাত্রির মন্থর হাওয়ায়
নাই হয়ে যায় হতশ্রী নিদ্রা...
উদাসিনী ঝিরিপথের মতো
একা হতে হতে একা হয়ে যায়
মায়াসমেত কান্নার প্রবাহ..
কি'যেন নাই-নাই করে রিক্ত হয়ে গেল শনিবারের
সাপ্তাহিক ছুটির গৃহস্থ-সুখও—
বৃক্ষ
তোমার হৃদয়ের অনামা শূন্যে
আমার অনুরূপ যে সবুজ বৃক্ষটি ঝিমিয়ে আছে,
তাকে দুই ফোঁটা জল দান করো—
নচেৎ সমস্ত নীরবতা ভেঙ্গে
নির্বাক বোকাটি
একদিন হঠাৎ শুকিয়ে মরবে ছটফটিয়ে।
তোমার নিরাকার মনস্তাপে
সে সবুজ বৃক্ষ এখনও স্থির,
তাকে লিখে পাঠাও প্রেমপন্থী জোনাকি
আচ্ছাদি চিঠিপত্র,
লিখে পাঠাও ঘর-সংসারের আহ্লাদ...
অ্যান ইনার জার্নি
একটি কালো গোলাপের জীবন শুকতে শুকতে
কাটিয়ে দেওয়া সবুজ হৃদয় তোমার,
আমাকে দাও, আমাকে দাও।।
অনাহারীর ক্লান্ত বাতাসে
অরণ্যের মিছিলে
সাঁতরাতে থাকা
বেখেয়ালি
বিনিদ্র চোখ,
আমাকে দাও,
আমাকে দাও।।
আমি প্রচন্ড সম্ভাবনাময়—
আমাকে দাও, শীত শীত বিমর্ষতার ছোঁয়া,
তোমার চিবুকের সুদান,কাশ্মীর,প্যালেস্টাইন।
আমাকে দাও, তোমার নোটপ্যাডের খরস্রোতা নদী।
দাও— তোমার তাবৎ হাসির মাঝে অন্তর্হিত মহামারি।
আমাকে দাও তোমার বিপন্ন ট্র্যাডিশনাল সন্ধ্যার
'অসহায়ত্ব থেকে ঈশ্বর পর্যন্ত ম্যারাথন দৌঁড়।
আমি ও ক্ষুধা
খোদার কারাগারে বসে আছি
আমি ও ক্ষুধা—
কে আগে পাবে মুক্তি?
এসব ভাবতে ভাবতেই
শীতঘুমে হারিয়ে যাচ্ছি আমরা।
পৃথিবীর তিনভাগ জল
আমাদের হৃদয়ের কার্নিশে।
আমাদের প্রদক্ষিণ করছে
পিঁপড়ের দল, মর্মায়িত শূন্য থালা,
আর প্রেমিকার কুহেলি চিঠি।
আকাশের খরস্রোতা চাঁদের নদী থেকে
বিমূর্ত রাজহাঁস ছুটে আসছে
আমাদের চোখের অনাহারী গ্রামে।
আমাদের নাসারন্ধ্রে ভাত ও সঙ্গমের ঘ্রাণ;
আমাদের আয়ুর ভেতর লুকিয়ে থাকে
সাঁওতালী কুমারীর অবিনশ্বর সংসারী ব্যথা।
হাজারো গেরস্থ দুয়ার,
অনাবাদি হৃদয়, সমুদ্রগীত,
আরব্য রজনী—সব ঘুরে এসে
বেদুইন আমরা
বন্দি খোদার কারাগারে।
আমি ও ক্ষুধা—
কে আগে করবো পুলসিরাত পার—
এ ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ছি
পিপাসু অন্ধকারে।
আলস্ট্রোমেরিয়া, তুমি
শীতঘুমের পোতাশ্রয়
ছুঁয়ে একটা ভাঙ্গা নৌকা
মিলিয়ে যাচ্ছে কুহেলিকার বিভ্রম-শাসনে
অবাধ একজোড়া লাভবার্ড বাটোয়ারা
করছে—লুসিফার আকাশ, মেঘবালিশ।
সেসব দৃশ্যের ক্ষয়ে, তোমাকে দেখছি
তুমি বসে আছো, ফিকে হাওয়ার নির্বাক
লাজুকতায়; আলতারাঙা উচ্ছ্বাসে,
আলস্ট্রোমেরিয়ার
রুহে।
ওরা কারা
সুখশাস্ত্র ভুলে গিয়ে ওরা আসে, ঘরে এসে
দাঁড়িয়ে থাকে, বসতে বললে শুইয়ে পড়ে
বিকলাঙ্গ হৃদয়ের বিছানায়, অটিজমক্রান্ত
দিনলিপিতে ওরা রেখে যায় মদের বোতল,
যেখানে প্রফুল্লতার প্যানথারে সজ্জিত হয়ে
সাঁতরায় বিষণ্ণ নর্তকী, চোখ ধাধানো অর্গানিক
ঘুমের ভেতর কিউরিওসিটি রেখে ওরা সঙ্গম
করে হারিকেনের নিভু নিভু নস্টালজিয়ার সঙ্গে।
ওরা মনে করে মানুষের হৃদয় মৃত প্রজাপতি,
চোখ ডুবে যাওয়া নৌকো আর দুর্দিন ঈশ্বরের
অট্টহাসি। কালক্রমে ওরা শৈশবের লাল অশ্বের
স্মৃতির মতো কাতর হয়ে উঠে, হয়ে উঠে মৌসুমি
জ্বরে মায়ের জলপট্টির তর্জমা, থার্টি-ফাস্ট নাইটের
পাখিদের জানাযা, দাদার কবরের মতো প্রাগৈতিহাসিক।
ওরা, ওরা মূলত কারা?
কল্পনায়-জল্পনায়- বাস্তবতার দর্পনে-দর্শনে
শুয়োরের ধর্মের মতো শুধু খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে
ডেইট ওভার জীবনে...
ঋতুচক্রের গোলাপ
আমার বাগানে
একটি লোভনীয় গোলাপের জন্ম হয়েছে—
চেরির মতো টুকটুকে লাল।
গোলাপটির শৈশব শেষ হতে হতে
তোমার বয়ঃসন্ধি পার হয়ে যাবে,
ততদিনে দু-একটা প্রেমে পরাজিত হয়ে
তোমার চোখের জল
চলে যাবে সিন্ধু ও গা ছমছম নীলিমায়।
গোলাপটি কিশোরী হলে
তুমি হয়ে যাবে অন্যের বিছানার ঝরা পাতা—
হৃদয়ে বয়ে নেবে যুদ্ধকালীন ফিলিস্তিন।
এরপর, ঋতুচক্রে
গোলাপটি নিজের লালকে আরও ধারালো করে
কিশোরী থেকে যুবতী হবে,
তুমি হবে গোরস্তানের নিছক মহাপাপী রজনী।
আমি তখন পাহাড়সম ব্যর্থতার দায় নিজের
হৃদয়ে তুলে নিয়ে গোলাপটি
রেখে আসব ভাষাহীন রক্তজবার নীড়ে...
যাত্রাপথে
পোয়াতি সন্ধ্যার পাথুরে হৃদয় নিয়ে এগোই আমরা—পাঁচজন।
অরণ্যের আগত ভবিষ্যৎ আমাদের চোখে জমিয়ে তোলে
সামুদ্রিক লবণের আকাঙ্ক্ষা, মানিব্যাগ-ভর্তি অন্ধকারের
ফিলোসফির ভেতর দিয়ে শীতের আহুতি ডাকে আমাদেরকে।
আমরা যাবো—
পূর্বপুরুষদের কুসুম-কুসুম বিকেলের কাছে, হরিতকী গাছের
ফাঁক দিয়ে ছুটে আসা বিমূঢ়তার রেশমি আঘাত পেরিয়ে;
হাহুতাশ পাহাড়ি জীবনে পুষে তুলবো মায়েদের আদর,
ললাটচুম্বন, লাকড়ির পাশের নীরবতা। বাবাদের অফিসগামী
অনাথ বুকপকেটে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ফিলিস্তিন—
আমরা স্বাধীন করে দেব কোনো প্রজাপতি কিংবা মৌমাছির
ভাবালুতার গানে। আমরা পাঁচজন— যাপিত যাপনের
অনতিদূরের বিষণ্ণতা ভুলে গাইবো মহীনের ঘোড়াগুলি;
হৃদয়ে দৌড়াতে থাকা বিষাদগ্রস্ত হরিণগুলো আজ
আপেক্ষিক— প্রগাঢ় রাত্রির চলতি পথের হাওয়ায়।
আমরা পাঁচজন— প্রতিজন— একেকজন—
নতুন নতুন বৃক্ষের আহ্লাদ;
রেলস্টেশনের বিলাপঘরের ছায়ায় রেখে আসবো
জীবদ্দশার সমস্ত মৌসুমী জ্বরের উত্থান।
প্রবঞ্চনা
মিথ্যেবাদী রাখালের মতো
তুমি প্রেমের গল্প শোনাও
আমি নাবালক ঘাস—
চুপচাপ শুনি।
এরপর—
রাত্রি আসে, রাতচরা পাখিরা আসে
বড়ই গাছের নীরবতার ভেতর দিয়ে
তাকিয়ে থাকে পাহাড়সম প্রৌঢ় দুঃখ,
কবুতরের মতো তরতর কাঁপে উদাস
ভ্রম, কাগজের নৌকার মতো আকাশের
শিয়রে ভেসে যায় মেঘপল্লী, জন্মসূত্রের
হাহাকার, বিষণ্ণগীত।
মিথ্যেবাদী রাখালের মতো
তুমি ভালোবাসার গল্প শোনাও,
আমি নাবালক ঘাস,
গল্পগুলো সঞ্চয় রাখি ধূসরায়িত চাঁদের বয়ামে...
আমরা যারা জোকার
আমরা যারা পালাতে পারি না
জীবনের আদিমতম দুঃস্বপ্ন হতে,
তাঁরা ঝুম শ্রাবণের দখিনা হাওয়ায়,
মুহুমুহু নিবিড় মূর্ছনার কাছে যাই।
করুণ-বিমূর্ত-মৌন-
নিঃসঙ্গ খালি মদের গ্লাসের মতো
কতো কতো মূর্ছনা
আমাদের শীতল করে রাখে
অশ্রু বিজড়িত রাত্রির ক্লান্তিসজ্জায়।
আমরা যারা পালাতে পারিনি
মা ও প্রেমিকার নুপুরগীত হতে
তাঁরা সবাই নাজুক নাজুক মিহি
মূর্ছনায় গা এলিয়ে বসে থাকি
বিপন্ন অন্ধকারাচ্ছন্নে- নিভৃতে
কালক্ষেপ
কতটুকু আর করবে লাঞ্ছিত?
সংকটময় মূকাভিনয় থেকে উঠে আসবে
কি কতিপয় জারুলফুলের বিষণ্ণ সারাৎসার?
দুর্ভিক্ষের শিথানে ক্রমাগত আরো দীর্ঘ হওয়া
থৈ থৈ নীলনদ কতটুকু শেখাবে অনাগত
আয়ুর ব্যর্থ অভিধান?
কতখানি—উত্থান-পতনে গ্যাছে
হৃদয়ে হামাগুড়ি দেওয়া নবজাতক
সবুজ-সবুজ দুধভাতের হাসি।
আমি—সন্ধ্যাতুর হাওয়ায় বয়ষ্কা নাইজেল,
ইতস্তত বসে থাকি নিষ্পাপ বৃক্ষাদির ছায়ায়।
রাত্রির ডানা ঝাপটে খিড়কি খুলে
আশ্রয়হীনতার বাহাদুরি,
এঁকে ফেলে নাদান, চকচকে মৃত্যুর ছক।
তবুও আমি—আম্মার হাতের দুনালা
পান্তাভাতের আর্জি, নীলচে দৃশ্যের আবরণে
গন্তব্যহীন শীতকালীন পক্ষী,
কিংবা
বিপরীতমুখী এক ডেসপারেট স্বীকারোক্তি।
আমাকে আর কতটুকু লাঞ্ছিত সঞ্চয় করাবে
যুবতী কর্ণফুলীর উজান? কতটুকু আর
উত্থান-পতনে যাবে লেবুপাতার সুগন্ধি সংসার,
রেশমি আদর, নিরবধি সাপলুডুর জীবন...
হাইওয়ে
তোমার আমার মাঝখান বেয়ে একটা
সুদীর্ঘ হাইওয়ে চলে গেছে; তার ধারে
নিস্তব্ধ সবুজ অরণ্যের গহনা—ছড়িয়ে
আছে নীল-নীল মার্বেলের মতো। একটা
শুভ্র কবুতর চোখের বৈয়মে শ্রাবণকাল
জমিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই হাইওয়ের রংরুটে।
যিশুকাল থেকে এক দুঃখী জেসাস, বিরমাহীন
কচ্ছপপায়ে, হাতে মৃত্যুর বাইবেল নিয়ে
হাঁটছে—হাঁটছেই সেই হাইওয়ের পিছুপিছু।
নর্তকী রাতে ক্ষুধা ও একাকিত্বের সঙ্গে সহবাস করা
একটা অভিলাষী বটবৃক্ষ
কিছুক্ষণ আগেই উপচে পড়েছে হাইওয়ের অন্ধকারে,
যাকে দেখতে হুবহু আমার হৃদয়ে দৌড়াতে থাকা
হাহাকারজনিত হরিণের মতো।
তোমার আমার মাঝখান দিয়ে যে হাইওয়ে চলে গেছে,
সে হাইওয়ে আমাদের নিয়ে গেছে
দু'টি পৃথক ঋতুর গানের বিভ্রমে...
জ্ঞানাঙ্কুর
নিষ্পাপ বৃক্ষের হাহুতাশ তোমাকে চেনে—
তোমাকে চেনে
ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ হওয়া শীত রজনীর বিপন্নতা,
অস্থির
স্থির
পার্থিব পথের কলুষিত
সর্বত্রগামী পরাজয়।
আমি কিঙবা আমাদের
অপ্রীতিকর সম্ভাবনা
অন্যথায় ধরো প্রীতিকর ভ্রান্তিবিলাস,
ঘর ও আম্মার পালিত বিদীর্ণ ডানা,
আক্ষেপ সমেত পঞ্চমুখী তাচ্ছিল্য,
প্রসঙ্গের ভেতরে অথবা বাহিরে
যে হাইওয়ে ধরে একটা ঋতু চলে যায়
বিরহী গানের মতো—
সেও তোমাকে চেনে।
তোমাকে চেনে
বন্দি পায়রাদের বিবিধ দৃশ্যত কান্না
নিশিদিন ছায়া নর্তকীর ইয়ার্কি,
হৃদয়ের কুসুমপুরের অনুক্ত দুপুর
তোমাকে চেনে-প্রেমের চেয়ে অধিক উদাসিনতা,
পুঁজিবাদী নীরসতা, বিবাহ পূর্ব ও পরবর্তী যাপনের হতশ্রী কাতরতা।
রাজনীতিবিদ
ঘুম থেকে উঠে দেখি পাহাড়ের হৃদয় বেয়ে
নেমে যাচ্ছে গত সন্ধ্যা; সমুদ্র চিৎকার।
বিছানার পাশে পড়ে আছে সুজিপানার
মতো ছোট ছোট নভেম্বর রেইন। গতরাতে
বাহিরের ঘরে বসিয়ে রাখা নিমগ্ন ক্ষুধা ও দুঃখরা
এখন আশ্রয় নিয়েছে আমিষ-নিরামিষহীন রান্নাঘরে।
পিঠে বয়ে নিয়ে বেড়ানো আস্ত দীঘি ও কয়েকটা
কামরাঙা গাছ গুনে গুনে পা ফেলছে শীতকালের
শ্বেত নর্তকীর দিকে। গতরাতে ঘুমানোর আগেই
আমাকে ঘুম পাড়িয়ে চলে গেল যেসব শামুকের দল,
তারা এখন আমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় দাঁড়িয়ে
রাজনীতিবিদ হয়ে যাচ্ছে।
শীত আগামনী কবিতা
চলে এসো শীত
কোনো ধরণের সমঝোতা করো না
জাফরান হৃদয়ের সাথে,
চলে এসো শীত
মৃত্যুর দিন এগিয়ে আসার আগে,
চলে এসো শীত
আমার ব্যালকনিতে মন খারাপের
পাখি আছে দাঁড়িয়ে।
(বছরের প্রতিটি রাত্রির রং এক- ভিন্ন হয় শীতে)
স্বীকারোক্তি
তোমার মন খারাপের রাতে কত কি না বলে থাকি,
কত সূরা হাদিস বলে কাফের থেকে মুমিন হয়ে উঠি
বলি আরব, ফিলিস্তিন, আকসা কতটা ভালবাসি।
বলি আয়ুর সমস্ত আফসোস, চোখের নস্টালজিক
স্মৃতিতে জমা অগণিত কত পীড়া, লঘু শীতের কুয়াশায়
বন্ধুদের চলে যাওয়ার প্রথা। তোমায় শোনাই—
শুকনো নদীর মতো মানিব্যাগের হাহাকার,
একাকি মায়ের বেলুচিস্তান-সদৃশ বিষণ্ণতা।
বলি—দুপুরে ভাতের বদলে খেয়েছি অর্ধ রুটি,
মিছিলে দেখেছি কতগুলো ব্যানার প্ল্যাকার্ড ইত্যাদি ইত্যাদি—
তোমার মন খারাপের রাতে তোমাকে জানাই—
ফ্যাসিবাদি হাসিনা সরকার বাবার কবর নিয়ে
কতটা করেছে খামখেয়ালি, জানাই— ক্লান্ত পাতার
মতো কতদিন ঘুমোতে পারেনি মায়ের রেশমি বৃক্ষছায়ায়।
তোমার মন খারাপের রাতে— কত আবোলতাবোল বকতে থাকি,
কত মন খারাপের কথা— তোমার মন খারাপের উঠোনে বসিয়ে রাখি।
প্যারালাইজড জীবনী
একটি আসি-আসি শীতকালে
একটি সাবলীল রাত্রি হারিয়ে যাচ্ছে,
সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের হ্যাংগারে
ঝোলানো দুধভাতের চাঁদ।
চিরকালীন শূন্যতায় ভিখিরির মতো
হাত পেতে আছি সার্কাসগামী নিঃসঙ্গপন্থায়,
মহীনের ঘোড়াগুলি আর গুছগুচ্ছ শুকনো নদী
ঢুকে যাচ্ছে ব্লুটুথের ভেতর।
একটি আসি-আসি শীতকালে
বেহুদা বাতাসে—সবিনয়ে—দ্বিধাহীন
ছিঁড়ে যাচ্ছে তোমার জণ্ডিস আক্রান্ত শাড়ির
অধিকাংশ ফুল, আনঅথোরাইজড সমস্ত আর্তি।
একটি আসি-আসি শীতকালে চোখের গিঁট
খুলে দিলেই গড়িয়ে পড়ছে ঝর্ণার শ্বাসনালী,
প্যারালাইজড জীবনী।

0 মন্তব্যসমূহ