সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “বড় ধরনের ভূমিকম্প আসছে”–এ ধরনের আশঙ্কা প্রায়ই দেখা যায়। এমন খবর প্রকাশিত হলেই জনমনে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অনেকে ভাবেন, বিজ্ঞান কি সত্যিই আগাম কোনো সংকেত পায়? নাকি এসব কেবল অনুমান? বাস্তবতা হলো ভূমিকম্পের আগাম নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি, আর এই সীমাবদ্ধতাকে ঘিরেই জন্ম নেয় বিভ্রান্তি ও অযাচিত উৎকণ্ঠা।

ভূমিকম্প পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেট সরে যাওয়ার কারণে ঘটে, যার প্রক্রিয়া গভীর ভূগর্ভে ক্রমাগত চলতে থাকে। এই গতিবিধি কোন মুহূর্তে কী মাত্রায় কম্পন সৃষ্টি করবে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব বিজ্ঞানের কাছে এখনও অনিশ্চিত। বিশ্বের শীর্ষ সিসমোলজি গবেষণা কেন্দ্রগুলো স্পষ্টভাবে জানায় যে ভূমিকম্পের সঠিক সময়, স্থান ও মাত্রা আগাম ঘোষণা করা যায় না। তাই ”বড় ধরণের ভূমিকম্প হবে” এ ধরনের বক্তব্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এই ধরনের ভীতিকর বার্তা কোথা থেকে আসে? এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। এর উত্তর অনেকটাই গণমাধ্যমের কাঠামোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। আধুনিক মিডিয়া, বিশেষ করে বাণিজ্যিক মিডিয়া, মানুষের মনোযোগ ধরে রাখাকে সবচেয়ে বড় সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখে। আর মানুষের মনোযোগ সবচেয়ে দ্রুত আকর্ষণ করে ভয়, বিপর্যয় ও নাটকীয়তা। একজন দর্শক বা পাঠক আতঙ্কিত হলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই আরও আপডেট জানতে চান, আরও খবর দেখতে থাকেন। এই দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগ থেকেই বাড়ে ভিউ, মোট্রিক্স, বিজ্ঞাপন যা মিডিয়ার আয়ের প্রধান উৎস। ফলে, অল্প তথ্যকে বড় করে তুলে ধরা, সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে ভয়ের ভাষা ব্যবহার, এবং বিশ্লেষণের নামে আতঙ্ক সৃষ্টি এসবকে কিছু মিডিয়া সহজ পথ হিসেবে গ্রহণ করে। এর ফলে প্রকৃত সতর্কবার্তা ও অতিরঞ্জিত ভীতিকর প্রচারের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

এই ভুল বোঝাবুঝির মধ্যেই জন্ম নেয় আতঙ্ক, যা কখনোই সহায়ক নয়।

আতঙ্কের বদলে যে বিষয়টি জরুরি তা হলো প্রস্তুতি। ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ,  পরিকল্পিত নগরায়ন পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুশীলন, জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখা এবং সাধারণ সচেতনতা বৃদ্ধি এগুলোই বাস্তবসম্মত কাজ। বিপরীতে, গুজবনির্ভর আতঙ্ক একজন মানুষকে যেমন অনিরাপদ করে তোলে, তেমনি সমাজে সৃষ্টি করে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা।

সুতরাং ভূমিকম্পকে ঘিরে “আসছে, আসছে” ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী আদতে বৈজ্ঞানিক নয়; বরং তথ্যের অপব্যবহার। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হওয়া উচিত সচেতনতা বাড়ানো, আতঙ্ক ছড়ানো নয়। বিজ্ঞান যে সীমাবদ্ধতার কথা পরিষ্কারভাবে জানায়, সেই বাস্তবতাকে সম্মান করে সংবাদ পরিবেশন করা জরুরি। নইলে তথ্যের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করে ভয়, যা সমাজের জন্য মোটেও কাম্য নয়।