হাসান আফীফের কয়েকটি কবিতা


 

১.প্যারিস দাশ রোড - ২০১

প্রিয় রেহনুমা। 

প্যারিস দাস রোড —২০১। আমরা যেতাম কলেজপালানো পাখি। মনে পড়ে হুমায়ুনের বই,নীলশাড়ি। মনে পড়ে অগোছালো চুল, হলুদ পাঞ্জাবী। আমরা ছিলাম একই শহরে,একই রাস্তায়।

একই ল্যাম্পপোস্টের নিচে,শ্বাস ছাড়ছি অনুকূলরুপে ; একই ফজরের আজান - সেই কাঁপাকাঁপা স্বর।

একই মাইকে এলান হচ্ছে মৃত্যুশোক —

তবুও আমরা অনেকদূর, মনে পড়ে যায় সেই দিন।

হৃদপিণ্ডে জোড়া লেগে আছে রেডিয়ো এক্টিভিটি 


ইদানীংকালে তোমার চেহারা ভুলে যাচ্ছি; চশমার কাচের মতোন ঘোলাটে লাগে তোমার চেহারা। 

যেন তুমি বইয়ের মলাট;চোখ ধাধানো বিদির্ণতা।

বুঝতে গেলে কালো চিল গিলে নিচ্ছে মগজ, চোখ জুড়ে ভাসছে রেনেসাঁর কালোজামা।

ভাবতে গেলে ডুবে যাচ্ছি কালোপানির সমুদ্রে —

এখানে গ্লাসে গ্লাসে মৃত্যু আর আঁধার পাওয়া যায়। 


রাত গভীর হলেই —

পিয়নের সাইকেল থেমে যায় উঠোনের শিউলিগাছ তলায়;

সবুজবীথি হয়ে যায় জানলার কাচ — সবুজ সবুজ তরঙ্গে ভেসে আসে মিশর থেকে কায়কোবাদের গান।


এইতো সেদিন মৈমনসিং গেলাম।

মুমিন্নেসার পকেটগেটে বসে সিগারেট খেলাম।

বহুদিন কবিতা লিখতে পারছি না, সেদিন অনশনে লিখে ফেললাম তোমার নোলক, নীল শাড়ি, 

টলমলে মার্বেল আকৃতির দুটো চোখ  — দুলতে দুলতে আসা আমার প্রথম প্রেমিকার প্রতিচ্ছবি।


ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে যতো ডিঙিনোকা ভিড়াচ্ছে ;মনে হচ্ছে সব'কটা নৌকায় করে চলে যাচ্ছে রেহনুমা খানম।

রাত গভীর হলেই মুমিনুন্নেসার কথা মনে পড়ে। প্যারিস দাস রোড —২০১।




২.ব্রহ্মপুত্রের মতোন তালপাখা 

আমাদের যেদিন দেখা হবে—  পৃথিবীর কোথাও তখন মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল। নতুন নতুন শহরের 

ধ্বংসস্তূপের কথা ভুলে আমি তাকিয়ে থাকবো তোমার মুখের দিকে। চারিদিক কেন্দ্রহীন-

ক্রমাগত ধসে পড়ছে কাঠামো- এত হত্যা-ধ্বংস-পরাজয়-অবিশ্বাসের মাঝেও 

অবশিষ্ট কিছু বিশ্বাস নিয়ে আমরা অনেক অবাক হবো।


রঙিন ক্ষুধার পাশে শুয়ে থাকা বাঘের শরীর ছুঁয়ে কিছু রোদ পালিয়ে আসবে পরস্পরের  

সম্মতিতে। এখনও বিস্মিত হতে জানি, জানি তুমুল ভালোবাসতে। রুপোলি পর্দাগুলো সরিয়ে তুমি 

তাকাও এখানে বুকের প্রতিটি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে তোমাকে এঁকেছি প্রেম গভীর হলে কেনো চিতার 

আগুন নিভে যায়?


তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে কেটে যাক বিপন্ন জীবন, 

তোমার চুলের মৌসুমি হাওয়ায় বাড়ুক পৃথিবীর আয়ু।

অনেক ঝড়ের ভেতরে-বৃষ্টিতে-স্বাভাবিক মনে হলেও 

কতটা অস্বাভাবিক ব্যাকুলতা নিয়ে এসেছি 

হে দেবদারু, হে অনাগত অভিভাবক-ফিরিয়ে দিও না আর শূন্য হাতে।

অজস্র রাতজাগা আর উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটে চলছে এই নদী নিরবধি,

তোমাকে নিয়ে স্নায়ুর ভেতরে, রক্তের গভীরে। 

যতটা দূরে গেলে ঝরে পড়ে স্মৃতি আর মহামারি। 

ততটা রহস্য নিয়ে ছুঁতে চাই তোমাকে-স্বপ্নে স্বপ্নে দুঃস্বপ্ন বাড়ে। 

তবুও, আজন্ম চিতার গতি নিয়ে ছুটে যাচ্ছি

তোমার দিকে এবার ফিরে এলে-হে পরাজয় 

আমাকেও দিও বরমাল্য!




.দশম শ্রেণির কথা

আমি জানি আমার মন খারাপের রাতে পূর্ব থেকে পশ্চিম আকাশ,উঠবে না কোন নক্ষত্র।

বিচ্ছিন্ন হওয়ার আমেজে, হতাশার দৌরাত্ম্য কানামাছি খেলে যাবে রাতভর। আমার মন খারাপের 

রাতে  ভাওয়াল-জংশনে হলুদ হলুদ ট্রাম নিয়ে সাইরেন বাজাবে না মহুয়া এক্সপ্রেস।

আমি আজ সব জেনে গেছি

আমি জেনে গেছি কেন আমার পাঞ্জাবীর বোতাম  লাগাতে কষ্ট লাগে — 

দর্জি কেন বুকপকেটে সেলাই করে, চশমার কাঁচে এঁকে দেয় জোনাক অন্ধকার। 

আমি বুঝে গেছি আমি বুঝে গেছি কেন; জ্বর এলে বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যাথা নিয়ে তোমার 

ফুজিফিল্ম স্টুডিওর  অ্যালবাম দেখি। কেন ক্ষুধা ও শ্রান্তিরহিত প্রশ্নবোধক পুঞ্জিভূত হচ্ছে আমার 

খাটেরতলায় —

একটা লালবিড়াল আমাকে ধাওয়া করছে ১৭ বছর ধরে — দুপুর হলেই চোখে রোদচশমা লাগিয়ে ভয় দেখায়। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি পাড়ি দিয়ে ফেলছি ক্রমশই—

সাইবেরিয়া, পেলেস্তাইন, আরব আমিরাত। যুদ্ধকবলিত শহরে আমি পাচ্ছি পরম সুখ

আর ভুলে যাচ্ছি দশম শ্রেণির সেই করুণ বছরের কথা — 


আচ্ছা, এসব আনন্দের কথা বাদ। আমি আজ শুধু বেদনার কথা বলবো,

বলবো দশম শ্রেণির ঘটনা — যার কথা মনে পড়লে আমি আজও ইউনিফর্ম পরে আয়না খুঁজতে হয় 

যাই ব্যতিব্যস্ত। অথচ আয়না খুঁজি না— সারাশহর জুড়ে মার্বেল আকৃতির দুটো লেন্স খুঁজি।


আমি আজ শুধু দুঃখের কথাই বলব —খবরের পাতায়, জংশনের টিকেটে, খেলার পোস্টারে,শহরের 

সবচে বড়ো প্রেসে বড়োবড়ো 

অক্ষরে ছাপাবো শুধু বেদনার কথা আমি শুধু দুঃখই বলবো।


আর তাছাড়া আমি তো গৌতমবুদ্ধ নই যে বিনাদোষে ফাঁসিরদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী হয়ে আদালতে কসম করে বলবো— 

“পৃথিবীর সকল মানুষ সুখী হউক ! “


আমার দুঃখ লাগে ; আমার দুঃখ লাগে…




৪.বোহেমিয়ান 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা দেখি না বহুদিন,

বহুদিন ফিল্টারিং জলখরচা বাড়িয়ে নিজের যত্ন নেওয়া হয় না।


ট্রিগার ধরে বহুবার হাসাহাসি করে ফেলেছি—

এখন তোমার অহেতুক হাসির ঢেউ নিবে না 

কোনো সমুদ্র কিংবা নালা।


একটা আধমরা ইঁদুর নিয়ে বহুদিন পিঁপড়েদের সাথে ছলনা করেছি,

বহুদিন ক্ষুধা শ্রান্তির ধকল পেটে লালন করে

কিভাবে হতাশার মুখ ভুলে যেতে হয় —

তা স্বতঃস্ফুর্তভাবে আত্মস্ত করেছি।


এখন আমি ভয় করি না তোমার হাসি কিংবা

বাহাত্তরবার গুলির আওয়াজ ;


ডালিম দানার মতোন ফেটে যাওয়া হৃদয় নিয়ে,

তিস্তা ধরে ভেসে যাচ্ছে যেই ভেলা।

আমি তা ভাড়া করেছি— তোমার চেহারা আঁকতে।

নিয়ন বাতির আলোয় চকচকিয়ে যেই কাফেলা

চলে যাচ্ছে ওই বহুদূর লালনগীতি গেয়ে,

আমি তাদেরও বলবো না তোমার চেহারার কথা


বিশ্বাস করো,মাথায় ট্রিগার ধরে বহুবার হাসাহাসি করে ফেলেছি—

এখন তোমার অহেতুক হাসির ঢেউ নিবে না 

কোনো সমুদ্র কিংবা নালা।




৫.বৃক্ষ

আমার জন্মের পর আমার অনাগত অভিভাবকেরা মাথায় পুতে দিয়েছিলো বৃক্ষের বীজ — 

ছেলে আমার যাবৎ কেন্দ্রিক সুখের দূত হবে। পাখিরা বাসা বাঁধবে, বৃক্ষের মাথায় যাবতীয় 

অপার্থিব দৃশ্য কিংবা মার্চেট অব ভেনিসের মতোন নিদর্শন হবে। এগ্রিকালচারিস্টরা বৃক্ষের 

তলায় ঢালবে টাকা,  ইন্টারন্যাশনাল ক্যাসিনোতে আমার মাথায় লাল পতাকা লাগিয়ে 

নিলাম হবে — পত্রিকায় ছাপা হবে আমার শেকড়ে দাঁড়িয়ে রুশ-বাদশারর নান্দনিক স্থিরচিত্র ;


এতসবের পরও আমি জন্মেছি হতাশা — 

মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরি, বুঁদবুঁদ করি অপ্রেমে

যতো অন্ধকার , নিরাশা কিংবা বিদীর্ণতা সেখানেই আমি


আমাকে নেয় না কেউ 

আমাকে নিবে না কেউ — 

নিবে না বাবার লিবার্টি নিবে না মায়ের ভেনিটি ব্যাগ — 

রাত পোহালে হেঁটে হেঁটে চলে যাবো এই অহেতুক খোলস ফেলে — 

খোলসের ভেতর রেডিয়ো এক্টিভিটি! 


যেহেতু দেহ দিয়ে কিনা যায় না 

মানুষের মন কিংবা একাগ্রতা 

অতএব আফসোস নেই দেহের প্রতি — নেই কোনো মোহ কিংবা উৎকন্ঠা। 


রাত পোহালে হেঁটে হেঁটে চলে যাবো 

খোলস ফেলে আত্মাদের ক্যাসিনোতে।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ